images

সারাদেশ

৫০০ বছরের মেলায় পঙ্খিরাজ ঘোড়া  

জেলা প্রতিনিধি

১৩ মার্চ ২০২৩, ০৬:২২ পিএম

জয়পুরহাটের আক্কেলপুর উপজেলায় ৫০০ বছরেরও বেশি সময়ের ঐতিহ্যবাহী গোপিনাথপুরের মেলা। প্রতি বছর দোল পূর্ণিমা উপলক্ষে জয়পুরহাটে শুরু হয় মাসব্যাপী মেলা। মূল মেলা ১৩ দিন হলেও পশুর মেলা হয় ৭ দিন। মেলায় মূল আকর্ষণ ঘোড়া ছাড়াও মহিষ, গরু, ভেড়া ও ছাগল বেচাকেনা হয়।

প্রতিবারের মতো এবারের মেলাতেও জমে উঠেছে ঘোড়া ও মহিষের হাট। পছন্দের পশু কেনাবেচার জন্য দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মেলায় এসেছেন ঘোড়া প্রেমিরা। বাহারি নামের ঘোড়া এসেছে মেলায়। তাদের মধ্যে আছে- পঙ্খিরাজ, বাহাদুর, রাজা, রাণী, সম্রাট, ইত্যাদি নানা নামের ঘোড়া।

ghora

মেলা উপলক্ষে ফাঁকা মাঠের মধ্যে ঘোড়া নিয়ে দৌড় ও বুদ্ধিমত্তা দেখানো হয়। ওদের বুদ্ধিমত্তা ও দৌড় দেখার পর দরদাম ঠিকঠাক করেন ক্রেতা-বিক্রেতা। নানামুখী গুণের কারণে ঘোড়াগুলোর দাম কম বেশ হয়। দরদাম করেই পছন্দের ঘোড়াটি কিনছেন ক্রেতারা।

ঐতিহ্যবাহী এ মেলায় শিশুদের খেলনাসামগ্রী, মিঠাই-মিষ্টান্ন, গৃহস্থকার্যে ব্যবহার্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রসহ গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী নাগরদোলাসহ বিভিন্ন রকমের নিত্য প্রয়োজনীয়-পত্রও পাওয়া যাচ্ছে। 

এলাকাবাসী সূত্রে জানা যায়, উত্তরবঙ্গের সর্ববৃহৎ এ মেলা ৫১৪ বছর ধরে বসছে। দোল পূর্ণিমার মধ্য দিয়ে শুরু হয় হিন্দু সম্প্রদায়ের এই  দোলযাত্রা মেলা। এক সময় এই মেলায় উট ও দুম্বার ব্যাপক আমদানি হতো। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত থেকে সেগুলো আমদানি করা হতো। কালের বিবর্তনে ওইসব প্রাণীর পরিবর্তে জায়গা করে নিয়েছে গরু, মহিষ এবং ঘোড়া।

ghora

এই মেলায় ঘোড়া, গরু ও মহিষ ছাড়াও সংসারের যাবতীয় আসবাবপত্র কাঠ, স্টিল ও প্লাস্টিকের ফার্নিচার, মিষ্টান্ন, মসলা, জুতা ও কাপড়সহ হরেক রকমের জিনিসপত্র আমদানি হয়।

সরেজমিন দেখা যায়, ক্রেতা-বিক্রেতা ও দর্শনার্থীর পদচারণায় মুখর গোপিনাথপুর মেলার ঘোড়ার হাট। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ঘোড়া নিয়ে এসেছেন বিক্রেতা ও ক্রেতারা। নিজের জন্য পছন্দের প্রাণীটিকে পেতে ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে চলছে রীতিমতো দর কষাকষি।

কথা হয় ঢাকা জেলার নবাবগঞ্জ উপজেলার কলাকোপা এলাকার ঘোড়া বিক্রেতা জাকির মন্ডলের সঙ্গে। তিনি বলেন, মেলা শুরুর একদিন আগে তিনি ৪টি ঘোড়া নিয়ে এসেছেন। মেলা জমজমাট কিন্তু ঘোড়া বিক্রি করতে পারছেন না। দামদরে হচ্ছে না। এই কয়েক দিনে ৪টি ঘোড়ার মধ্যে একটি ঘোড়া বিক্রি করতে পেরেছেন। বাকি ৩টি ঘোড়া আছে কিন্তু তিনি আশাবাদী বাকিগুলোও বিক্রি হবে।

