জেলা প্রতিনিধি
২১ মে ২০২৩, ০১:১৬ পিএম
‘বাপুরে, আমগোর বড় এডা গরুর শইলে (শরীরে) ঘাঁ অইয়া মইরা গেছে গা। আমার পুলা আলতাফ আলি সমতি থাইক্কা (থেকে) ৬০ হাজার ট্যাহা (টাকা) কিস্তি তুইল্লা (নিয়ে) গরুডা কিনছিল। নায়নাতি মিইল্লা আমগোর ৮ জন খাওয়ার মানুষ। কামাই করার কেউ নাই, পুলাডা কামলা (দিনমজুর) দিয়ে সংসার আর কিস্তি চালায়। এতো আশা কইরা গরু পাললাম, গরুই তো মইরা গেল। আরেডা (আরেকটা) বাছুর আছে, অইডাই গাও (এলএসডি) অইছে। এহন কিস্তি ক্যামনে দিবো, চিন্তায় বাঁচতেছি না।’
কথাগুলো বলছিলেন শাহ জাহান আলী (৭০)। শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার নয়াবিল ইউনিয়নের আন্ধারুপাড়া গ্রামের গরুর খামারি তিনি।
তিনি বলেন, হাসপাতালের ডাক্তর আইলে ভিজিট একহাজার ট্যাহার কম নেয় না। আর মংগা বড়ি (দামি ওষুধ) লেইক্কে (লেখে) দে। আমরা তো গরিব মানুষ, অতো ট্যাহা ভিজিট দিবার পাই না। তাই সরকারি ডাক্তর (চিকিৎসক) আহে না।
শাহ জাহান আলীর মতো শেরপুরে আরও অনেকের গরু—‘ল্যাম্পি স্কিন’ নামে ভাইরাসজনিত সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হয়েছে, মারাও গেছে অনেকের। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না পেয়ে প্রত্যন্ত অঞ্চলে এ রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। এই চর্মরোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারিরা। ভাইরাসবাহিত লাম্পি স্কিন রোগের প্রাদুর্ভাবে এখন দিশেহারা তারা।
খামারিদের অভিযোগ, বাড়িতে সরকারি চিকিৎসক আনতে গেলে গুণতে হয় মোটা অংকের ভিজিট। এদিকে, এই রোগের চিকিৎসায় মোবাইল টিম গঠন করা হয়েছে এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের।
শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার নয়াবিল ইউনিয়নের আন্ধারু পাড়া, মধ্য আন্ধারু পাড়া, চাটকিয়া, দাউদরা ও পোড়াগাঁও ইউনিয়নের পলাশিকুড়াসহ বিভিন্ন গ্রামে ও অন্যান্য ইউনিয়নেও দ্রুত ছড়াচ্ছে ল্যাম্পি স্কিন। এছাড়াও শেরপুর সদরের চরশেরপুর ও লছমনপুর ইউনিয়নে দেখা দিয়েছে এ রোগ।
ঢাকা মেইলের সঙ্গে কথা হয় নয়াবিলের আন্ধারু পাড়ার ২০ কৃষকের। তারা জানায়, পশু হাসপাতালের সরকারি চিকিৎসককে তারা চেনেনই না। এ এলাকায় ছয় মাসেও পা রাখে না সরকারি চিকিৎসক। যাও দুই একজন অফিসের ছোট চিকিৎসক (অন্যান্য পোস্টের) নিয়ে আসলেও দিতে হয় মোটা অংকের ভিজিটের টাকা। অফিসে গেলেও অফিসে লোক রাখা আছে, তারা স্যারের ভিজিট দিতে বলে। সরকারি হাসপাতালেও ভিজিট ছাড়া নড়ে না ডাক্তার। তারা আরও জানায়, যদি সরকারি ডাক্তার এসে এ রোগ সম্পর্কে এখানে একটা সভা সেমিনার করতো, তাহলে আমরা সব জানতে পারতাম। ক্ষতিটাও কম হতো।
মধ্য আন্ধারু পাড়ার শ্রমিক রুবেল মিয়া সমিতি থেকে লোন নিয়ে একটি বাছুর গরু কিনেছে দেড় বছর আগে। হঠাৎ গত সপ্তাহে তার সেই গরুটির লাম্পি স্ক্রিন ডিজিজ দেখা দেয়। এখন মাটিতে একেবারে পড়ে গেছে। অবস্থাও আশংকাজনক। খবর দিয়েও সরকারি চিকিৎসকের দেখা মেলেনি।
তিনি জানান, আমরা গরিব মানুষ। হাসপাতালে নিয়ে গেলেও ভিজিট চায় ডাক্তররা। আর সরকারি ডাক্তর এলাকায় বছরেও পা রাহে না। আমি যোগাযোগ করেছি, আসেনি। পরে পল্লী চিকিৎসক দিয়ে ব্যবস্থা করাইতেছি, এখন হাল ছেড়ে দিছি।
