জেলা প্রতিনিধি
২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ০২:২৬ পিএম
কামালপুর—রাজবাড়ী জেলা সদরের দাদশী ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের একটি গ্রাম। এই গ্রামে পরীক্ষামূলকভাবে ১৫ শতাংশ জমিতে ব্ল্যাক রাইস কালো ধান চাষ করেছেন কৃষক রেজাউল শেখ। ইউটিউবে এ ধান চাষের ভিডিও দেখে অনুপ্রাণিত হোন তিনি। রোপনের ৮০ দিনের মধ্যে তার ক্ষেতে বাতাসে দোল খাচ্ছে কালো ধান। তার এই সফলতা দেখতে ছুটে যাচ্ছেন অন্যান্য কৃষক। রেজাউলের সফলতা দেখে কালো ধান চাষে আগ্রহী হচ্ছেন তারা। কৃষি বিভাগের সহায়তা পেলে আগামীতে বাণিজ্যিকভাবে কালো ধান চাষের পরিকল্পনা করছেন রেজাউল।
৩০ বছর ধরে ধান, পাট, গম-সহ নানা রকমের সবজির চাষ করেন রেজাউল শেখ। চলতি মৌসুমে ইউটিউব দেখে আগ্রহী হয়ে ব্ল্যাক রাইস জাতের ধানের বীজ সংগহ করে নিজ জমিতে রোপন করে বাম্পার ফলন পেয়েছেন তিনি। দেশি জাতের ধানের মতো একই প্রক্রিয়ায় এই ব্ল্যাক রাইস চাষ করা হয়। বাজারে এ ধানের চালের ব্যাপক চাহিদা থাকায় আগামীতে বাণিজ্যিকভাবে চাষের প্রস্তুতি রয়েছে তার।
উচ্চ মূল্যের এই কালো ধানের চাষ এবং উপকারিতার কথা শুনে অনেক কৃষক এখন রেজাউল শেখের ক্ষেত দেখতে আসছেন। অন্যান্য ধানের তুলনায় দাম কয়েকগুণ বেশি হওয়ায় স্থানীয় কৃষকরাও অনুপ্রাণিত হচ্ছেন ব্ল্যাক রাইস চাষে। স্থানীয় বাজারে প্রতি কেজি কালো ধান ৫শ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
রাজবাড়ী সদর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ফ্লাভিনয়ের্ড বা এনথোসায়ানিন খুব বেশি পরিমাণে থাকায় এই চালের রঙ কালো হয়। এই উপাদানটির কারণে ক্যানসার, হৃদরোগ, স্নায়ুরোগ এবং ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণে প্রতিহত করতে সহায়তা করে। কালো চাল ক্যানসার প্রতিরোধে অনন্য। এই চালে আয়রন বেশি, কিন্তু শর্করা কম। আর এই চালের ভাত অনেক বেশি পুষ্টি ও স্বাস্থ্যকর। ব্ল্যাক রাইস পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ ও বাজারে দাম বেশি। এই ধানের ভাত খেলে দেহের রোগ প্রতিরোধে ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। কালো ধানে প্রচুর এন্টি-অক্সিডেন্ট থাকায় শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।
কৃষক রেজাউল শেখ বলেন, ইউটিউবে দেখে আগ্রহী হয়ে কৃষি বিভাগের পরামর্শে আমি এই ধান চাষ শুরু করি। ব্ল্যাক রাইসের চাল একটু মোটা। এই ধান দুর্যোগ সহনশীল বলে প্রমাণিত। কৃষি অফিস সব সময় পর্যবেক্ষণ ও সহায়তা করেছে। তারা আমার এই ধানকে বীজ হিসেবে সংগ্রহ করার পরামর্শ দিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ধানের বীজ ৫শ টাকা কেজিতে কিনেছি। চাউল ৩শ টাকা কেজি বিক্রি করতে পারলে আমি লাভ করতে পারবো। আগামীতে আমি আরও বেশি কালো ধান বা ব্ল্যাক রাইসের চাষ করব।
স্থানীয় কৃষক আফজাল শেখ বলেন, এখন থেকেই এই কালো ধানের যে চাহিদা আমরা দেখতে পাচ্ছি, তাতে আশা করা যাচ্ছে এই কালো ধানের চাউল ৩শ টাকা কেজি বিক্রি হবে। আমি নিজেও আগ্রহী হয়েছি এই ব্ল্যাক রাইস চাষাবাদে।
আরেক কৃষক মমিন মন্ডল বলেন, রেজাউল তার নিজের জমিতে প্রতি বছর বিভিন্ন ফসলের চাষ করেন। এবার তিনি কালো ধানের চাষ করেছেন। আমরা দেখতে পেয়েছি ভালো ফলন হয়েছে। আমরা তার সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে কৃষি অফিসারের সঙ্গে পরামর্শ করে এ ধানের চাষাবাদ শুরু করব।
স্থানীয় অন্যান্য কৃষকরা জানান, ধানের বাজার মূল্য ভালো হলে অনেক কৃষক এই ধান চাষে আগ্রহী হবে।
রাজবাড়ী সদর উপজেলা কৃষি অফিসের উপ-সহকারী কৃষি অফিসার কৃষিবিদ মো. বশির আহম্মেদ জানান, নানাবিধ পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ এই কালো ধান ও চাল বাজারে ব্যাপক চাহিদা থাকায় আগামীতে অধিক চাষাবাদের সম্ভাবনা রয়েছে। চলতি মৌসুমে রাজবাড়ীতে কয়েকজন কৃষক ১ একর জমিতে পরীক্ষামূলক ব্ল্যাক রাইসের চাষ করছেন। নতুন এই ব্ল্যাক রাইস জাতের ধান চাষাবাদে আগ্রহী কৃষকদের নানাবিধ পরামর্শ দিচ্ছে জেলা কৃষি বিভাগ।
অপরদিকে, রাজবাড়ী জেলার বালিয়াকান্দি উপজেলায় ওষুধি ও পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ ব্ল্যাক রাইস ধান চাষ করে সাফল্য পেয়েছেন কৃষক টিপু সুলতান। তিনিও কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবে এই ধানের চাষ শুরু করেন। বালিয়াকান্দি বহরপুর ইউনিয়নের তেতুলিয়া মাঠে প্রায় ৮০ শতাংশ জমিতে এই ধানের চাষ করে প্রথমবারে তিনি ধানের বাম্পার ফলন পেয়েছেন। টিপু সুলতান একই উপজেলার বহরপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা।
উদ্যোক্তা টিপু সুলতান বলেন, ঢাকার একজন কৃষিবিদ মুজিবুর রহমানের কাছ থেকে এই ধানের বীজ সংগ্রহ করি। এরপর কৃষি বিভাগের পরামর্শে আমি ধান চাষ শুরু করি। ধানের পাশাপাশি আমার একটি নার্সারি রয়েছে। কৃষি কাজে আমি রাজবাড়ীর একজন সফল কৃষক।
বালিয়াকান্দি উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. রফিকুল ইসলাম জানান, সাধারণ ধানের চেয়ে কালো ধানের দাম ও চাহিদা অনেক বেশি। কালো ধানে প্রচুর পরিমাণে এন্টি-অক্সিডেন্ট থাকায় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। এতে মানুষের দেহের হার্ট সুস্থ থাকে। রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দিতে প্রথমবারের মতো কালো ধানের চাষে সাফল্য পেয়েছেন টিপু সুলতান। কৃষি বিভাগ থেকে আমরা চাষীদের নানাবিধ পরামর্শ ও প্রশিক্ষণ দিচ্ছি।
প্রতিনিধি/এইচই