মুহা. তারিক আবেদীন ইমন
১৫ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯:২৫ এএম
- পাঁচ মাসে বাণিজ্যে ঘাটতি বেড়ে ৯৪০ কোটি ডলার
- এক বছরে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে ১৫.৬৩ শতাংশ
- জুলাই–নভেম্বরে আমদানি ২৭.৫৯ বিলিয়ন ডলার
- একই সময়ে রফতানি আয় ১৮.১৮ বিলিয়ন ডলার
- ২০২৫ সালে রেমিট্যান্স এসেছে ৩৩ বিলিয়ন ডলার
রেমিট্যান্সের প্রবাহ ও রফতানি আয় বৃদ্ধির প্রভাবে বিদায়ি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উন্নতি ঘটেছিল বিদেশি লেনদেনের ভারসাম্য বা ব্যালান্স অব পেমেন্টের (বিওপি)। বিন্তু বিপত্তি ঘটেছে চলতি ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে। রফতানি আয়ের গতি কমে যাওয়ায় চলতি অর্থবছরের শুরুতেই পণ্য বাণিজ্যে ঘাটতি আবারও বাড়তে শুরু করেছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) দেশের পণ্য বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৯৪০ কোটি ৭০ লাখ ডলারে, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১৫ দশমিক ৬৩ শতাংশ বেশি।
সম্প্রতি চলতি অর্থবছরের পাঁচ মাসের (জুলাই-নভেম্বর) বৈদেশিক লেনদেনের চলতি হিসাবের ভারসাম্য (ব্যালেন্স অব পেমেন্ট—বিওপি) সংক্রান্ত হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তাতে দেখা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ে পণ্য বাণিজ্যে ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৭৯৩ কোটি ৭০ লাখ (৭.৯৩ বিলিয়ন) ডলার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই-নভেম্বর সময়ে দেশের ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা বিভিন্ন ধরনের পণ্য আমদানি করেছেন ২ হাজার ৭৫৯ কোটি ৪০ লাখ (২৭.৫৯ বিলিয়ন) ডলারের, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৬ দশমিক ১ শতাংশ বেশি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের এই পাঁচ মাসে আমদানি হয়েছিল ২৬ দশমিক শূন্য এক বিলিয়ন ডলারের পণ্য।
আরও পড়ুন:
অন্যদিকে একই সময়ে পণ্য রফতানি থেকে আয় হয়েছে ১৮ দশমিক ১৮ বিলিয়ন ডলার, যা গত অর্থবছরের তুলনায় মাত্র দশমিক ৬ শতাংশ বেশি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জুলাই-নভেম্বর সময়ে রফতানি আয় ছিল ১৮ দশমিক ০৭ বিলিয়ন ডলার। আমদানি ও রপ্তানির এই ব্যবধানের কারণেই চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে পণ্য বাণিজ্যে ঘাটতি বেড়ে ৯ দশমিক ৪১ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।

এর আগে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পণ্য বাণিজ্যে ঘাটতি ৯ শতাংশ কমে ২ হাজার ৪৫ কোটি (২০.৪৫ বিলিয়ন) ডলারে নেমেছিল। তার আগের অর্থবছর ২০২৩-২৪ সালে এই ঘাটতির পরিমাণ ছিল ২ হাজার ২৪৩ কোটি (২২.৪৩ বিলিয়ন) ডলার এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরে ছিল ২ হাজার ৭৩৮ কোটি (২৭.৩৮ বিলিয়ন) ডলার।
চলতি অর্থবছরে মাসভিত্তিক হিসাবেও ঘাটতির প্রবণতা স্পষ্ট। জুলাই-আগস্ট দুই মাসে পণ্য বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ২৯৫ কোটি ৮০ লাখ (২.৯৬ বিলিয়ন) ডলার। তিন মাস শেষে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫৭১ কোটি ২০ লাখ (৫.৭১ বিলিয়ন) ডলারে। চার মাস শেষে (জুলাই-অক্টোবর) ঘাটতি ছিল ৭৫৭ কোটি (৭.৫৭ বিলিয়ন) ডলার।
এদিকে বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চয়ের প্রধান উৎস রফতানি আয়ও টানা কমছে। আগস্ট থেকে ডিসেম্বর—পাঁচ মাস ধরেই রফতানি আয় হ্রাস পাচ্ছে। রফতানিকারকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পাল্টা শুল্কনীতি ঘিরে বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রভাবেই রপ্তানি বাণিজ্যে এই নেতিবাচক ধারা তৈরি হয়েছে। তারা আশঙ্কা করছেন, আগামী মাসগুলোতেও এই সংকট অব্যাহত থাকতে পারে, যা সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়াবে।

রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের ষষ্ঠ মাস ও গত বছরের শেষ মাস ডিসেম্বরে পণ্য রফতানি থেকে আয় হয়েছে ৩৯৬ কোটি ৮৩ লাখ (৩.৯৭ বিলিয়ন) ডলার। যা আগের অর্থবছরের একই মাস ডিসেম্বরের তুলনায় ১৪ দশমিক ২৫ শতাংশ কম। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের ডিসেম্বরে রফতানি আয় ছিল ৪৬২ কোটি ৭৫ লাখ (৪.৬৩ বিলিয়ন) ডলার।
রফতানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাক শিল্পে ধস নামার কারণেই সামগ্রিক রফতানি বাণিজ্যে এই বেহাল দশা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সাধারণত অক্টোবর, নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসকে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের পোশাক রফতানির ভরা মৌসুম ধরা হয়। তবে চলতি অর্থবছরে সেই সময়ে প্রত্যাশিত প্রবৃদ্ধি দেখা যায়নি।

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে রফতানি আয়ে বড় উল্লম্ফন দেখা গেলেও পরের মাসগুলোতে ধারাবাহিক পতন শুরু হয়। জুলাইয়ে রফতানি আয় ছিল ৪৭৭ কোটি (৪.৭৭ বিলিয়ন) ডলার, যা আগের অর্থবছরের জুলাইয়ের তুলনায় ২৪ দশমিক ৯০ শতাংশ বেশি। তবে আগস্টে আয় নেমে আসে ৩৯১ কোটি ৫০ লাখ (৩.৯১ বিলিয়ন) ডলারে, যা আগের বছরের আগস্টের তুলনায় ২ দশমিক ৯৩ শতাংশ কম। সেপ্টেম্বরে আয় হয় ৩৬২ কোটি ৭৫ লাখ (৩.৬২ বিলিয়ন) ডলার, কমে ৫ দশমিক ৬৬ শতাংশ। অক্টোবরে আয় দাঁড়ায় ৩৮২ কোটি ৩৮ লাখ (৩.৮২ বিলিয়ন) ডলারে, যা আগের বছরের তুলনায় ৭ দশমিক ৪৩ শতাংশ কম। নভেম্বরে আয় হয় ৩৮৯ কোটি ১৫ লাখ (৩.৮৯ বিলিয়ন) ডলার, কমে ৫ দশমিক ৫৪ শতাংশ।
সব মিলিয়ে চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) পণ্য রফতানি থেকে আয় গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ২ দশমিক ১৯ শতাংশ কমেছে। এই সময়ে বাংলাদেশ রফতানি করেছে ২ হাজার ৩৯৯ কোটি ৬৯ লাখ (২৩.৯৯ বিলিয়ন) ডলারের পণ্য। আগের অর্থবছরের একই সময়ে রফতানি আয় ছিল ২ হাজার ৪৫৩ কোটি ৩৫ লাখ (২৪.৫৩ বিলিয়ন) ডলার।

অন্যদিকে গত অর্থবছরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত ইতিবাচক প্রবাহ রয়েছে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স প্রবাহ। সদ্য সমাপ্ত হওয়া ২০২৫ সালেও প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ রেমিট্যান্সের পরিমাণ ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর প্রবাসীরা প্রায় ৩৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন, যা এক বছরে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স আহরণের রেকর্ড। এর আগের বছর ২০২৪ সালে রেমিট্যান্স এসেছিল ২৬ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ডলার। এক বছরের ব্যবধানে রেমিট্যান্সের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ১৮ শতাংশ।
২০২৫ সালের প্রথম মাস জানুয়ারিতে রেমিট্যান্স আসে ২১৮ কোটি ডলার, ফেব্রুয়ারি-২৫৩ কোটি ডলার, মার্চে ৩৩০ কোটি, এপ্রিলে ২৭৫ কোটি, মে ২৯৭ কোটি, জুন মাসে ২৮২ কোটি, জুলাইয়ে দেশে এসেছে ২৪৮ কোটি ডলার, আগস্টে ২৪২ কোটি, সেপ্টেম্বরে ২৬৮ কোটি, অক্টোবরে ২৫৬ কোটি, নভেম্বরে ২৮৯ কোটি এবং সবশেষ ডিসেম্বর মাসে এসেছে ৩২৩ কোটি মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স এসেছে ২ হাজার ৬৮৯ কোটি ডলার, ২০২৩ সালে এসেছিল ২ হাজার ১৯২ কোটি ডলার, ২০২২ সালে আসে ২ হাজার ১২৯ কোটি, ২০২১ সালে ছিল ২ হাজার ২০৭ কোটি ডলার। ২০২০ সালে রেমিট্যান্স আসে ২ হাজার ১৭৪ কোটি মার্কিন ডলার। ২০১৯ সালে আসে এক হাজার ৮৩৩ কোটি ডলার। এর আগে ২০১৮ সালে রেমিট্যান্স এসেছিল এক হাজার ৫৫৫ কোটি ডলার। ২০১৭ সালে এসেছিল এক হাজার ৩৫৩ কোটি ডলার, ২০১৬ সালে ছিল এক হাজার ৩৬১ কোটি ডলার, ২০১৫ সালে এক হাজার ৫৩১ কোটি ডলার, ২০১৪ সালে রেমিট্যান্সের পরিমাণ ছিল এক হাজার ৪৯২ কোটি ডলার।
টিএই/এএস