একই এলাকার কৃষাণী আয়শা সিদ্দিকার গাভীরও এ রোগ হয়েছে, চলছে চিকিৎসা।
আন্ধারুপাড়া গ্রামের লালচাঁন মিয়ার ৩টি ষাঁড় গরু আক্রান্ত হয়। চিকিৎসায় একটি সুস্থ হয়েছে আর বাকি দুটির চিকিৎসা চলছে। এছাড়া ওই এলাকার কৃষক রুহুল আমীনের ১টি, মুনসুর আলীর ১টি গরুর চিকিৎসা চলছে।
নালিতাবাড়ীর দাউদরা এলাকার শিক্ষিত যুবক এরশাদ আলী। গেল সপ্তাহে তার খামারের একলাখ টাকার বড় গরুটি এ রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে।
তিনি ঢাকা মেইলকে বলেন, আমার বিরাট ক্ষতি হয়ে গেছে। এতোবড় গরুটি মারা গেছে। সরকারি চিকিৎসক আমাদের এলাকায় সেমিনার করে যদি এ রোগ সম্পর্কে সচেতনতামূলক সভা করতো, তাহলে আমাদের বিরাট উপকার হতো।
পোড়াগাঁও ইউনিয়নের বুনারপাড়া গ্রামের আবু হানিফের ৪০ হাজার টাকা দামের একটি গরু মারা গেছে।
একই রোগে নয়াবিল ইউনিয়নের দাওয়াকুড়া গ্রামের কৃষক আবু সাইদের প্রায় ৩০ হাজার টাকা মূল্যের একটি বকনা বাছুর মারা গেছে। একই রোগে আক্রান্ত হয়ে ওই গ্রামের কৃষক আবদুল মতিনের প্রায় ৮০ হাজার টাকা মূল্যের একটি গাবিন গরু ও আন্ধারুপাড়া গ্রামের কৃষক মনিরুজ্জামান মানিকের প্রায় ৫০ হাজার টাকা মুল্যের একটি ষাঁড় বাছুর মারা যায়।
আবদুল মতিন ঢাকা মেইলকে জানান, গ্রামের একজন মানুষের ৮০ হাজার টাকা মূল্যের গরু মারা যাওয়া মানে, স্বপ্ন মরে যাওয়া। তারপর আমার গরুটি গাবিন (গর্ভবতী) ছিল। দুটি জীবন চোখের সামনে চলে গেলো।
প্রায় দুই মাস আগে উপজেলার ভোক্তভোগী কৃষকরা তাদের গরুর শরীরে এই লাম্পী স্কীন রোগের দেখা পান। এই রোগে আক্রান্ত গরুর শরীরে গুটি বের হয়ে শরীর ফুলে যায় পচন ধরে ও রক্ত বের হয়। গরুর শরীরে জ্বর থাকে। গরু খাওয়া দাওয়া ছেড়ে দেয়। সময়মতো সঠিক চিকিৎসা না নিলে গরু মারা যায়। বর্তমানে এই রোগটি আস্তে আস্তে উপজেলার সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ছে। এতে বেশ কয়েকজন কৃষকের আক্রান্ত গরু মারা যাওয়ায় আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন তারা। তাই ওই এলাকার কৃষকরা এখন আতঙ্কে রয়েছেন।
কিন্তু এই রোগ নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই বলে মন্তব্য করেছেন জেলা প্রাণিসম্পদ বিষয়ক কর্মকর্তা ডা. মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি জানান, শেরপুরে সম্প্রতি লাম্পিস্কিন ডিজিস দেখা দিয়েছে। মূলত রোগটি মশা, মাছি, আক্রান্ত পশুর ব্যবহৃত নিডল ও সিরিঞ্জের মাধ্যমে গরু থেকে গরুতে ছড়িয়ে পড়ে। তাই আক্রান্ত গরুটিকে অবশ্যই কোয়ারেন্টিন করে চিকিৎসা নিতে হবে।
এদিকে, দায়িত্বে অবহেলার ও ভিজিটে টাকা নেওয়ার ব্যপারে বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি ঢাকা মেইলকে বলেন, ইতোমধ্যে টিম গঠনের মাধ্যমে নালিতাবাড়ী উপজেলায় লাম্পিস্ক্রিন ডিজিজের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। আর যদি দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ উঠে তাহলে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। সরকারি যেসকল ওষুধ বিনামূল্যে বিতরণের নির্দেশনা আছে, যদি সেক্ষেত্রে আর্থিক লেনদেন করে থাকে প্রমাণ পেলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রতিনিধি/এইচই