images

সারাদেশ

গাজীপুরে টিউলিপের মুগ্ধতায় মজেছেন ফুলপ্রেমীরা

জেলা প্রতিনিধি

০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ১২:৫৪ পিএম

গাজীপুর যেন এখন এক খন্ড নেদারল্যান্ড। শীত প্রধান দেশের ফুল টিউলিপ ফুটেছে  শ্রীপুরের প্রত্যন্ত এলাকায়। বাহারী রঙের টিউলিপ দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসছেন ফুল পাগল মানুষ। শুধু সৌন্দর্য গুনে নয়, ফুলের জগতে অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে এ টিউলিপ ফুল। আর বাণিজ্যিকভাবে এ ফুল প্রসার ও কৃষকদের প্রশিক্ষণসহ সবখানে টিউলিপ ছড়িয়ে দেওয়ার স্বপ্ন দেখছেন উদ্যোক্তা দেলোয়ার হোসেন।

সাধারণত ইউরোপের দেশ নেদারল্যান্ডসে টিউলিপ ফুল বেশি চাষ হয়। এছাড়া কাশ্মীরে ব্যাপকভাবে চাষ হয় এ টিউলিপ ফুল। কিন্তু গত চার বছর ধরে গাজীপুরের শ্রীপুরের কেওয়া পূর্ব খন্ড গ্রামে বাণিজ্যিকভাবে এ ফুল ফুটিয়েছেন  ফুলচাষি দেলোয়ার হোসেন। মন মাতানো আর মুগ্ধ হওয়ার মতো সৌন্দর্য নিয়ে তার বাগানে টিউলিপ ফুটেছে থোকায় থোকায়। ষড়ঋতুর  এই দেশে টিউলিপ ফুলের উৎপাদন করে বিস্ময় জাগিয়েছেন তিনি। লাল, হলুদ, গোলাপি, বেগুনি, সাদাসহ নানা রঙের ১২ জাতের এই ফুল সৌন্দর্য ছড়াচ্ছে বাগানে।

দৃষ্টিনন্দন ‘মৌমিতা ফ্লাওয়ার্স’ নামের এই বাগান দেখতে প্রতিদিনই আশপাশের এলাকা এমনকি দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে প্রতিদিন দর্শনার্থী ও উদ্যোক্তারা ভিড় করছেন। শুধু  তাই নয়, এই টিউলিপ বাগান পরিদর্শনে নেদারল্যান্ড দূতাবাসের ডেপুটি হেড অব মিশন থিজ উডস্ট্রা, শিক্ষামন্ত্রী দীপুমনিসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি এসেছেন। এই ফুল চাষ ইতোমধ্যে সম্প্রসারিত হয়ে শুরু হয়েছে বাণিজ্যিক উৎপাদনও।

বাগানে আসা দর্শন্যার্থীরা বলছেন, তারা যেন একখণ্ড নেদারল্যান্ডস দেখছেন এখানে। মুগ্ধ হচ্ছেন বাহারী ফুলের সৌন্দর্যে। ফুলের নয়নাভিরাম, মোহিনী  রূপে যেন ঘোর লেগে যায় এখানে।

তবে টিউলিপ ফুলের বাগান দেখতে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা লোকজনের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে বাগানের প্রবেশ ফি। এখানে টিউলিপ দর্শনে প্রতিজনকে  গুণতে হবে ১০০ টাকা। 

এলাকাবাসী জানায়, গত ১৫ বছর ধরে ফুল ব্যবসায় জড়িত দেলোয়ার-সেলিনা দম্পতি। টিউলিপের  আগে গোলাপ, জারবেরা, লিলিসহ নানা জাতের ফুল বাণিজ্যিকভাবে চাষ করে আসছিলেন তারা। মৌমিতা ফ্লাওয়ার্স নামে ফুলচাষের একটি প্রতিষ্ঠানও গড়ে তুলেছেন। এই প্রতিষ্ঠানে ফুল ছাড়াও ব্যাপক আকারে স্ট্রবেরি ও জি নাইন কলার চাষ হয়েছে। ফুল ও ফল উৎপাদনের পাশাপাশি তারা এগুলোর বীজ স্থানীয়ভাবে কৃষকদের মধ্যে সরবরাহ ও প্রযুক্তিগত পথও দেখিয়ে দেন।

