images

অর্থনীতি

রাজস্ব আদায়ে বড় ধাক্কা, ঘাটতি প্রায় ৪৬ হাজার কোটি টাকা

মহিউদ্দিন রাব্বানি

২৪ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯:৩৯ পিএম

চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই–ডিসেম্বর) জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এই সময়ে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ৪৬ হাজার কোটি টাকা কম রাজস্ব আদায় হয়েছে।

এনবিআরের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ছয় মাসে মোট রাজস্ব আদায় হয়েছে এক লাখ ৮৫ হাজার ২২৯ কোটি টাকা। অথচ একই সময়ে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল দুই লাখ ৩১ হাজার ২০৫ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। ফলে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৫ হাজার ৯৭৬ কোটি ৩৭ লাখ টাকা।

নভেম্বর পর্যন্ত ঘাটতি ছিল প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা, যা ডিসেম্বর শেষে প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়।

আরও পড়ুন

রাজনৈতিক অস্থিরতায় ধুঁকছে অর্থনীতি, ভোটের অপেক্ষায় ব্যবসায়ীরা

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, রাজস্ব আদায়ে সবচেয়ে বড় ঘাটতি দেখা দিয়েছে আয়কর খাতে। ছয় মাসে আয়কর থেকে আদায় হয়েছে ৬১ হাজার ৮৭৫ কোটি ২০ লাখ টাকা, যেখানে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮৫ হাজার ৪০৫ কোটি ৫২ লাখ টাকা। ফলে আয়কর খাতে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৩ হাজার ৫৩০ কোটি ২৫ লাখ টাকা।

শুল্ক বা কাস্টমস খাতেও লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি। এ খাতে ৬৫ হাজার কোটি ৮৫ লাখ টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয়েছে ৫২ হাজার ৮৬০ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। এতে ঘাটতি হয়েছে ১২ হাজার ১৪০ কোটি ২৯ লাখ টাকা।

244
রফতানি বাণিজ্যে দেখা দিয়েছে স্থবিরতা। ছবি: সংগৃহীত

অন্যদিকে ভ্যাট খাতে আদায় হয়েছে ৭০ হাজার ৪৯৩ কোটি ২৪ লাখ টাকা, যেখানে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮০ হাজার ৭৯৯ কোটি টাকা। ফলে ভ্যাট খাতে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ৩০৫ কোটি ৭৬ লাখ টাকা।

যদিও একই সময়ে আয়কর, শুল্ক ও ভ্যাট খাতে যথাক্রমে ১৪.৬৭ শতাংশ, ৬.৮১ শতাংশ এবং ১৯.৯৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে, তবে উচ্চ লক্ষ্যমাত্রার কারণে সামগ্রিক রাজস্ব ঘাটতি কমানো সম্ভব হয়নি।

একক মাস হিসেবেও ডিসেম্বর মাসে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেনি এনবিআর। ওই মাসে ৫১ হাজার ৩৬৬ কোটি ১২ লাখ টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয়েছে ৩৬ হাজার ১৯ কোটি ৫ লাখ টাকা। ডিসেম্বর মাসে রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধি ছিল ১০.২৫ শতাংশ।

ডিসেম্বর মাসে শুল্ক থেকে আদায় হয়েছে ৯ হাজার ৯৫০ কোটি টাকা, ভ্যাট থেকে ১২ হাজার ২৬১ কোটি টাকা এবং আয়কর থেকে ১৩ হাজার ৯৮৪ কোটি টাকা।

চলতি অর্থবছরের শুরুতে এনবিআরের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৪ লাখ ৯৯ হাজার কোটি টাকা। পরে গত ১০ নভেম্বর বাজেট মনিটরিং ও সম্পদ কমিটির সভায় তা বাড়িয়ে ৫ লাখ ৫৪ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়।

আরও পড়ুন

রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় ব্যাহত বিদেশি বিনিয়োগ

বিশ্লেষকদের মতে, রাজস্ব ঘাটতির পেছনে একাধিক কাঠামোগত ও সামষ্টিক কারণ কাজ করছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিনিয়োগ কার্যক্রমের স্থবিরতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে ভোক্তা ব্যয়ের সংকোচন এবং আমদানি কমে যাওয়ার প্রভাব রাজস্ব আদায়ের গতি মন্থর করেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাজস্ব প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও দীর্ঘদিনের সংস্কার জট। এসব কারণে ঘাটতিটি শুধু সাময়িক নয়; বরং দেশের রাজস্ব সক্ষমতার একটি গভীর সংকটকে সামনে এনেছে।

NBR_2
চাপের মুখে এনবিআর। ছবি: সংগৃহীত

এনবিআরের রাজস্ব আদায় ব্যর্থতা নিয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এক পর্যবেক্ষণে বলেছে, লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে বাস্তব পরিস্থিতির প্রতিফলন ছিল না। মূল্যস্ফীতি ও আমদানি হ্রাসের বাস্তবতা উপেক্ষা করা হয়েছে। পাশাপাশি করছাড়, সংস্কার বিলম্ব এবং কর ফাঁকি রোধে দুর্বলতাই রাজস্ব ঘাটতির মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পরামর্শক কমিটির সুপারিশ উপেক্ষা করায় সংস্কার প্রক্রিয়ায় বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে বলেও মন্তব্য করে সংস্থাটি।

আরও পড়ুন

সংকটে পোশাক খাত, বাড়ছে উদ্বেগ ও হতাশা

মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) সভাপতি কামরান টি রহমান ঢাকা মেইলকে বলেন, দেশের ব্যবসা বাণিজ্য ভালো নয়। রাজনীতিক অস্থিরতা নির্বাচন পরিস্থিতি নিয়ে সংকটের মধ্যে রয়েছে বাণিজ্যিক খাত। পাশাপাশি বিনিয়োগের স্থগিত রাজেশ্বর ঘাটটির ক্ষেত্রে দায়ী।

রাজস্ব আদায়ে বড় ব্যবধান দেশের অর্থনীতির জন্য উদ্বেগজনক সংকেত বলে মনে করেন এই ব্যবসায়ী নেতা।

এমআর/জেবি