Ghora

দিনাজপুরের বিরামপুর উপজেলার প্রদীপ চন্দ্র এসেছেন ঘোড়া কিনতে। তিনি বলেন, তার পছন্দের ঘোড়াটির দাম করেছেন ১ লাখ ১৫ হাজার টাকা। কিন্তু দেড় লাখ টাকার কমে বিক্রি করবেন না সেই ঘোড়ার ব্যাপারী।

নাটোর জেলার সিংড়া উপজেলার আবু তাহের পেশায় তিনি একজন ঘোড়ার গাড়িওয়ালা। তিনি বলেন, তিনি নাটোরসহ আশে পাশে বিভিন্ন জেলায় বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠান ও বিভিন্ন দিবসে ঘোড়ার গাড়ি চালান, তিনি এসেছেন ঘোড়া কিনতে। তার সবচেয়ে পছন্দের ঘোড়াটি কিনেছেন ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা দিয়ে। ঘোড়া বিক্রেতা দেড় লাখ এর নিচে ঘোড়াটি বিক্রি করবেন না। মেলাতে ২ দিন অবস্থান করার পর তিনি সেই ঘোড়াটিই কিনেছেন।

এবার হাটে সর্বোচ্চ ৭ লাখ টাকায় যে ঘোড়াটি বিক্রি হয়েছে, তার মালিক আব্দুল হান্নান। তিনি বলেন, ঘোড়াটির বয়স সাড়ে চার বছর। এটি রেসিং ঘোড়া। দ্রুত দৌঁড়াতে পারে। সাদা-কালো ডোরাকাটা ঘোড়াটির যত্ন আমি নিজেই নিতাম। বাহারি ঘোড়াটি কিনেছেন রাজশাহীর সেকেন্দার আলী নামে এক সৌখিন ঘোর সওয়ারি।

ব্যতিক্রমী এই মেলাকে ঘিরে ইতোমধ্যেই প্রায় ১ কিলোমিটার জায়গা জুড়ে শতাধিক বিঘা জমির উপরে বসছে ঘোড়া ও মহিষের হাট। যা গত ২ বছর আগেও ছিল ২ কিলোমিটার প্রায় দুই শতাধিক বিঘা জমির উপর।

ghora

এ মেলাকে ঘিরে এলাকার প্রায় ২০ থেকে ২৫ গ্রামে চলে স্বজন সমাবেশ। একসঙ্গে শত শত ঘোড়া দেখে দারুণ খুশি দর্শনার্থীরা। তবে তারা ঘোড়ার খেলা দেখার জন্য স্থানীয় প্রশাসনের কাছে নির্দিষ্ট একটি ঘোড়া দৌড়ের মাঠ তৈরির আহ্বান জানান।

ঐতিহ্যবাহী গোপিনাথপুর মেলা কমিটির প্রধান ও গোপিনাথপুর ইউপি চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান বলেন, দোল পূর্ণিমা উপলক্ষে এই মেলা ১৩ দিন স্থায়ী হয়। এর মধ্যে ৭ দিনই থাকে ঘোড়া ও গবাদিপশুর হাট। এ অঞ্চলে এত পুরাতন মেলা আর কোথাও নেই। কালের বিবর্তনে আগের চেয়ে মেলার অবয়ব ছোট হলেও এখনও এই মেলার কারণে এলাকার আশপাশের গ্রামগুলোতে উৎসবের আমেজ বিরাজ করে। শিশুদের মন জয় করা নাগরদোলা, চরকিসহ বিভিন্ন ধরনের খেলনা, গৃহস্থকার্যে ব্যবহার্য সব ধরনের তৈজসপত্র ও মিঠাই-মিষ্টান্ন।

আক্বেলপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, মেলার নিরাপত্তায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী এ মেলার ঐতিহ্য ফেরাতে যেন কোনও প্রকার অনিয়ম, অশ্লীলতা না থাকে সে ব্যাপারেও নজরদারি রয়েছে।

প্রতিনিধি/এসএস