জেলা প্রতিনিধি
২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ০৩:৪১ পিএম
ফেনীর ফুলগাজী উপজেলার মুন্সিরহাট ইউনিয়নের বদরপুরে বিএডিসির বাস্তবায়িত ৬০ লাখ টাকার স্লুইচগেইটটি কোনো কাজে আসছে না। বরং কৃষকের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে সরকারি অর্থে নির্মিত এই স্থাপনাটি। নির্মাণের কিছুদিন পর থেকেই এটি বিকল অবস্থায় পড়ে আছে। তিন বছরেও এর চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সংস্কার না হওয়ায় বোরো মৌসুমে পানির অভাবে বদরপুরসহ আশপাশের এলাকায় আবাদ ব্যাহত হচ্ছে। কিন্তু এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ থেকে কোনো উদ্যোগ দৃশ্যমান হচ্ছে না। এতে করে স্থানীয় কৃষক ও সচেতন মহলে ক্ষোভ এবং অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
জানা যায়, ভারত থেকে নেমে আসা তেতৈয়া খালটি বদরপুর ও আশপাশের এলাকায় শত শত একর জমিতে চাষাবাদের একমাত্র পানির উৎস। বর্ষা মৌসুমে ভারতীয় পাহাড়ি ঢলের পানি প্রবেশ ঠোকানো ও বোরো মৌসুমে পানি ধরে রেখে চাষাবাদ অব্যাহত রাখতে তেতৈয়া খালের বদরপুর এলাকায় ৬০ লাখ টাকা ব্যয়ে স্লুইচগেইট নির্মাণ করে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)। ক্ষুদ্র সেচ উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ২০১৯-২০ অর্থবছরে ভারত থেকে নেমে আসা তেতৈইয়া ছড়া খালের উপর অপরিকল্পিতভাবে বড় আকারের হাইড্রোলিক স্ট্রাকচার (স্লুইচগেইট) নির্মাণ কাজটি বাস্তবায়ন করে মেসার্স রিয়া এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ভিপি নুরুল আমিন। নির্মাণের কিছুদিন পরই স্লুইচগেইটটির দুইপাশের গার্ডওয়াল ভেঙে যায়। পাশ দিয়ে মাটি দেবে পানি আসা-যাওয়া শুরু হয়। পরে ঠিকাদার নুরুল আমিন সেখানে কিছু মাটি ভর্তি বস্তা দিলেও তা বিলীন হয়ে গেছে। ফলে এক দিকে শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাবে শতশত একর জমি অনাবাদি পড়ে থাকে, অপরদিকে বর্ষা মৌসুমে ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানিতে ফসলাদি তলিয়ে যায়।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সুইচগেইটের উভয়পাশে মাটি সরে যাওয়ায় গার্ডওয়াল দেবে গেছে। বিভিন্ন সময়ে দেবে যাওয়া স্থানে মাটিভর্তি বস্তা দেওয়া হলেও তা খালের পানিতে ভেসে গেছে। ফলে আশপাশের শত শত একর জমি অনাবাদি পড়ে আছে। বদরপুর ও আশপাশের কৃষকরা বীজতলা তৈরি করলেও পানির অভাবে সেটিও জমিতে লাগাতে পারছেন না।
স্থানীয় ইউপি সদস্য আবুল কাশেম বলেন, বদরপুর এলাকায় চলতি বোরো মৌসুমে প্রায় ১০০ একর জমি অনাবাদি পড়ে আছে। পানি না পাওয়ায় তিনি অন্তত ২৪০ শতক জমিতে বোরো আবাদ করতে পারেননি।
এলাকার বাসিন্দা ও উপজেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক একরাম পাটোয়ারী বলেন, সরকার স্লুইচগেইট নির্মাণ করলেও কৃষকদের কোনো কাজে আসছে না। স্থানীয় এলাকাবাসী কৃষি নির্ভরশীল হওয়ায় গত তিন বছরধরে দারুণ ক্ষতির শিকার হচ্ছেন। তিনি এখন নষ্ট সুইচগেইটটি দ্রুত সংস্কারের দাবি জানান।
স্থানীয় কৃষক আবদুল মালেক জানান, তেতৈয়া খালের উপর গেইটটি নির্মাণের আগে আমরা বাঁধ দিয়ে পানি ধরে রাখতাম। তা প্রয়োজনমত ব্যবহার করে চাষাবাদ করতাম। কিন্তু এখানে গেইটটি নির্মাণের পর সেই সুযোগও আমাদের হাতছাড়া হয়ে যায়। গেইটটি এখন বর্ষা ও শুষ্ক উভয় মৌসুমই আমাদের জন্য বিপদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চলতি মৌসুমেও খালটির বাংলাদেশ অংশে শতশত একর জমি অনাবাদি পড়ে আছে। অনেক কৃষক বীজতলা তৈরি করলেও পানির অভাবে তা জমিতে লাগাতে পারেনি।
এবিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী ও মুন্সীরহাট ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান নুরুল আমিন ঢাকা মেইলকে বলেন, নকশা অনুযায়ী স্লুইচগেট নির্মাণ করা হয়েছে। তবে বিএডিসির নকশায় কিছু ভুল থাকায় এখন নানা সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে।

চেয়ারম্যান বলেন, সুইচগেইটটি নির্মাণের সময় উইংওয়াল (সাপোর্টিং বাঁধ) ধরা হয়নি। উইংওয়াল না দেওয়াতে দুই পাশে সুড়ঙ্গের সৃষ্টি হয়েছে। তাছাড়া এটি নির্মাণের পর কয়েক দফায় পাহাড়ি ঢলের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। ব্যক্তিগত উদ্যোগে আমি মাটি ভর্তি বস্তা দিয়ে দেবে যাওয়া ঠেকাতে চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছি।
ফুলগাজী উপজেলা বিএডিসির সহকারী প্রকৌশলী মো. জানে আলম ঢাকা মেইলকে বলেন, এর আগেও স্লুইচগেইটটি পরিদর্শন করে কিছু সংস্কার করা হয়েছিল। তবে খালে পানির চাপ বৃদ্ধি পাওয়ায় গেইটের নিচ দিয়ে সুড়ঙ্গ হয়ে পানি নিচের দিকে চলে যায়। মূলত এখানে উইংওয়াল নির্মাণ না হলে গেইটটি মানুষের উপকারে আসবে না। উইংওয়াল নির্মাণের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কতৃর্পক্ষকে জানানো হয়েছে।
ফুলগাজী উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মো. আবদুল আলিম মজুমদার ঢাকা মেইলকে বলেন, স্লুইচগেইটটি নির্মাণের সময়ে নকশায় ভুল ছিল। যার কারণে এটি কৃষকের কোনো কাজে আসছে না। তিনি দ্রুত নষ্ট স্লুইচগেইটটির সংস্কারের জন্য কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
প্রতিনিধি/জেবি