images

সারাদেশ

ঘুরে আসুন সবুজ নগরীতে

জেলা প্রতিনিধি

২১ এপ্রিল ২০২৩, ০৯:১৯ পিএম

মহাকাল গড় রূপান্তরিত হয়ে রামপুর-বোয়ালিয়া ও পরে জায়গা করে নেয় রাজশাহী নামে। সেই রাজশাহী এখন গ্রিন ও ক্লিন সিটি হিসেবে সুপরিচিত। কয়েক দশক আগের ধূলিকণা ও দুর্গন্ধময় শহরটি এখন বিশ্বের অন্যতম বাসযোগ্য শহর। শহরের সবুজ প্রকৃতি ও পদ্মার নির্মল বাতাস উপভোগে জুড়ি নেই রাজশাহীর।

শুধু সবুজ প্রকৃতি আর পদ্মার মনোমুগ্ধকর দৃশ্যই নয়, এই শহরে রয়েছে রেশম, আম ও চোখ জুড়ানো আলোকায়নও। কোনো ঝামেলা ছাড়াই একান্ত কিছু সময় কাটানো যায় শিক্ষা নগরী খ্যাত এই ছোট্ট শহরে। তাই এবারের ঈদের ছুটিতে ঘুরে বেড়ানোর আদর্শ স্থান হতে পারে ক্ষতিকর ধূলিকণা ও দূষণ কমানোয় বিশ্বের অন্যতম সেরা শহর রাজশাহী।

রাজশাহী শহরের আয়তন ৯৬ দশমিক ৭২ বর্গ কিলোমিটার। শহরের প্রায় পুরোটাই পদ্মা নদী বেষ্টিত। তাই শহুরে জীবনের মাঝেও যারা নদীর কলকল ধ্বনি শুনতে চান তারা আসতে পারেন এই শহরে। যেখানে থাকবে না কোনো কোলাহল, হৈ-হুল্লোড়, ধুলোবালি বা কালো ধোঁয়ার ভয়াল থাবা, বাস-ট্রাকের অবিরত হর্ন, কিংবা শিল্প-কারখানার বর্জ্য দূষণের অবিরাম নিঃসরণ। ঘণ্টার পর ঘণ্টা জ্যামে বসে সময়কে অসময়ের হাতে বিসর্জন দেওয়া ও অনিচ্ছাকৃত মন খারাপও থাকবে না এই শহরে।

লালন শাহ পার্ক বা মুক্তমঞ্চ:

বুক ভরে পদ্মা নদীর নির্মল বাতাস নিতে নগরীর লালন শাহ পার্ক কিংবা মুক্তমঞ্চ থাকতে পারে পছন্দের শীর্ষে। প্রতিদিন বিকেলে লাখো মানুষ ভিড় করেন এখানে। এছাড়া পদ্মার তীরকে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে সাজিয়ে তোলা হয়েছে অনেক আগেই। তাই সব সময়ই শহরের আই-বাঁধ, টি-বাঁধ ও বড়কুঠি এলাকা থাকে লোকে লোকারণ্য। পদ্মায় পানি থাকুক আর নাই থাকুক নির্মল বাতাস আর বাঁধভাঙা আনন্দে মনটাকে যে ভাসাতে পারবেন তা অনেকটা নিশ্চিত করেই বলা যায়।

নদীর পাড় জুড়ে জেগে থাকা ছোট-বড় বালুচর আর রয়েছে ক্ষুদ্র বনভূমি। তপ্ত বালুচরেও খুঁজে পেতে পারেন এক অন্যরকম আনন্দ। এই ঈদের ছুটিতে যা আপনাকে নিয়ে যাবে জীবনের ভিন্ন কোনো রোমাঞ্চকর স্মৃতিতে। কাটবে অনাবিল মুহূর্ত। উপভোগ্য হবে ঈদের ছুটি।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়:

দেশের অন্যতম সেরা বিদ্যাপীঠ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও দেশসেরা রাজশাহী কলেজ, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ ও রাজশাহী প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে এই শহরেই। বিখ্যাত সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য শহরটি শিক্ষানগরী হিসেবেও বেশ পরিচিত। বনভূমি আর অরণ্যে আচ্ছাদিত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। অনিন্দ্য সুন্দর নান্দনিক সাজে সবসময় যেন অতিথিদের বরণে সেজে থাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যারিস রোড। যার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নেই কোনো বাঁক, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একদম সোজা।

