জেলা প্রতিনিধি
১১ এপ্রিল ২০২৩, ০১:৩৬ পিএম
ফেনীর আলোচিত সোনাগাজী ইসলামীয়া দাখিল মাদরাসার ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফী হত্যার ৪ বছর পূর্ণ হলো আজ মঙ্গলবার। ২০১৯ সালের ৬ এপ্রিল মাদরাসার ছাদে ডেকে নিয়ে নুসরাতের গায়ে আগুন লাগিয়ে হত্যার চেষ্টা চালায় তার সহপাঠীরা। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে প্রথমে ফেনী জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখান থেকে অবস্থার অবনতি হলে ঢাকা মেডিকেল কলেজে হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। এরপর চিকিৎসাধীন অবস্থা ১০ এপ্রিল মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন নুসরাত। একই বছরের ২৪ অক্টোবর ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে ১৬ আসামির মৃত্যুদণ্ড ও ১ লাখ টাকা করে জরিমানার রায় ঘোষণা করা হয়। রায় প্রকাশের পর তা কার্যকরের জন্য ডেথ রেফারেন্স উচ্চ আদালতে শুনানির জন্য নথিভূক্ত হয়। বর্তমানে মামলাটি আইনগত প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
ঘটনার বিবরণে জানা যায়, শ্লীলতাহানীর অভিযোগ প্রত্যাহার না করায় পরীক্ষার কেন্দ্র থেকে ছাদে ডেকে নিয়ে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন দিয়ে নুসরাতকে হত্যার চেষ্টা করে তার সহপাঠীরা। এতে তার শরীরের ৮৫ শতাংশ পুড়ে যায়। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১০ এপ্রিল রাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় নুসরাতের ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান ৮ এপ্রিল সোনাগাজী মডেল থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলাটির প্রয়োজনীয় তদন্ত শেষে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশান (পিবিআই) ১৬ জনকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট প্রদান করেন। ২০ জুন অভিযোগ গঠন করেন নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল। পরে ৬১ কার্য দিবসের মধ্যে ৮৭ জনের স্বাক্ষ্য গ্রহণ শেষে ২৪ অক্টোবর রায় ঘোষণাকালে সকল আসামির ফাঁসির দণ্ডাদেশ দেন বিচারক মামুনুর রশীদ। পাশাপাশি প্রত্যেক আসামিকে ১ লাখ টাকা করে জরিমানাও করা হয়।
সাজাপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন, মাদরাসার অধ্যক্ষ এস এম সিরাজ উদদৌলা (৫৭), উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রুহুল আমিন (৫৫), স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর মাকসুদ আলম (৫০), মাদরাসার শিক্ষক হাফেজ আবদুল কাদের (২৫), প্রভাষক নুরুল আফসার (৩৩), মাদরাসার ছাত্র নুর উদ্দিন (২০), শাহাদাত হোসেন শামীম (২০), সাইফুর রহমান মো. যুবায়ের (২১), জাবেদ হোসেন (১৯), আবদুর রহীম শরিফ (২০), ইফতেখার উদ্দিন রানা (২২), ইমরান হোসেন মামুন (২২), মোহাম্মদ শামীম (২০), মহিউদ্দিন শাকিল (২০), মাদরাসার ছাত্রী কামরুন নাহার মনি (১৯) ও উম্মে সুলতানা পপি (১৯)।
নিম্ন আদালতে রায়ের পর প্রধান আসামি অধ্যক্ষ সিরাজ, নুর উদ্দিন, জাবেদ হোসাইন ও উম্মে সুলতানা পপি খালাস চেয়ে উচ্চ আদালতে আপিল করেন। এখন পর্যন্ত আপিলও শুনানি হয়নি।
বাদীপক্ষের আইনজীবী এম শাহজাহান সাজু জানান, ২০১৯ সালের ২৯ অক্টোবর আসামিদের মৃত্যুদণ্ডাদেশ অনুমোদনের জন্য (ডেথ রেফারেন্স) মামলার যাবতীয় কার্যক্রম হাইকোর্টে পৌঁছে। উচ্চ আদালতে বিচারপতি হাসান ইমাম ও সৌমেন্দ্র সরকারের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চে এই মামলার শুনানির জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এদিকে নুসরাতকে থানায় ডেকে ভিডিও ধারণ করে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগে ২০১৯ সালের ১৫ এপ্রিল তৎকালীন সোনাগাজী মডেল থানার ওসি মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে সাইবার ট্রাইব্যুনালে বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেন ব্যারিস্টার ছায়েদুল হক সুমন। ওই মামলায় ওসি মোয়াজ্জেমের ৮ বছরের জেল ও ১০ লাখ টাকা জরিমানা করে ট্রাইব্যুনাল। এটি বাংলাদেশের প্রথম সাইবার ট্রাইব্যুনালের প্রকাশিত রায়।
ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি প্রভাষক নুরুল আবসারের স্ত্রী সুরাইয়া আবসার সম্প্রতি এক মানববন্ধনে বলেন, মামলার তদন্ত সংস্থা কাল্পনিক একটি ঘটনা আবিস্কার করে নির্দোষ ব্যক্তিদের ফাঁসিয়েছে। একই সঙ্গে এ মামলায় উচ্চ আদালতে আসামিরা খালাস পাবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
মামলার বাদি নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান জানান, আমরা ন্যায় বিচার পেয়েছি। আশা করি উচ্চ আদালতেও ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আসামিদের ফাঁসি কার্যকর হবে। তিনি জানান, আমাদের বাড়িতে এখনও পুলিশ সদস্যরা নিয়মিত পাহারায় রয়েছেন। পুলিশ সুপার ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আমাদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে যাচ্ছেন। আসামির স্বজনরা ভয়ে আমাদের প্রকাশ্যে কিছু না বললেও তারা ফেসবুকে আমাদের পরিবার নিয়ে নানা কু-রুচিপূর্ণ মন্তব্য করে যাচ্ছে। এতে করে আমরা সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন হচ্ছি।
প্রতিনিধি/এইউ