ঢাকা মেইল ডেস্ক
১৫ জুন ২০২৪, ০৮:৫৪ এএম
কোরবানির ঈদের আগে প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এবছরও চাহিদার তুলনায় বাজারে পশুর সরবরাহ বেশি থাকবে। মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, এবছর কোরবানির বাজারে চাহিদার তুলনায় প্রায় ২৩ লাখ পশু বেশি সরবরাহ হবে।
চাহিদার তুলনায় সরবরাহ বেশি থাকার এমন তথ্য অবশ্য প্রতিবছরই দেয়া হয়। কিন্তু বাজারে যদি সরবরাহ বেশিই থাকে তাহলে বিশেষত গরুর দাম কেন প্রতি বছরই চড়া সেটি একটি বড় প্রশ্ন। এছাড়া গরুর দাম একেকজন একেকভাবে নির্ধারণ করেন। কেউ ওজনে আর কেউবা উৎপাদন খরচে। কিন্তু গরুর বাজারে এমন ভিন্ন ভিন্ন মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি আর চড়া দাম কেন দেখা যায়?
গ্রামেও কেন গরুর দাম বাড়তি?
কোরবানিতে বিক্রির জন্য বাসায় গরু পালন করেন মানিকগঞ্জের সিংগাইরের কৃষক আবু বকর। এ বছর দুটি গরু কিনে বাসায় লালন-পালন করে কোরবানির জন্য প্রস্তুত করেছেন তিনি। একটি কিনেছেন ছয় মাস আগে, আরেকটি এক বছর। একটি গরুতে চার মণ মাংস হবে এমন আন্দাজেই গরুর ব্যাপারীদের কাছে দাম চেয়েছেন তিনি।
আবু বকর বলছিলেন, দুটো গরু মিলিয়ে দাম ধরেছেন দুই লাখ ৮০ হাজার টাকা। অর্থাৎ একটি গরুর দাম এক লাখ ৪০ হাজার টাকা। তিনি বলেন, ‘ব্যাপারীরা আসছে, দাম বলছে। আমিও আমারটা বলেছি। কিন্তু তারা গরু প্রতি ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা দাম কম বলছে। তাই এখনও বিক্রি করতে পারি নাই।’
আবু বকর বলছেন, পশু খাদ্যে খরচ বাড়ায় গরুর দামও এবার ১০/১৫ হাজার টাকা বাড়িয়ে দিতে হয়েছে।
কিন্তু গ্রামেও বাড়িতে গরু পালনে খরচ কেন এত বাড়ল- এমন প্রশ্নে আবু বকরের উত্তর, গ্রামেও এখন আর বিনামূল্যে কিছু পাওয়া যায় না। ‘আগে আমরা বাইরে থেকে ঘাস কেটে এনে গরুকে খাওয়াতাম। তখন পতিত জমি ছিল। এখন সব জমিতেই চাষ হয়। ঘাসের জমি নেই। বরং জমি বর্গা নিয়ে ঘাস চাষ করতে হয়। এতে জমির খরচ, চাষের খরচ, সারের দাম, পানির দাম অনেক কিছুই যুক্ত হয়। এভাবে গরু খাদ্যের প্রায় প্রতিটাই এখন কিনতে হয়। যেহেতু খাদ্যের দাম বেশি, সেহেতু গরু প্রতি ১৫ হাজার টাকা দাম না পেলে খরচ উঠে না।’
‘কসাই গরু’ বনাম ‘ঈদের গরু’
মানিকগঞ্জের আবু বকর যে গরুর দাম এক লাখ ৪০ থেকে দেড় লাখ টাকা হাঁকছেন, সেই একই আকারের গরু স্বাভাবিক সময়ে মানিকগঞ্জেই এরচেয়ে কম দামে বিক্রি হয়। এসব গরুর একটা বড় অংশেরই ক্রেতা মাংস ব্যবসায়ীরা।
মানিকগঞ্জের সিংগাইর বাসস্ট্যান্ড এলাকার মাংস বিক্রেতা মোহাম্মদ আলী জানাচ্ছেন, তারা যেসব গরু মাংস বিক্রির জন্য কেনে, সেগুলোও মূলত গ্রামে-গঞ্জে সাধারণ মানুষ কিংবা হাট-বাজার থেকেই কেনা হয়। তবে তখন গরুর মাংসের দাম কম থাকে।
চার মণ মাংস হবে এমন গরু তারা এক লাখ ২০ থেকে এক লাখ ২৫ হাজার টাকার মধ্যেই কিনতে পারেন। অথচ কোরবানির জন্য একই ওজনের গরুর দাম আবু বকর চেয়েছেন এক লাখ ৪০ হাজার টাকা। অর্থাৎ ১৫ হাজার টাকা বেশি।