সড়কের দু’পাশে দাঁড়িয়ে যে কাউকে স্বাগত জানায় বিশাল বিশাল রেইন ট্রি, কেওড়া, কৃষ্ণচূড়া, দেবদারু আর পাতাবাহারের সারি। আর প্রতিটি ভবনের সামনে-পেছনে তো রয়েছেই সুবিশাল আর সুস্বাদু আম বাগান। বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনের পাশেই মুক্তিযুদ্ধের স্বাক্ষর রেখে যাওয়া ভাস্কর্য সাবাস বাংলাদেশ, স্বচ্ছ আর বিস্মৃত যার উন্মুক্ত মঞ্চ, ঝকঝকে সিঁড়ি, যেখানে রাত কাটে কতশত দুঃখ আর আনন্দমাখা মুখের হাজারো শিক্ষার্থীর। এছাড়াও রয়েছে কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তন, কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি, বোটানিক্যাল গার্ডেন, পাশ দিয়ে চলে যাওয়া রেললাইন আর তার পাশের চারুকলা। যেখানে গেলে নিমিষেই মন ভালো হবে যে কারোরই।

বধ্যভূমি:

বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছুদূর পেছনে গেলেই চোখে পড়বে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত বধ্যভূমি। যেখানে জড়িয়ে আছে ৭১'র মহান মুক্তিযুদ্ধের ভয়ংকর নানা মুহূর্ত। নাম না জানা অসংখ্য শহীদের আত্মত্যাগের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে স্মৃতিস্তম্ভটি। ১৯৭২ সালের ২৩ এপ্রিল আবিষ্কৃত একটি গণকবরের ওপর নির্মিত হয় স্মৃতিস্তম্ভটি। তৎকালীন মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলাম এবং স্থানীয় ঠিকাদার জেবর মিয়া গণকবরটি খনন করেন। মৃত্যুকূপ থেকে বেরিয়ে আসে হাজারও মানুষের মাথার খুলি আর কঙ্কাল।

যুদ্ধের ৯ মাস ধরে পাকিস্তানি বাহিনী এবং রাজাকার ও আল-বদররা বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্শ্ববর্তী কাটাখালি, মাসকাটা দীঘি, চৌদ্দপাই, শ্যামপুর, ডাশমারী, তালাইমারী, রানীনগর ও কাজলার কয়েক হাজার নারী-পুরুষকে এখানে ধরে এনে হত্যা করে। তাদের হাত থেকে রেহাই পাননি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, ছাত্র, কর্মচারী এবং তাদের পরিবারের সদস্যরাও। আর সেই সময় শহীদ শামসুজ্জোহা হল ছিল পাকিস্তানি বাহিনীর ঘাঁটি। এই হলের পেছনে এক বর্গমাইল এলাকাজুড়ে ছিল বধ্যভূমি। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন কাজলা এলাকা এবং রেলস্টেশন এলাকায়ও ছিল বেশ কয়েকটি গণকবর।

বরেন্দ্র জাদুঘর:

রাজশাহী আসবেন আর বরেন্দ্র জাদুঘর দেখবেন না, তবে ভ্রমণ পরিপূর্ণতা পাবে কিসে? বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রাচীন ও প্রথম প্রত্নসম্পদ সংগ্রহশালা রাজশাহীর বরেন্দ্র জাদুঘর। যা বাংলার ব-দ্বীপ অঞ্চলের প্রত্নতাত্ত্বিক কোষাগার হিসেবেও অধিক পরিচিত। খ্রিস্টপূর্ব ২৫০০ অব্দ থেকে ১৯০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সময়কালের বহু প্রত্ননিদর্শন এ জাদুঘরে সংগৃহীত রয়েছে। পাল সেন আমলের প্রতিমা ভাস্কর্যের জন্য জাদুঘরটির খ্যাতি বিশ্ব পরিমণ্ডলেও। প্রত্ন নিদর্শনগুলো প্রধানত প্রস্তর, স্বর্ণ, রৌপ্য, তাম্র, পিতল, ব্রোঞ্জ, লৌহ, মৃন্ময় জাতীয় পদার্থ দিয়ে নির্মিত।

