জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
০৭ নভেম্বর ২০২৫, ০৪:৩১ পিএম
ফ্যাশন বিজনেস জার্নাল ৬ নভেম্বর তাদের এক্সক্লুসিভ শিল্পভিত্তিক টক শো সিরিজ ইনসাইড ফ্যাশনের সফল উদ্বোধন করেছে। প্রথম পর্বের শিরোনাম ছিল ভ্যালু ওভার ভলিউম – দ্য নিউ ভিশন ফর বাংলাদেশ আরএমজি, যেখানে টেক্সটাইল, অ্যাপারেল এবং ফ্যাশন খাতের শীর্ষস্থানীয় বিশেষজ্ঞরা বৈশ্বিক প্রবণতা, টেকসই উন্নয়ন এবং উদ্ভাবন নিয়ে মতবিনিময় করেন।
অনুষ্ঠানটি লাইভ ওয়েবিনার আকারে অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে দেশি ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের পেশাজীবী, শিক্ষাবিদ এবং শিক্ষার্থীরা অংশ নেন। আলোচনায় ব্যবসা, সৃজনশীলতা, একাডেমিয়া ও টেকসই উন্নয়নের সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়, যা বাংলাদেশের ফ্যাশন খাতের জন্য একটি দায়িত্বশীল ও স্থিতিশীল ভবিষ্যৎ গঠনের দিকনির্দেশনা দেয়।
উদ্বোধনী এপিসোডটি যৌথভাবে আয়োজন করেছে বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজি (BUFT)। এর পাওয়ারড বাই পার্টনার হলো গ্রিন স্টিচ (GRS) এবং প্রমোশনাল পার্টনার হিসেবে যুক্ত রয়েছে টেক্সটাইল অ্যান্ড গার্মেন্টস মার্চেন্ডাইজিং ব্লগ।
বিশেষ বক্তাদের বক্তব্য
প্রফেসর ড. ইঞ্জি. আয়ুব নবি খান, ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য, বিইউএফটি (BUFT), বলেন— ইনসাইড ফ্যাশন এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম, যেখানে একাডেমিয়া ও শিল্প একসাথে কাজ করে বাংলাদেশের আরএমজি খাতে টেকসই প্রবৃদ্ধির সমাধান খুঁজে বের করতে পারে।
তিনি জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ণাঙ্গ কারিকুলাম পরিবর্তন একটি জটিল প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। তাই তারা দ্রুত শিল্পের চাহিদার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে স্বল্পমেয়াদি কোর্স চালু করেছেন—যেমন 3D ফ্যাশন ডিজাইন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (AI) কোর্স, রোবোটিকস ও গবেষণা উন্নয়ন (R&D) সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ। এর ফলে শিক্ষার্থীরা আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষ হয়ে উঠছে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের পোশাক শিল্প এখনো মূলত বেসিক পণ্যের ওপর নির্ভরশীল, যেমন টি-শার্ট, শার্ট ও ট্রাউজার। কিন্তু এখন সময় এসেছে মেডিকেল, মিলিটারি, অ্যারোনটিক্যাল ও টেকনিক্যাল টেক্সটাইলের মতো উচ্চমূল্যের পণ্যে বৈচিত্র্য আনার।
রবার্ট অ্যান্টোশ্যাক, ভাইস প্রেসিডেন্ট, গ্লোবাল স্ট্র্যাটেজিক সোর্সিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট, গ্রে ম্যাটার কনসেপ্টস, বলেন— ভলিউম থেকে ভ্যালুতে পরিবর্তন কেবল একটি কৌশল নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদি প্রতিযোগিতার জন্য অপরিহার্য।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ পোশাক উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে, তবে এখন প্রয়োজন সরবরাহ চেইনের স্বনির্ভরতা ও বৈচিত্র্য। দেশীয়ভাবে সুতা, কাপড় ও সিনথেটিক ফাইবার উৎপাদনের মাধ্যমে আমদানি নির্ভরতা কমাতে হবে। পাশাপাশি, হোম টেক্সটাইল, ইন্ডাস্ট্রিয়াল ও টেকনিক্যাল টেক্সটাইলের মতো উচ্চমূল্যের খাতে সম্প্রসারণ ঘটাতে হবে।
তিনি যোগ করেন, প্রযুক্তিগত শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ অপরিহার্য। স্থানীয় বিশেষজ্ঞ গড়ে তুলতে পারলেই উদ্ভাবন ও দীর্ঘমেয়াদি প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান তৈরি করা সম্ভব।
প্রফেসর সাদাত সায়েম, লিড, ডিজিটাল ফ্যাশন ইনোভেশন রিসার্চ প্রজেক্ট, ম্যানচেস্টার ফ্যাশন ইনস্টিটিউট, বলেন— ডিজিটাল ইনোভেশন ও প্রযুক্তি বাংলাদেশের স্থানীয় উৎপাদকদের দক্ষতা ও টেকসই শিল্প গড়ে তুলতে সহায়তা করতে পারে।
