images

সারাদেশ

রামু ঐতিহ্যের অপূর্ব নিদর্শন লামারপাড়া বৌদ্ধবিহার

জেলা প্রতিনিধি

২০ জানুয়ারি ২০২৩, ০৯:৪০ এএম

কক্সবাজারের রামুতে সাম্য মৈত্রীর প্রাচীন বৌদ্ধ মন্দির ও বিহারের সংখ্যা অর্ধ শতাধিক। শত সহস্র বছর ধরে মুসলিম, বৌদ্ধ ও হিন্দু অসম্প্রদায়িক চেতনায় পাশাপাশি বসবাস করছেন। পারস্পরিক সম্পর্কে রয়েছে অটুট বন্ধন। বৌদ্ধ মন্দির ও বিহারগুলো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে সম্প্রীতির তীর্থস্থানে। সেখানে প্রতিদিন হাজার হাজার পর্যটকের ভিড় থাকে। জেলা শহরের কাছেই রম্যভূমি রামুতে গেলেই দেখা মিলবে হাজার বছরের পুরনো অনেক প্রাচীন বৌদ্ধবিহার ও মন্দির। এরমধ্যে অন্যতম ফতেখারকুল অফিসের চর লামারপাড়া বৌদ্ধবিহার।

Ramu

অন্যদিকে রামকোটে তিন একর জায়গার ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে বনাশ্রম বৌদ্ধ মন্দির, প্যাগোড়া ক্যাং বিহার ও অনাথ আশ্রম।

রামু চৌমুহনী থেকে মাত্র তিন কিলোমিটার দূরে অবস্থিত বনাশ্রম বৌদ্ধ মন্দির ও একটি বিহার। যা সম্রাট অশোকের আমলে তৈরি হয়েছিল বলে জনশ্রুতি রয়েছে। পাশেই রয়েছে অনাথ শিশু আশ্রম কেন্দ্র। দক্ষিণ দিকে অবস্থিত রামু রামকুট হিন্দু মন্দির। যা সীতার বনবাসের পঞ্চবতি বা রামের বীরত্বগাঁথা অধ্যায়। জীবনের  গুরুত্বপূর্ণ সময় পার হয় সেখানে। যে কারণে রামের নাম অনুসারে রামুর নামকরণ হয়েছে এবং রামকোট হিন্দু মন্দির স্থাপিত হয় আজ থেকে দুই শত বছর আগে।

বনাশ্রম বৌদ্ধ মন্দির ও বিহারের প্রধান ফটক দিয়ে প্রবেশের পর চোখে পড়ে কাঠ দিয়ে বানানো কয়েকটি ভবন। প্রতিটি ভবনেই কাঠের কারুকাজ করা।

Ramu

একটু এগোলেই কাঠের ভবনের সামনে দেখা মিলবে একটি ঘণ্টার ঘর। ভেতরে রয়েছে দুটি বড় বড় ঘণ্টা। প্রাচীন এই বিহারের অন্যতম আকর্ষণ এই ঘণ্টা দুটি। কথিত রয়েছে, একসময় এই দুই ঘণ্টার আওয়াজ শোনা যেত প্রায় ৫ মাইল দূর থেকে। একেকটি ঘণ্টার ওজন ৮০ মণেরও বেশি।

রামকোট বৌদ্ধ বিহারের বৌদ্ধভিক্ষু জোত্যি প্রিয় মহাতেরো ও বৌদ্ধবিহারের বর্তমান অধ্যক্ষব বুধিমিত্র ঢাকা মেইলকে বলেন, বিহারটি ১৯০৫ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয়। প্রতিষ্ঠা করেন তৎকালীন জমিদার থোয়াইঙ্গ্যা সওদাগর। ওই সময়ে মিয়ানমার থেকে কাঠ এবং অন্যান্য সরঞ্জাম এনে বিহারটির নির্মাণ কাজ করা হয়। অবশ্য এর বহু বছর আগে সেখানে প্রতিষ্ঠিত ছিল বৌদ্ধ মন্দির। এটি  ইতিহাসের এক অনন্য নিদর্শন।