জাদুঘরে মৌর্য, গুপ্ত, পাল, সেন, সুলতানি ও মুঘল আমলের অমূল্য সব প্রত্ন নিদর্শন রয়েছে। এগুলোর মধ্যে কিছু কিনে আনা হয়েছে, আবার অনেকে স্বেচ্ছায়ও দান করেছেন। জাদুঘরের ১৪টি গ্যালারিতে এগুলো সাজিয়ে রাখা হয়েছে। এখানে মহাস্থানগড়, পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার, ময়নামতির অনেক অমূল্য প্রত্নসম্পদও সংগৃহীত রয়েছে। জাদুঘরের বৌদ্ধ গ্যালারিতে পঞ্চম শতাব্দীর একটি বেলে পাথরের মূর্তি রয়েছে। এ ধরনের মূর্তি বাংলাদেশ চারটি রয়েছে। তার মধ্যে বরেন্দ্র জাদুঘরেই রয়েছে দুটি। এছাড়া ৩য় ও ৫ম শতাব্দীর হিন্দু দেব-দেবীর মূর্তি, বিভিন্ন যুগের প্রায় ৬ হাজার মুদ্রা, ৩৮টি স্বর্ণমুদ্রাসহ দেখার রয়েছে অনেক কিছুই।

হযরত শাহ মখদুম (র.) এর মাজার:

পীর সাধকের পুণ্যভূমি হিসেবে খ্যাত রাজশাহী নগরী। এ অঞ্চলে কুসংস্কার আর অপপ্রথার নিবিড় অন্ধকারের অতল গহ্বরে ডুবে থেকে নানা অপকর্ম, দেব-দেবীর নামে নরবলি, মানুষে মানুষে প্রকট ভেদাভেদ যখন ছিল নিত্তনৈমিত্তিক ঘটনা। তখনই সূদুর মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে ঘটতে থাকে পীর সাধকের আগমন। অবোধ মানুষের মাঝে জ্ঞানের শিখা ছড়ানোর মহৎ উদ্দেশ্যে ও বঞ্চিত মানুষের অধিকার আদায়ের প্রতিজ্ঞায় ও মনুষ্য সম্প্রদায়ের কল্যাণে জীবনের সব সময়টুকু বিলিয়ে দেন তারা। পথ পরিক্রমায় ডিঙ্গাতে হয় নানা প্রতিকূলতার দেয়াল। এমনকি প্রাণ বিসর্জনও দিতে হয় অনেককে। এদেরই একজন পদ্মা পাড়ে চিরশায়িত হযরত শাহ্ মখদুম রূপোশ (রহ)।

নগরীর সাহেব বাজার এলাকায় পদ্মা পাড় সংলগ্ন হযরত শাহ মখদুম (র.) এর মাজার অবস্থিত। প্রতিদিন রাজশাহী তো বটেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তের লোকজন আসে তার করব জিয়ারত করতে। ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ দিবসে মাজার এলাকায় ভিড় থাকে চোখে পড়ার মতো।

আমের শহর রাজশাহী:

রাজশাহী ও আম- একটি ছাড়া অপরটি যেন অপূর্ণ। রাজশাহীর আম, যার স্বাদ ও সুখ্যাতি রয়েছে দেশজুড়েই। জ্যৈষ্ঠ মাস শুরু হতে এখনও বেশ বাকি। তাই রাজশাহী বেড়াতে এসেও পাকা আমের স্বাদ নেওয়ার সুযোগ থাকছে না এখনই। তবে কাঁচা আম খাওয়া যাবে একটু যাচাইয়ের মাধ্যমেই। আর প্রাণ খুলে বেড়ানো যাবে আমের রাজ্যে। ইতিমধ্যে বাগানগুলোতে থোকায় থোকায় গুটি বাঁধতে শুরু করেছে নানান জাতের আম। আর ক’দিন পরেই আকারে পূর্ণতা পাবে এসব আম।