তিনি 3D ডিজাইন, ডিজিটাল প্রোটোটাইপিং ও AI-নির্ভর সিস্টেমের গুরুত্ব তুলে ধরেন, যা বাংলাদেশের উৎপাদকদের শুধু প্রস্তুতকারক থেকে ডিজাইনার ও উদ্ভাবক হিসেবে রূপান্তরিত হতে সাহায্য করবে।
তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের কারখানাগুলো CLO3D ও Optitex-এর মতো বিদেশি সফটওয়্যার ব্যবহার করলেও, তাদের পূর্ণ সম্ভাবনা এখনো কাজে লাগানো হয়নি। আমাদের উচিত স্থানীয় সফটওয়্যার উন্নয়নে আইটি খাত ও পোশাক শিল্পের যৌথ উদ্যোগ নেওয়া।
তিনি আরও বলেন, আমরা প্রায়ই ক্রেতার চাপে প্রযুক্তি গ্রহণ করি, নিজের উদ্ভাবনী উদ্যোগ নেই না। এখন সময় এসেছে ক্রেতা-নির্ভরতা ছাড়িয়ে নিজেরাই নেতৃত্ব নেওয়ার।
শেখ এইচ এম মুস্তাফিজ, পরিচালক, বিজিএমইএ (BGMEA) ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক, কিউট ড্রেস ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেড, বলেন— সাসটেইনেবিলিটি বা টেকসই উৎপাদন লাভজনক হতে পারে—এটি কেবল সামাজিক দায়বদ্ধতা নয়, একটি ব্যবসায়িক সুযোগও।
তিনি জানান, সোলার এনার্জি, ওয়াটার রিসাইক্লিং ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বিনিয়োগের মাধ্যমে তিনি নিজেই উৎপাদন খরচ কমাতে এবং পরিবেশের পাশাপাশি ব্যবসার মূল্য বাড়াতে সক্ষম হয়েছেন।
তিনি বলেন, আমাদের মানসিকতা বদলাতে হবে—শুধু উৎপাদন খরচ নয়, উৎপাদনের মূল্য বিবেচনায় আনতে হবে, যেমন পণ্যের গুণমান, নির্ভরযোগ্যতা, কমপ্লায়েন্স ও ব্র্যান্ডের সুনাম।
তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়নের ডিউ ডিলিজেন্স আইন ও ডিজিটাল প্রোডাক্ট পাসপোর্ট উদ্যোগকে বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনা হিসেবে উল্লেখ করেন, যা দেশকে একটি দায়িত্বশীল ও মূল্যনির্ভর সরবরাহকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সহায়তা করবে।
মুস্তাফিজ আহ্বান জানান, ক্রেতার চাপের অপেক্ষায় না থেকে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে টেকসই চর্চা শুরু করতে হবে এবং উদ্ভাবন, আস্থা ও দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে এগিয়ে যেতে হবে।
সঞ্চালনা করেন ফ্যাশন বিজনেস জার্নালের এডিটর-ইন-চিফ ও বিগমিয়ার আন্তর্জাতিক উপদেষ্টা প্রফেসর শরীফ আস-সাবের। তিনি বলেন, গ্লোবাল ট্রেন্ড ও স্থানীয় বাস্তবতা যুক্ত করতে মিডিয়ার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্যানেল সদস্যরা দায়িত্বশীল উৎপাদন, প্রযুক্তিনির্ভর উদ্ভাবন এবং সমন্বিত কাজের মাধ্যমে বাংলাদেশের পোশাক খাতে টেকসই প্রবৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।
ইনসাইড ফ্যাশন
ইনসাইড ফ্যাশন হলো ফ্যাশন বিজনেস জার্নালের একটি ইন্ডাস্ট্রি টকশো সিরিজ, যেখানে ব্যবসায়ী নেতা, শিক্ষাবিদ, উদ্ভাবক ও নীতিনির্ধারকরা ফ্যাশন ও অ্যাপারেল খাতের প্রবণতা, টেকসই চর্চা এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতি নিয়ে মতবিনিময় করেন। সিরিজটিতে সাক্ষাৎকার, সরাসরি আলোচনা ও বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গির সমন্বয় ঘটানো হয়। এটি অনলাইন, সরাসরি বা হাইব্রিড ফরম্যাটে আয়োজন করা হয়।
ফ্যাশন বিজনেস জার্নাল
ফ্যাশন বিজনেস জার্নাল হলো বাংলাদেশের একটি শিল্পভিত্তিক মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম, যা বৈশ্বিক টেক্সটাইল, অ্যাপারেল ও ফ্যাশন খাত নিয়ে কাজ করে। গভীর বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন, গবেষণা ও ডিজিটাল স্টোরিটেলিংয়ের মাধ্যমে ফ্যাশন বিজনেস জার্নাল পেশাজীবী, শিক্ষাবিদ, নীতিনির্ধারক ও উদ্ভাবকদের একত্র করে পোশাক শিল্পের ভবিষ্যৎ গঠনে সহায়তা করে।
এমআইকে/এআর