images

সারাদেশ

যশোরের আসল গুড়-পাটালি চিনবেন যেভাবে

জেলা প্রতিনিধি

২২ জানুয়ারি ২০২৩, ১০:১৪ এএম

খেজুরের রস গুড়ের জন্য দেশজুড়ে খ্যাতি যশোরের। শীত মৌসুমে যশোরের গুড়ের দিকে চেয়ে থাকে দেশ। বিদেশে অবস্থানরত বাঙালিদের কাছে সমান কদর রয়েছে গুড়ের। যশোরের গুড়ের সুনাম ও চাহিদাকে পুঁজি করে এক শ্রেণির অসাধু চক্র শুরু করেছে ভেজাল কারবার। ভেজালের প্রভাব এতটায় বেড়েছে যে, আসল গুড় চিনতে এক প্রকার ধাঁধায় পড়ছেন ক্রেতারা। তবে বেশিরভাগ গুড় পাটালি ঐতিহ্য মেনেই তৈরি হচ্ছে। ক্রেতারা একটু সচেতন হলেই চিনতে পারবে খাঁটি গুড়।

সুখ্যাত পাটালি তৈরি হয় খাজুরার বাউনডাঙ্গায়। সুস্বাদু ও রসালো এ পাটালি তৈরিতে গাছিরা মুন্সিয়ানার পাশাপাশি চিনির ব্যবহার করে থাকেন। ভেজাল হিসেবে নয় উপকরণ হিসেবে সামান্য চিনি না মেশালে এ বিশেষ পাটালি তৈরি করা যায় না বলে জানিয়েছেন গাছিরা। আবার বীজ মারতে (জমাট গুড় বা পাটালি তৈরির কৌশল) কখনও কখনও চিনি ব্যবহারের প্রয়োজন হয়। বেশি মুনাফা প্রত্যাশি গাছিরা অধিকহারে চিনি মিশিয়ে গুড়ের পরিমাণ বাড়িয়ে দেন। এতে নষ্ট হয় গুড়ের গুণাগুণ ও স্বাদ। তবে খাঁটি গুড়ে ভেজাল হিসেবে চিনির চেয়ে বেশি মেশানো হয় দোকাট গুড় বা  টকগুড়।  কখনও কখনও গুড় সাদা করতে ফিটকিরি, ইউরিয়া সার ব্যবহার করা হয়। রসের পরিমাণ বাড়াতে বিচালি ভেজানো পানি, চুনের পানি দেওয়া হয়। গুড় ‘খাঁটি’ বানাতে  ফুড কালার ও গুড়ের সুগন্ধি মেশানোর তথ্য মিলেছে গাছিদের কাছ থেকে। গাছিরা বলছেন, তারা খাঁটি গুড়ই তৈরি করতে চান। তবে ক্রেতাদের ভিন্ন ভিন্ন চাহিদা ও দাম কম দেওয়ার মানসিকতার জন্য গুড়ের সাথে চিনি কিংবা অন্য কিছু মেশানো হয়।

Jashore

যশোরের বাজারে এক ভাড় (৪ কেজি) জিরেন রস (টাককা রস) বিক্রি হচ্ছে ২০০ থেকে ২৫০ টাকায়। এক কেজি গুড় তৈরি করতে ৮ কেজি (দুই ভাড়) রসের প্রয়োজন হয়। দুই ভাড় রসের দাম ৫০০ টাকা। কিন্তু মানসম্মত এক কেজি গুড়

বিক্রি হচ্ছে সাড়ে তিনশ টাকায়। শুধু রসে গুড় হয় এর সাথে যোগ হয় জ্বালানি ও গাছির পরিশ্রম। এ হিসেবে গুড় তৈরি করে বিক্রির চেয়ে রস বিক্রি লাভজনক। তারপরেও গাছি গুড় তৈরি করছে ও তুলনামূলক কম দামে বিক্রি করছে। রসের চেয়ে গুড়ের দাম তুলনামূলক কম হওয়াটা স্বাভাবিক নয়।

বাউনডাঙ্গার গাছিরা জানিয়েছেন ‘খাজুরার মোটা পাটালি তৈরিতে কিছু পরিমাণ চিনি ব্যবহার না করলে জমাতে সমস্যা হয়। এই পাটালিতে চিনি ব্যবহার না করলে সুস্বাদুও হয় না। খাটি গুড় ও পাটালি কালচে বর্ণের হয়ে থাকে। ক্রেতাদের নজর কাড়তে পাটালি সাদা করতে সাধারণত হাতের পরিমাপে রস জ্বালানোর সময় ফিটকিরি মেশানো হয়।’

অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসিছে, কতিপয় গাছি অধিক মুনাফার জন্য বেশি পরিমাণে চিনি ব্যবহার করছেন। কখনও কখনও চিনির পরিমাণ গুড়ের সমান হচ্ছে। কয়েক জন গাছির ঘরে বস্তা ভরা চিনিও দেখা গেছে। কেউ কেউ রাতের আধারে চিনি পানিতে ভিজিয়ে রাখেন। রসের রঙ চড়াতে বিচালি ভোজানো পানিও মেশানো হয়।