পুঠিয়া রাজবাড়ী:

রাজশাহী শহরেই শুধু নয় বরং এর আশপাশেও রয়েছে বেশ কিছু বিখ্যাত ও ঐতিহাসিক স্থাপনা। যেগুলো দেখতে দর্শনার্থীদের ভিড় লেগে থাকে বছরজুড়েই। তার মধ্যে অন্যতম পুঠিয়ার রাজবাড়ী।

রাজবাড়ীর দর্শনীয় দিকগুলো হলো- পাঁচআনি জমিদারবাড়ী, রাজবাড়ী, গোবিন্দ মন্দির, বড় শিব মন্দির, জগন্নাথ বা রথ মন্দির। প্রাচীনত্বের দিক দিয়ে পুঠিয়ার রাজবংশ বৃহত্তর রাজশাহী জেলার জমিদার বংশগুলোর মধ্যে তৃতীয়।

পুঠিয়া রাজবাড়ীর বিশাল চত্বরে রয়েছে নজর কাড়া প্রাচীন কয়েকটি মন্দির। এছাড়াও পুকুর-দীঘিসহ রয়েছে নানান প্রাচীন স্থাপনা। রাজশাহী শহর থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে এবং রাজশাহী-নাটোর মহসড়ক থেকে মাত্র এক কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত এই রাজবাড়ী। পুঠিয়ার রানি ভুবন মোহিনী দেবী ১৮২৩ সালে এটি প্রতিষ্ঠা করেন। পুঠিয়ায় অবস্থিত অধিকাংশ মন্দিরে পোড়ামাটির ফলক আছে। এখানকার পুরাকীর্তির মধ্যে পাঁচআনি রাজবাড়ী বা পুঠিয়া রাজবাড়ী, চারআনি রাজবাড়ী ও ১৩টি মন্দির রয়েছে।

বাঘা শাহী মসজিদ:

৫০০ বছরের প্রাচীন স্থাপত্যের অন্যতম নিদর্শন রাজশাহীর বাঘা শাহী মসজিদ। রাজশাহী শহর থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থান এ মসজিদের। হাজার বছর আগে বাগদাদের আব্বাসীয়া আমলের খলিফা হারুনুর রশীদের বংশধর হযরত মওলানা শাহ আব্বাসের পুত্র হযরত মওলানা শাহ মুয়াজ্জিম উদ্দৌলা ওলি ঘর সংসার ত্যাগ করে রাজশাহীর বাঘার গহীন অরণ্যে আস্তানা গড়েন। যিনি পরিচিতি লাভ করেন হযরত শাহদৌলা (র.) নামে। বাঘায় এসে তিনি ইসলাম প্রচারের স্বার্থে আধ্যাত্মিক সাধনা শুরু করেন। ওই সময়ই ঐতিহাসিক এই মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয় বলে জানা গেছে।

আধুনিক আলোকায়নে নৈসর্গিক সৌন্দর্যে রাজশাহী:

গত পাঁচ বছরে অভূতপূর্ব পরিবর্তন এসেছে রাজশাহীর সড়ক আলোকায়নে। নগরীর প্রধান সড়ক তো বটেই, গুরুত্বপূর্ণ সকল সড়কই ছেঁয়ে গেছে নজরকাড়া সড়ক বাতিতে। সন্ধ্যার পরপরই স্বয়ংক্রিয়ভাবে আলো দিতে থাকে সড়ক জুড়ে। হঠাৎ রাজশাহী আসা দর্শনার্থীদের কাছে বাইরের কোনো দেশ মনে হলেও বাস্তবে এটি সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন রাজশাহীরই প্রতিনিধিত্ব করে। দৃষ্টিনন্দন ও আধুনিক এসব সড়ক বাতিতে মুগ্ধ হবেন যে কেউ।

এমন দারুণ সব সৌন্দর্য উপভোগ করতে রাজশাহী আসার বিকল্প কিছু হতে পারে না। তো ঈদের ছুটিতে চাইলেই ঘুরে যেতে পারেন সুন্দর ও বাসযোগ্য শহর রাজশাহী।

প্রতিনিধি/এজে