images

সারাদেশ

পাথরের কণায় জীবনের ঝুঁকি

জেলা প্রতিনিধি

০১ মে ২০২৩, ০৯:১৫ এএম

দীর্ঘদিন ধরে নিদ্রাহীনতা, মাথা ব্যথা, মাথা ঝিমঝিম করা, ঠাণ্ডা, কাশি, জ্বর ও বমিভাবসহ বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় ভুগছেন শহিদুল মিয়া (৫২)। তিনি কাজ করেন পাথর ভাঙা শ্রমিক হিসেবে। শুধু শহিদুল নন, তার মতো অনেকেই ভুগছেন একই সমস্যায়। এসব শ্রমিক শেরপুরের নাকুগাঁও স্থলবন্দরে পাথর ভাঙার কাজ করেন। কোনো ধরনের ব্যক্তিগত সুরক্ষাসামগ্রী (পিপিই) ছাড়াই কাজ করার ফলে নাক-মুখ দিয়ে পাথরের গুড়ো ভেতরে ঢুকে ফুসফুসের ক্ষতি করে এবং তাদেরকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন পাথর ভাঙার কাজ করা শ্রমিকদের ফুসফুসের মারাত্মক ক্ষতিকর ‘সিলিকোসিস’ রোগ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, যা মূলত পেশাগত রোগ। এটি এমন একটি রোগ, যার মূলে রয়েছে ‘ক্রিস্টালাইজড সিলিকা’ বা স্ফটিকাকৃতি বালি বা পাথরের কণা। যেসব স্থানে এমন কণা উড়ে সেই পরিবেশে দীর্ঘদিন কাজ করলে বালি বা পাথরের কণা জমে ফুসফুসের উপরিভাগের মারাত্মক ক্ষতি হয়ে ‘সিলিকোসিস’ হতে পারে। পাথর ভাঙার সময় নিঃশ্বাসের সঙ্গে বালি বা পাথরের কণা ঢুকে ফুসফুসের সূক্ষ্ম ছিদ্রগুলোকে বন্ধ করে দেয়। এমনকি পাথরের ধুলিকণা নাক, মুখ ও চোখের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করায় ফুসফুস কর্মক্ষমতা হারায়। এমনকি মৃত্যুও হয় আক্রান্ত ব্যক্তির। এই রোগের উপসর্গ হচ্ছে—বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, জ্বর এবং শেষ দিকে শরীর নীল হয়ে যাওয়া।

এসব পরিবেশে কাজের সময় নাক-মুখে মাস্ক বা গামছা দিয়ে ঢাকতে হবে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। এছাড়া চশমা ব্যবহার এবং হাত মোজা ও বিশেষ পোশাক পরার কথাও বলেছেন তারা।

তবে বেশিরভাগ পাথর ভাঙা শ্রমিকের এ বিষয়ে তেমন কোনো সচেতনতাই নেই। অন্যদিকে শ্রমিকদের সেফটি পোশাক পরে কাজ করার তাগিদ দিলেও তারা বিষয়টি আমলে নিচ্ছেন না বলে দাবি মালিকদের।

may da

এদিকে স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, রোগটি সম্পর্কে সচেতনতায় শ্রমিক-মালিকদের নিয়ে নিয়মিত সভা সেমিনার করা হয়।

শেরপুরের সীমান্তবর্তী নালিতাবাড়ীতে তেমন কোনো কর্মক্ষেত্র না থাকায় অনেকটা বাধ্য হয়েই পাথর শিল্পে কাজ করছেন স্থানীয়রা। আর এতে মারাত্মক ব্যাধি ‘সিলিকোসিস’ ঝুঁকিতে রয়েছেন বন্দরের শত শত শ্রমিক।

বন্দরের আমদানি-রফতানিকারক সমিতির তথ্য মতে, এ বন্দরে পাথর শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িয়ে আছেন প্রায় ২ হাজার মানুষ। আর বন্দরে প্রায় দেড় হাজার শ্রমিক নিয়মিত কাজ করছেন। পাথর আসে ভারত ও ভুটান থেকে। সেসব পাথর ভাঙার জন্য রয়েছে ৬০টির মতো ক্রাশিং মেশিন। শ্রমিকদের একটি বড় অংশ নারী।

may day

শ্রমিক শিমুন্তী কোচ (৩৮) বলছিলেন, বাপুরে ঠাণ্ডা-কাশি সারা বছরই লেগে থাকে। মেশিনের শব্দে মাথা ঝিমঝিম করে। তবুও পেটের দায়ে কষ্ট করে আমরা পাথরের কাজ করি। পাথর ভাঙার কাজটা খুব কষ্টের।