কিন্তু একই এলাকায় কুরবানির সময়ে গরুর দাম ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা কেন বেড়ে যাচ্ছে? এর উত্তরে আসছে ‘কসাই গরু’ তত্ত্ব আর বাজারে চাহিদা কম থাকার কথা। বিষয়টা খোলাসা করলেন মাংস বিক্রেতা মোহাম্মদ আলী।
‘দেখেন আমরা একই জায়গা থেকেই গরু কিনি। কিন্তু আমরা যেটা কিনি সেটা হলো কসাই গরু। অর্থাৎ আমরা গরুর রং, সৌন্দর্য ইত্যাদি দেখবো না। আমরা দেখবো মাংস কেমন হবে সেটা। কিন্তু কোরবানির সময় সুন্দর, দেখতে ভালো, স্বাস্থ্য ভালো এমন গরু বাজারে উঠে বেশি। এসব গরু তারা কম দামে ছাড়বে না।’

‘দ্বিতীয় ব্যাপার হচ্ছে, ঈদে গরুর চাহিদা বেশি থাকে। ক্রেতা বেশি থাকে। সুতরাং দাম এমনিতেই বেড়ে যায়। আর কৃষক, খামারি সবাই ঈদের জন্য আলাদাবাবে গরু পালে, তারা ঈদের বাজার ধরার জন্যই অপেক্ষা করে। ফলে দাম বাড়ে। এটাকে আপনি স্বাভাবিক সময়ের সঙ্গে তুলনা করতে পারবেন না।’
কৃষক থেকে খামার; আরেক দফায় দাম বৃদ্ধি
দেশে একটা সময় গ্রামে-গঞ্জে সাধারণ কৃষকদের প্রায় সবাই গরু পালতেন। তখন খুব সহজেই অল্প খরচে গরু পালন করা যেত। তবে একপর্যায়ে গরুর চাহিদা বৃদ্ধি পায়। নিত্যনতুন খামার গড়ে উঠতে শুরু করে। এটা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায় ২০১৪ সালের পর। তখন ভারত থেকে গরু আমদানি বন্ধ হয়ে যায়।
এর আগে বাংলাদেশে কোরবানির ঈদে গরুর চাহিদা মিটতো মূলত তিনভাবে। এক. গ্রামে-গঞ্জে প্রান্তিক কৃষকদের বাড়িতে পালা গরু। যেগুলো কম খরচে পালন করা যেত। দুই. ছোট ছোট গরুর খামারে পালন করা গরু। তিন. ঈদের আগে আগে ভারত থেকে ব্যাপকভাবে গরুর আমদানি। সারা বছর ধরেই ভারতীয় গরু বাংলাদেশে এলেও ঈদের সময় সেটি ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পেতো এবং কুরবানির চাহিদা মেটাতে ভূমিকা রাখতো।
তবে এক দশক আগে যখন ভারত থেকে বাংলাদেশে গরু আসা বন্ধ হয় যায়, তখন মাংস এবং গরুর চাহিদা মেটাতে শহরে-গ্রামে সবখানেই খামার গড়ে উঠতে শুরু করে। এসব খামারে কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে গরু মোটাতাজাকরণের বাণিজ্যিক মডেল বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
খামারে গরু পালন করা ব্যয়বহুল। যেহেতু খামারে বিনিয়োগ দরকার হয়, প্রতিটি খাদ্য কিনে খাওয়াতে হয়, ফলে গরু পালনে ব্যয়ও বেড়ে যায়।
ফলে খামারগুলোর একটা বড় অংশই উৎপাদন খরচের সঙ্গে লাভ হিসেব করে দাম নির্ধারণ করে।
নারায়ণগঞ্জের সিয়ান এগ্রোর ম্যানেজার আমিন খান বলেন, প্রতি বছরই পশুখাদ্যের দাম বাড়ছে। সেইসঙ্গে বিদ্যুৎ, পানিসহ আনুষঙ্গিক খরচও বাড়ছে। ‘আমরা বিভিন্ন খাবার একসঙ্গে মিশিয়ে খামারের জন্য যে খাদ্য তৈরি করি সেটা এক বছর আগেও তৈরি করতে লাগতো ৪৪ টাকা কেজি। তারপর বাড়তে বাড়তে সেটা হয়ে যায় ৫৪ টাকা কেজি। এর সঙ্গে শ্রমিক খরচ, বিদ্যুৎ, পানির খরচ ইত্যাদি তো আছেই। ফলে এবারও গরুর দাম বাড়াতে হবে আমাদের। সেটা না করলে উৎপাদন খরচ উঠবে না।’
এসব খামারে গ্রাম-গঞ্জ থেকে দেশি গরু কিনে মোটাতাজা করা হয়। পরে এগুলো আরও বেশি দামে বিক্রি হয়। আর যেসব গরু উন্নত জাতের, সেগুলোর দাম আরও চড়া থাকে। সূত্র: বিবিসি বাংলা
জেবি