images

অর্থনীতি

এবার বড় গরু দুশ্চিন্তায় ফেলেছে ব্যাপারীদের

মোস্তফা ইমরুল কায়েস

১৫ জুন ২০২৪, ০৯:২১ এএম

প্রতিবারের মতো রাজধানীর হাটগুলোতে বড় সাইজের গরু উঠেছে। কিন্তু বড় গরুর চাহিদা এবার কম। মাঝারি ও ছোট গরুই বেশি কিনছে ক্রেতারা। বড় সাইজের গরু নিয়ে এসে দুচিন্তায় পড়েছেন ব্যাপারীরা। তারা যে দাম হাঁকাচ্ছেন তার অর্ধেক দাম বলছেন ক্রেতারা। তাই ব্যাপারীরা বেশ হতাশ। ঈদের বাকী দুই দিন, এর মধ্যে বড় সাইজের গরু বিক্রি করতে না পারলে কপালে হাত উঠবে তাদের।
 
শুক্রবার (১৪ জুন) দিনভর রাজধানীর গাবতলী গরুর হাটে বেচাকেনা পর্যবেক্ষণ করে একটি বিষয় লক্ষ্য করা গেছে, আর তা হলো বড় গরু বিক্রি হচ্ছে কম। কিন্তু কেন কমেছে জানার চেষ্টা করা হয় ঢাকা মেইলের পক্ষ থেকে।

6
 
রমজান ব্যাপারী পাঁচ লাখ টাকার গরু মাত্র আড়াই লাখে বিক্রি করে দেন। ক্রেতার হাতে তুলে দিতে হাট থেকে নিজেই গরুটি বের করে আনেন। হাসিল ঘরের সামনে এনে তা ট্রাকে নিজেই তুলে দিলেন। 

শুক্রবার রাতে রমজান ব্যাপারীর সাথে কথা হয় ঢাকা মেইলের। গরু কত টাকায় বিক্রি করলেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, মাত্র আড়াই লাখ টাকায় বিক্রি করে দিছি। তিনি জানান, এ সাইজের গরু গত কোরবানির ঈদে ৫-৬ লাখেও বিক্রি হয়েছে।

2

প্রতি বছর গাবতলী হাটে উত্তরের বিভিন্ন জেলা থেকে গরু আসে। এবারও ট্রাকে ট্রাকে গরু আসছে। যথারীতি কুষ্টিয়া, যশোর, নড়াইল, মাগুড়া, পাবনা ও রাজশাহী, জয়পুরহাট, নওগাঁ ও বগুড়া ছাড়াও সিরাজগঞ্জ থেকে গরু এসেছে। এ হাট এখন গরুতে ভরে গেছে। তবে ক্রেতাও রয়েছে। দেশি গরুর পাশাপাশি হাটে এসেছে ভারতীয় গরুও। ফলে সংকরজাতের গরুর চাহিদা কমছে এ হাটে। দেশি ও ভারতীয় গরুই শুক্রবার বেশি বিক্রি হয়েছে। বিশেষ করে শাহীওয়াল জাতের গরুগুলোই ক্রেতারা পছন্দ করছেন। 
 
বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলার গরু ব্যাপারী সনাতন। নিজেরই বাড়িতে একটি গরু পালন করেছিলেন। সেটি এবার হাটে তুলেছেন। তিনি সাড়ে ৭ লাখ টাকা হলে বিক্রি করবেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত ক্রেতারা মাত্র ৩ লাখ বলেছে।

তার কাছ থেকে কিছুদূর যেতেই চোখে পড়ে ভারতীয় অনেকগুলো গরু নিয়ে ক্রেতার অপেক্ষায় ইউনুস ব্যাপারী। ইন্ডিয়ান সাদা একটি গরুর দাম তিনি পাঁচ লাখ টাকা চাইলেন। কিন্তু ক্রেতা তার মুখের ওপর বলে বসল মাত্র আড়াই লাখ টাকা।

3

অন্যদিকে দুটি ফ্রিজিয়ান জাতের গরু নিয়ে এসেছেন বগুড়ার সোনাতলার কৃষক হাবিব ও বাবু। তারা দাম চাচ্ছেন ৯ লাখ টাকা। কিন্তু ক্রেতারা দাম বলছেন, মাত্র সাড়ে চার থেকে ৫ লাখ টাকা।

হাবিব বলেন, গতবার একটি গরুই সাড়ে চার লাখ ও ৫ লাখ টাকায় বিক্রি করেছি। কিন্তু এবার বড় সাইজের গরুর ক্রেতা পাচ্ছি না। ফলে চিন্তা হচ্ছে যদি শেষমেষ গরু দুটি বিক্রি না হয়!

জিতছেন ক্রেতারা!