শতবর্ষী এই বিহারের কাঠ ও নির্মাণে ব্যবহৃত সামগ্রী  এতটাই মজবুত যে এখনও দৃঢ়তার সঙ্গে দাঁড়িয়ে রয়েছে। শক্ত-পোক্ত আছে ভবনগুলোও। দূর-দূরান্ত থেকে অনেকেই আসেন এ বিহারে ধ্যান-সাধনা করতে। যদিও প্রাচীন নিদর্শনগুলো সংরক্ষণ এবং ধ্যানের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ বজায় রাখার জন্য এখন বিহারে প্রবেশে নানা বিধি আরোপ করা হয়েছে। বিহার পরিদর্শনের জন্যও অনুমতি নিয়ে ভেতরে ঢুকতে হয়।

Ramu

লামারপাড়া বৌদ্ধবিহারের আবাসিক অধ্যক্ষ পাঁঞয়াজ্যেতি ঢাকা মেইলকে বলেন, বহু বছর পুরনো হলেও এখনও শক্ত আছে বিহারের সব ভবন। ঘণ্টাগুলো যদিও এখন আর ব্যবহার হয় না। দেশের জন্য এই বিহার ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করবে একসময়। বর্তমানে বহু লোক দূর-দূরান্ত থেকে এখানে আসেন, ধ্যান সাধনার জন্যই মূলত বিহারে প্রবেশে কিছু বিধিনিষেধ দেওয়া হয়েছে।

প্রাচীন এই বিহারের ইতিহাস নিয়ে কথা হয় রামুর বৌদ্ধ ইতিহাস ও ঐতিহ্য গবেষক ধনিরাম বড়ুয়ার সঙ্গে। তিনি ঢাকা মেইলকে বলেন, রাম কোট ছাড়া ও লামারপাড়া বৌদ্ধবিহারের ভবনগুলো সেগুন কাঠের তৈরি। আমি দীর্ঘদিন ধরে লামারপাড়া বৌদ্ধবিহারের ইতিহাস খুঁজেছি। অনেক পুরনো ম্যাগাজিন এবং সরাসরি সূত্র থেকে লামারপাড়া বৌদ্ধবিহারের নানান ইতিহাস জেনেছি।

জানা যায়, লামারপাড়া বৌদ্ধবিহারে ধ্যানী বুদ্ধমূর্তিটি ব্রোঞ্জের তৈরি। মিয়ানমার থেকে কারিগর এনে লামারপাড়া বৌদ্ধমন্দিরে বুদ্ধমূর্তিটি তৈরি করা হয়েছিল।

Ramu

এদিকে রামুর ফতেখাঁরকুল, রাজারকুল,চৌমুহনী, চাকমার কূল, উত্তর মিঠাছড়িসহ রামুতে রয়েছে অর্ধশত বৌদ্ধ ক্যাং মন্দির, প্যাগোড়া ও বৌদ্ধ মন্দির। প্রাচীন প্রাগৈতিহাসিক রামু কৃষ্টি কালচার, সভ্যতা, সাংস্কৃতিক চর্চা সম্প্রীতির মিলন কেন্দ্র ছিল রামু। রামুর ফকিরাবাজার ছিল দক্ষিণ চট্রগ্রামের ঐতিহ্যবাহী বাণিজ্যিক কেন্দ্র। ইতিহাসবিদ প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষুর মতে কবিগুরু রবিন্দ্র নাথ ঠাকুরই রামুর কৃষ্টি কালচার নিয়ে অনেক কাব্য গ্রন্থ লিখেছেন। তিনিই প্রথম রামুকে রম্যভূমি হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন তার কাব্য গ্রন্থে।

ইতিহাসবিদ এম সুলতান আহমদ মনিরীর মতে, রামু যেন কোনো এক দরিদ্র পিতার উঠতি সুন্দরীর শুভ্র কপালের উজ্জ্বল রক্তটিপ। তাই চির যৌবনা হিরন্ময়ী রামুর অফুরন্ত প্রাকৃতিক সম্পদ আর অপার সম্ভাবনা দেখতে ছুটে যাচ্ছে প্রতিদিন শত শত পর্যটক।

প্রতিনিধি/এসএস