উদ্যোক্তা সেলিনা হোসেন বলেন, বাংলাদেশের পরিবেশে টিউলিপ ফুল চাষ নিয়ে বেশ কয়েক বছর বিদেশে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন  তারা। এরপর ২০২০ সালে পরীক্ষামূলকভাবে টিউলিপ চাষে সফলতা দেখেন। পরবর্তীতে ২০২১, ২০২২ ও সর্বশেষ ২০২৩ সালে তারা ক্রমান্বয়ে ফুলটির চাষের আওতা বাড়িয়েছেন। এ বছর পুরোপুরি বাণিজ্যিক উৎপাদনে নেমেছেন তারা। বাগান থেকে কেটে ফুল বিক্রির পাশাপাশি এ বছর পটেও টিউলিপ বিক্রি করছেন। তিন থেকে পাঁচটি টিউলিপ গাছসহ এসব পটের দাম ৩০০ থেকে ৬০০ টাকার মধ্যে। ২০২০ সালে প্রথম বছর তাদের টিউলিপ বাগানের আয়তন ছিল মাত্র ২ শতাংশ। সফলতা পেয়ে এ বছর তারা মোট ১ বিঘা জমিতে টিউলিপ ফুল চাষ করেছেন। সাধারণত জানুয়ারি মাসে বাল্ব রুপণের পর ২১ দিনের মাথায় ফুল ফুটে বের হয়। টিউলিপ ফুল গাছগুলো ২৮ ইঞ্চি পর্যন্ত লম্বা হয়। এগুলো টবে সাজিয়ে রাখার জন্য আদর্শ ফুল। একটি গাছ থেকে একটিই ফুল পাওয়া যায়। পৃথিবীতে টিউলিপ ফুলের ১৫০টির বেশি জাত আছে। টিউলিপ ফুলচাষে সবচেয়ে সফল দেশের নাম নেদারল্যান্ডস। সেখানে এই ফুলের ব্যাপক চাষাবাদ হয়। বর্তমানে নেদারল্যান্ডস ছাড়াও অন্যান্য কয়েকটি শীতপ্রধান দেশেও টিউলিপের চাষ হচ্ছে।

উদ্যোক্তা দেলোয়ার হোসেন বলেন, তিন বছর আগে টিউলিপ চারা (বাল্ব) নেদারল্যান্ডস থেকে এনে  পরীক্ষামূলকভাবে রোপণ করা হয়। এবার বাণিজ্যিক ভাবে বড় পরিসরে চাষ করছেন টিউলিপ। এছাড়া এ বছর পঞ্চগড়, যশোর, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, বাগেরহাট, রংপুর ও জামালপুরের কয়েকটি এলাকায় তিনি টিউলিপ বাল্ব সরবরাহ করেছেন তিনি।

সরকার পৃষ্ঠপোষকতা করলে এক সময় আর বিদেশ থেকে ফুল আমদানি করতে হবে না জানিয়ে কৃষক দেলোয়ার বলেন, টিউলিপ ফুল ছড়িয়ে দেয়ার জন্য কৃষকদের কারিগরী বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। ছাদ, বাড়ির আঙ্গিনাসহ সব খানে টিউলিপ ছড়িয়ে দেয়া গেলে এ ফুল বিদেশে রপ্তানী করা যাবে। নেদারল্যান্ডস এখন টিউলিপ ফুল রপ্তানি করছে। আমরা চেষ্টা করলে ব্যাপকহারে এই ফুল উৎপাদন করে রপ্তানির খাতায় নাম লেখাতে পারি। সেক্ষেত্রে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে, আমার একার পক্ষে এটি সম্ভব না।

বর্তমানে দেলোয়ারের বাগানে ১২ জাতের ৭০ হাজার টিউলিপ রয়েছে। ফুল চাষে ২০১৭ সালে অর্জন করেছেন বঙ্গবন্ধু কৃষি পদক। এছাড়া তার বাগানে ৩০ জন লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি বছরে অন্তত অর্ধকোটি টাকা মুনাফা করছেন।

প্রতিনিধি/ এজে