নিজস্ব প্রতিবেদক
২৮ নভেম্বর ২০২৫, ০৩:২৯ পিএম
গরুর মাংসের কেজি ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা খুব বেশি নয় বলে মনে করেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার।
কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘আমরা গরুর মাংস প্রতিদিন খাই না। তবুও অনেকেই আমাদের বলছেন যে, বাইরে থেকে মাংস আমদানি করতে হবে।’
তাদের উদ্দেশে উপদেষ্টা বলেন, ‘গরুর মাংস মূলত রেড মিটের অংশ। তাই শুধু গরুর মাংসের দিকে মনোযোগ না দিয়ে মহিষ, ভেড়া, মুরগি বা বয়লার মাংসকে আমাদের খাদ্যাভ্যাসের অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত।’
শুক্রবার (২৮ নভেম্বর) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে বাংলাদেশ কৃষি সাংবাদিক ফোরাম (বিএজেএফ) আয়োজিত চার দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সম্মেলন ‘জাতীয় প্রাণিসম্পদ সপ্তাহ: পুষ্টি নিরাপত্তায় প্রাণি ও মৎস্য খাত এবং বাংলাদেশের সুনীল অর্থনীতির টেকসই যাত্রায় করণীয়’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক আবু খালিদের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিএজেএফ সভাপতি সাহানোয়ার সাইদ শাহীন।
মৎস্য উপদেষ্টা বলেন, ‘নদী, খালবিল এবং হাওর-বাওরের মাছের প্রজাতি এবং স্থানীয় প্রাণিসম্পদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা সবকিছু শুধুই উৎপাদনশীলতা দিয়ে বিচার করতে পারি না, খাদ্য চাহিদা, রক্ষণাবেক্ষণ সুবিধা, নারীর জীবন-জীবিকার সঙ্গে মিল- সবকিছুকে বিবেচনা করতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘গ্রামের কৃষকের বাড়িতে মাছ, গরু, ধান সবকিছুই থাকে। এখন আমরা আলাদা করে ভাবতে শিখেছি যে, কৃষি মানে শুধুই খাদ্য উৎপাদন। কিন্তু আমরা যেন শুধু উৎপাদন বাড়াতে থাকি, তা নয়, আমাদের খাদ্য এবং পুষ্টির মান নিশ্চিত করাও জরুরি।’
মৎস ও প্রাণিসম্পদ খাতের ভর্তুকির অভাবের কথা তুলে ধরে উপদেষ্টা বলেন, ‘কৃষিতে ভর্তুকি থাকলেও মৎস ও প্রাণিসম্পদে নেই। আমরা এটাকে খাত বলি, আবার একোয়াকালচারের ক্ষেত্রে শিল্প বলছি। কিন্তু ৭০-৮০ শতাংশ উৎপাদন এখনো গ্রামীণ পর্যায় থেকে আসে।’
ফরিদা আখতার বলেন, ‘দেশীয় জাতের প্রাণিসম্পদ সংরক্ষণ অত্যন্ত জরুরি। সংকর জাত তৈরি করতে আপত্তি নেই, তবে দেশীয় জাত যেন হারিয়ে না যায় তা খেয়াল রাখতে হবে। এই খাতের সঙ্গে আমাদের পুষ্টি নিরাপত্তার বিষয়ও যুক্ত।’

পুষ্টির দিকেও গুরুত্ব দেন তিনি। বলেন, ‘জিরো হাঙ্গার মানে শুধু পেট ভরা খাবার নয়, পুষ্টি যোগ্য খাবার নিশ্চিত করা। শুধু ক্যালরি খেলে হবে না, প্রোটিন, ভিটামিন, মিনারেল সব কিছু পুষ্টিকর পরিমাণে খেতে হবে। এ জন্য মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
মৎস ও ডিমের প্রতিদিনের গ্রহণের প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরেন উপদেষ্টা। বলেন, ‘আপনারা সবাই প্রতিদিন মাছ খাচ্ছেন বা ডিম খাচ্ছেন। আমাদের এভারেজ দিয়ে গরিব মানুষের খাদ্য চাহিদা বিচার করা ঠিক নয়। খাদ্য শহরকেন্দ্রীক নয়, দেশের সকল মানুষের কাছে পৌঁছানো দরকার।’
একোয়াকালচার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘একোয়াকালচার মাছ উৎপাদন বাড়িয়েছে, তবে ঝুঁকিও বাড়িয়েছে। নিয়ন্ত্রণ না থাকায় এন্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্টেন্সের সমস্যা দেখা দিতে পারে। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এই বিষয়গুলো বুঝতে হবে।’
গরুর মাংস ও খাদ্য বৈচিত্র্যের গুরুত্বেও তিনি আলোকপাত করেন। বলেন, ‘গরুর মাংসের দাম বেশি বলে আমদানি করার প্রস্তাব আসে। কিন্তু আমাদের দেশীয় খামারিদের মাংস উৎপাদন বাড়ানো উচিত। শুধু গরু নয়, ভেড়া, হাঁস, মুরগি—সব ধরনের মাংস অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। খাদ্যের বৈচিত্র্য বাড়াতে হবে।’
ফরিদা আখতার খাদ্যের নিরাপত্তা এবং কীটনাশক ব্যবহারের ক্ষতিকর প্রভাবেও সতর্ক করেন।
তিনি বলেন, ‘চকচকে টমেটো বা ফুলকপি কিনে খেলে হবে না, যদি তাতে কীটনাশক থাকে। খাদ্যই রোগের উৎস হয়ে গেলে তা ব্যবহারযোগ্য হবে না। ফর্টিফিকেশন একমাত্র সমাধান নয়, ন্যাচারাল পদ্ধতিতেই পুষ্টিগুণ বজায় রাখা সম্ভব।
সভায় তিনি সাংবাদিক ফোরামের ভূমিকাও তুলে ধরেন। বলেন, আপনারা কৃষি সাংবাদিকরা গ্রামীণ পর্যায়ে পৌঁছানোর তথ্য প্রদান করে অনেক ভূমিকা রাখতে পারেন। আধুনিক প্রযুক্তি প্রচার জরুরি, কিন্তু দেশের সাধারণ কৃষকরা যা করছে, তা প্রচার করা আরও গুরুত্বপূর্ণ।
উপদেষ্টা আরও বলেন, ‘সাংবাদিকদের জন্য প্রশিক্ষণ খুবই জরুরি। এটি শুধু আমার ব্যক্তিগত স্বার্থ নয়, আমাদের দেশের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য। সাংবাদিকদেরকে এই প্রশিক্ষণ দিতে হবে।’
এএইচ/এএইচ