কাশিমপুর গ্রামের গাছি আমিন বিশ্বাস ঢাকা মেইলকে বলেন, খাটি গুড়-পাটালি একটু কালচে বর্ণের হয়ে থাকে। এ পাটালি বেশি দিন থাকে না। আগের মতো এখন আর বাগান নেই যার কারণে রস জ্বালানোর কাঠও নেই। বাজারের চিনি দেওয়া সাদা পাটালি অনেক দিন থাকে। চিনি দেওয়া পাটালি ২শ টাকা কেজি দরে বিক্রি করলেও তাদের লাভ হয়। কারণ দুই ঠিলে রস জ্বালানোর পরে ১ কেজি মতো পাটালি হয়। আর যারা চিনি ব্যবহার করে তারা দুই ঠিলে রসে ২ থেকে ৩ কেজি পাটালি তৈরি করেন। ভেজাল পাটালি-গুড়ের কারণে ক্রেতাদের মনে কোনো আস্থা নেই। অনেকের খাঁটি গুড় দেখানোর পরেও চিনতে পারে না। যার কারণে আসল পাটালি-গুড় বিক্রি করতে আমাদের অনেক সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।

হাঁপানিয়া গ্রামের আলম হোসেন ঢাকা মেইলকে বলেন, আমরা খাঁটি গুড় তৈরি করি। ভেজাল কিভাবে তৈরি করতে হয় সেটায় বুঝি না। আমাদের গুড় অর্ডার নিয়ে শেষ করতে পারি না। গুড় সাধারণত আড়াইশ থেকে ৩শ টাকা কেজি দরে বিক্রি করি। ভেজাল গুড়ে বাজার ছেয়ে গেছে। দাম বেশি হলে বিক্রি হচ্ছে না। তাই কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। বর্তমানে জিনিসপত্রের দাম হিসেব করলে গুড়ের দাম অনেক কম। কারণ সকাল থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত মাঠে কাজ করলে কৃষাণকে দিতে হয় ৪ থেকে ৫শ টাকা। গুড় তৈরিতে পরিশ্রমের হিসেব করলে অনেক লোকসান। তাছাড়া ইচ্ছে করলেই প্রতিদিন রস পাওয়া যায় না। খাঁটি জিরেন রস পেতে খেজুর গাছকে বিশ্রাম দিতে হয়।

Jashore

গাছিদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, খাঁটি পাটালি আগুল দিয়ে চাপ দিলে নরম হবে। শক্ত হলে বুঝতে হবে কিছু মেশানো আছে। গুড় যদি একটু বেশি চকচকে হয় তাহলে বুঝতে হবে রস ভালো ছিল না নতুবা কিছু মেশানো। ভালো গুড়ের রঙ সব সময় গাঢ় খয়েরি বা একটু কালচে অথবা গাঢ় বাদামি রঙের। গুড়ের রঙ যত হালকা হবে বুঝতে হবে ভেজাল আছে। নতুন গুড়ে নুনতা স্বাদ থাকে না।

তাছাড়া গুড় গালে দিলে যদি কচকচ করে তবে চিনি মেশানো আছে বুঝতে হবে। আসল গুড় মুখে দিলেই গলে যায়।

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার বর্ননা মতে ফিটকিরি সবচেয়ে সস্তা, কার্যকর, উপযুক্ত জীবাণুনাশক ওষুধ। বেশি পরিমাণে ফিটকিরি খেলে পেটের ব্যাথা বা বিষক্রিয়া হতে পারে।

বৃহত্তর কুষ্টিয়া ও যশোর অঞ্চল কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক সেলিম হোসেন ঢাকা মেইলকে বলেন, আমাদের দেশে পাটালি-গুড়ে ভেজালের বিভিন্ন ধরণ রয়েছে। এগুলোতে আমাদের শরীরের জন্য বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। কিন্তু যশোর জেলার কৃষক বা গাছিদের মধ্যে দেখা যায় তারা পাটালি-গুড়ে ব্যবহার করে চিনি। যা মানব দেহের জন্য ক্ষতিকর নয়। তবে পাটালি-গুড়ের আসল স্বাদ ভিন্নতা তৈরি করে। মানুষ টাকা দিয়ে যে জিনিস পেতে চায় সেটা পাচ্ছেন না। ক্রেতারা নিয়মিত প্রতারণার শিকার হচ্ছে। এটা বড় ধরনের প্রতারণা।

তিনি আরও বলেন, আমরা গাছিদের নৈতিকতা অক্ষুণ্য রাখার জন্য বিভিন্ন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। ইতোমধ্যে জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য বিভিন্ন জায়গায় গাছিদের বাড়িতে প্রদর্শনী হিসেবে চুলা তৈরি করা হয়েছে। পাটালি-গুড়ের ভেজাল মুক্ত করার জন্য অনেক কৃষকদের শপথ করানো হয়।  অনেক কৃষক আমাকে বলে স্যার ১ কেজি গুড় তৈরি করতে ৭ থেকে ৮ কেজি রস লাগে। কিন্তু এ গুড় বাজারে নিয়ে ২শ থেকে আড়াইশ টাকা বিক্রি করি। যারা চিনি  মেশায় তারাও একই দামে বিক্রয় করে। আমরা সেই গাছিদের বলে থাকি মানুষের মনের আস্থা তৈরি করতে একটু সময় লাগে। আবার অনেক কৃষক আছে যারা খাঁটি গুড়-পাটালি তৈরি করছেন। অনেক সময় ভেজালের কারণে খাটি গুড়-পাটালি বিক্রি করতে সমস্যায় পড়েন। কিন্তু খাঁটি গুড়-পাটালি তৈরিতে মানুষের মনে আস্থা তৈরি হলে তখন আর কৃষক সরবরাহ দিয়ে  পারে না। এর জন্য প্রয়োজন মানুষের মনের আস্থা তৈরি করা।

প্রতিনিধি/এসএস