মিরপুরের কামাল শেখ শুক্রবার রাতে বড় সাইজের শাহীওয়াল নিয়ে পিকআপ ভ্যানে তুলে বাড়ির উদ্দেশে যাচ্ছেন। পথে যার চোখেই পড়ছে তারাই জিজ্ঞাসা করছেন দাম কত। তার এক কথা- ভাই চার দশ। মানে হলো ৪ লাখ ১০ হাজার টাকা।

কামাল শেখের কেনা গরুটির মাংস হবে প্রায় ৫ থেকে ৬ মন। এই সাইজের গরু গত বছর বিক্রি হয়েছে ৫-৬ লাখ টাকায়। কিন্তু তা এবার দুই থেকে তিন লাখ টাকা কমে বিক্রি হচ্ছে।

5

শুক্রবার গাবতলী হাটে কম বেশি প্রায় শতাধিক গরু ক্রেতার সাথে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তারা প্রত্যেকে জানিয়েছেন, তারা গরু কিনে জিতেছেন। 

শুধু গাবতলীই নয়, রাজধানীর ধোলাইখাল এলাকার বসা পশুর হাটেও খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এবার বড় সাইজের গরু এখন পর্যন্ত বেশি বিক্রি হচ্ছে না। ফলে ব্যাপারীরা চিন্তায় পড়েছেন। কেউ কেউ আবার কম দামেই ছেড়ে দিচ্ছেন। একই চিত্র বছিলা হাট, লালবাগ হাট, হাজারীবাগ হাটসহ অন্যান্য হাটেও। 

মাঝারি গরুর চাহিদা বেশি

শুক্রবার বিকেল থেকে যতো গরুর বিক্রি হয়েছে তার বেশির ভাগই ছিল মাঝারি সাইজের। তবে ছোট গরুর দাম এ হাটে ছিল চড়া। তারপরও গতবারের তুলনায় ২০ থেকে ৩০ হাজার কম। এ হাটে প্রতিটি হাসিল ঘর থেকে শুক্রবার যতো হাসিল টোকেন কাটা হয়েছে তার বেশির ভাগই ছিল ছোট ও মাঝারি সাইজের গরু ক্রেতার।

বড় গরু খুবই কম বিক্রি হয়েছে। এ হাটে মাঝারি গরুগুলো ১ লাখ ১০ হাজার থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে। আর ছোট গরু ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা। যেগুলো গতবার ছিল লাখ টাকার ওপরে। 

বড় একটি গরুর কেনার বদলে দুটি করে গরু কিনছেন অনেকে

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কেন হঠাৎ এই বড় সাইজের গরু কেনা থেকে পিছু হটলো ক্রেতা। এ হাটে প্রায় অর্ধশতাধিক ক্রেতার সাথে কথা হয়েছে। তারা প্রত্যেকে বলেছেন, বড় গরুর মাংস খেতে তেমন স্বাদ পাওয়া যায় না। তাছাড়া বড় সাইজের গরু কিনতে গেলে মাংসের কেজির দামে বেশি পড়ে। শুধু তাই নয়, বড় গরুর দাম বেশি হলেও মাংস সেই অনুপাতে পাওয়া দুস্কর হয়। ফলে গতবারের বড় গরু কেনা ক্রেতারা এবার মাঝারি সাইজের দুটি করে গরু কিনছেন।

7

গত বছর আড়াই থেকে তিন লাখ টাকার গরু এবার বিক্রি হচ্ছে মাত্র দেড় লাখ টাকায়। তার প্রমাণও মিলেছে হাট ঘুরে।  সোহাইব নামের এক ব্যক্তি দুটি গরু কিনে পিকআপে তুলে দাঁড়িয়ে আছেন। তার কাছে জানতে চাইলাম, গরুর দাম  কেমন? তিনি জানালেন, গরু দুটির দাম পড়েছে মাত্র ৩ লাখ ১০ হাজার টাকা। তার মানে প্রতি গরুর দাম পড়েছে ১ লাখ ৫৫ হাজার টাকা। তিনি বলছিলেন, গতবার বড় গরু কিনে ঠকেছেন। দাম বেশি পড়ে কিন্তু মাংস তেমন মেলে না বলে তার দাবি। 

তিনি বলছিলেন, এবার বুদ্ধি করে এজন্য দুটি নিলাম। দেখি গতবারের একটির চেয়ে মাংস বেশি আসে কিনা। তার কাছে বিক্রেতারা দুটি গরুর দাম চেয়েছিলেন ৫ লাখ কিন্তু তিনি ৩ লাখ বলার পর আরও একটু বাড়িয়ে দিয়েছেন।

ব্যাপারীরা যা বলছেন

কুষ্টিয়ার সুজা আহমেদ নামে এক ব্যাপারী জানালেন, তারা গতবার বড় সাইজের গরু এনে ধরা খেয়েছেন। বিক্রি করতে না পেরে পরে ফেরত নিয়ে গেছেন। এবার যেন এমন না হয় তার জন্য তারা সচেতন রয়েছেন। তিনি বলছেন, লাভ দরকার নেই, আসল দাম থেকে কিছুটা লাভ রেখে ছেড়ে দেব।

4

ব্যাপারীরা জানান, তারা এখনো বড় সাইজের গরুগুলো বিক্রির জন্য তেমন বড় ক্রেতা পাচ্ছেন না। যারাই আসছেন তারা তাদের হাঁকানো অর্ধেক দাম বলেই চলে যাচ্ছেন। তাদের মতে, ক্রেতারা এবার চালাক হয়েছেন, বড় সাইজের গরুর দামে তারা এবার দুটি করে গরু কিনে বাড়িতে যাচ্ছেন।

ব্যাপারীরা আরও জানান, এবার হাটের অবস্থা ভালো নয়। ক্রেতাদের হাতে তেমন টাকা নেই বলে তাদের ধারণা। কারণ অধিকাংশ ক্রেতা হাটে ঢুকেই মাঝারি গরু খুঁজছেন। ফলে বড় সাইজের গরুর কি হবে তা নিয়ে তারা এখন দুচিন্তায় পড়েছেন। 

এমআইকে/এএস