বন্দরে সরেজমিনে দেখা যায়, ভারত ও ভুটান থেকে আমদানি করে আনা পাথর ট্রাক থেকে নামানো হচ্ছে। আর সেসব পাথর ক্রাশিং মেশিনে ভাঙা হচ্ছে। এতে শব্দ ও বায়ু দুটোই দূষণ হচ্ছে। ধুলোয় চারদিকে প্রায় অন্ধকার, কিন্তু এর মধ্যেও দেদারসে চলছে পাথর ভাঙার কাজ। কেউ কেউ অবশ্য গামছা পেঁচিয়ে বা মাস্ক পরে কাজ করছেন।

পাথর ভাঙা শ্রমিক আব্দুল আজিজ জানান, তার স্ত্রী পাথর ভাঙার কাজ করতেন। দীর্ঘদিন কাজ করার পর তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। ঘনঘন কাশি, বুক ব্যথা, এমনকি সারা শরীরে ব্যথা ছিল। পরে আর সুস্থ হয়ে উঠেননি।

শ্রমিক নেতা সাদ্দাম হোসেন বলেন, সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত পাথর ভাঙা মেশিনের উচ্চ শব্দ আর ধুলা-বালুর মধ্যে কাজ করতে হয় আমাদের। রাতে মাথাব্যথা ও নিদ্রাহীনতায় ভোগেন অধিকাংশ শ্রমিক। পাথর থেকে হওয়া ধুলা শ্রমিকদের নাক ও মুখ দিয়ে শরীরের ভেতরে প্রবেশ করে। শ্রমিকদের অনেকেই দীর্ঘদিন কাজ করার পর শ্বাসকষ্ট, সর্দি-জ্বরসহ নানান রোগে আক্রান্ত হয়।

বন্দরের আমদানি-রফতানিকারক সমিতির সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান ঢাকা মেইলকে বলেন, আমরা মালিকপক্ষ শ্রমিকদের মাস্ক ও গামছা দিয়ে মুখ ঢেকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে কাজ করতে উৎসাহিত করি। তবে অনেকেই অসচেতন থাকে। আমরা সবসময় শ্রমিকদের পক্ষে আছি।

‘সিলিকোসিস’ রোগটি সম্পর্কে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক বাহাদুর শাহ মামুন ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘সিলিকোসিস’ শব্দটি বাংলাদেশে খুব বেশি পরিচিত নয়। কিন্তু এটি একটি মরণব্যাধি, যা ফুসফুসের প্রদাহজনিত রোগ। এ রোগে আক্রান্তদের শ্বাস-প্রশ্বাসে কষ্ট হয়, সর্দি-কাশি, জ্বর সবসময় লেগে থাকে, শরীর দিন দিন দুর্বল হয়ে পড়ে ও ধীরে ধীরে ওজন কমতে থাকে। একসময় আক্রান্ত ব্যক্তি মারা যায়। সাধারণত পাথর ভাঙার সময় সিলিকা শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে দেহের ফুসফুসে প্রবেশ করে। ভেতরে গিয়ে ফুসফুসের সূক্ষ্ম ছিদ্রগুলোকে বন্ধ করে দেয়। পাথরের ধুলিকণা নাক, মুখ এমনকি চোখের মধ্য দিয়ে শরীরে প্রবেশ করায় ফসফুসের কর্মক্ষমতা ধীরে ধীরে কমে যায়।

এ রোগের চিকিৎসার ব্যাপারে তিনি বলেন, এ রোগের একমাত্র চিকিৎসা প্রতিরাধ ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা। কাজের সময় নাক-মুখ মাস্ক বা গামছা দিয়ে ঢেকে নিতে হবে। চশমা ব্যবহার করতে হবে, হাত মোজা ও বিশেষ পোশাক পরতে হবে।

বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের জেলা সভাপতি মেরাজ উদ্দিন ঢাকা মেইলকে বলেন, সংসার চালাতে ঝুঁকি নিয়েই কাজ করেন এ অঞ্চলের শ্রমিকরা। তাই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে শ্রমিকদের একটা বিরাট অংশ সিলিকোসিসসহ ভয়াবহ রোগে আক্রান্ত হতে পারে। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর, স্থানীয় প্রশাসন, জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ ও বিভিন্ন বেসরকারি এনজিও একসঙ্গে কাজ করলে পাথর ভাঙা শ্রমিকদের সিলিকোসিস রোগের বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি করা যাবে। আর শ্রমিকদের নিরাপদ পোশাকের ব্যবস্থা মালিকপক্ষকেই করতে হবে।

এ বিষয়ে জেলা সিভিল সার্জন ডা. অনুপম ভট্টাচার্য্য ঢাকা মেইলকে বলেন, নীরব ব্যাধি সিলিকোসিস থেকে শ্রমিকদের নিরাপদ থাকার জন্য স্বাস্থ্য সচেতনতা বিষয়ক কর্মশালাসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ শ্রমিক ও মালিকদের নিয়ে নিয়মিত স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক সেমিনার করে আসছে।

প্রতিনিধি/এইচই