জেলা প্রতিনিধি
১৪ মার্চ ২০২২, ১১:৩৫ এএম
খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার রুধাঘরা ইউনিয়নের মধুগ্রাম। অনেকে চেনেন ‘মুড়ি গ্রাম’ নামে। রাত ৩-৪টা বাজতেই পাড়ার রান্নাঘরগুলোতে আলো জ্বলতে শুরু করে। পড়ে মুড়ি ভাজার ধুম। বছরের পর বছর ধরে এখানকার নারীরা হাতে মুড়ি ভেজে স্বাবলম্বী হয়েছেন। গড়েছেন নিজের এবং পরিবারের ভবিষ্যৎ। তেমনই এক নারী রূপা খাতুন। ৭ বছর বয়স থেকেই যাকে ধরতে হয়েছে সংসারের হাল।
ডুমুরিয়া উপজেলার রুধাঘরা ইউনিয়নের মধুগ্রামের কান্দরপাড়ায় বসবাস রূপা খাতুনের। তার বছর ৭ বয়সের সময় বাবা মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। রূপার সংসারে তখন ছোট ২ ভাই, মা এবং অসুস্থ বাবা। পড়ালেখা ছেড়ে তখন তিনি পাড়ার অন্য নারীদের সাথে মুড়ি ভাজার কাজে লেগে যান। বয়স কম থাকায় মুড়ি ভাজার মূল কাজটি তাকে কেউ করতে দেয়নি। তাকে করতে হতো চাল নাড়ানোর কাজ। প্রতি পাইলে (৯ কেজি) চাল নাড়ানোর জন্য তিনি পেতেন পাঁচ টাকা করে। ধীরে ধীরে রপ্ত করেন মুড়ি ভাজার বাকি কাজ। তখন স্থানীয় মুড়ির ব্যাপারী নারায়ণ সাহার সহায়তায় সংগ্রহ করেন মুড়ি ভাজার বাইলের হাড়ি, খোলা হাড়ি, ঝাঝরী, জাইলে, বাউলীসহ সকল সরঞ্জাম। মুড়ি ভাজতে কমপক্ষে দু’জনের প্রয়োজন হয়। তাই তিনি সাথে নেন স্থানীয় কুলসুম বেগমকে। সেই জুটিতে আজও তারা মুড়ি ভাজছেন।
রাত ৩টা থেকে কাজ শুরু করে সকাল ৮টা পর্যন্ত তারা প্রতিদিন ৫০ কেজি চালের মুড়ি ভাজেন। রূপার বয়স এখন ৪৪ এর কাছাকাছি। সংসারের বোঝা এখন আর তার ঘাড়ে নেই। এক ভাই বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের চাকরি করছেন। আরেক ভাই মাছের ঘের করেছেন। নিজেদের বাড়িতে এখন দালান উঠেছে। কিন্তু হাতে মেহেদী রাঙিয়ে বধূ সাজা হয়নি তার। এখনও মুড়ি ভাজার কাজ করে যাচ্ছেন তিনি।
স্থানীয় শিউলী ইয়াসমিন নামের একজন বলেন, রূপা অনেক প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে উঠে এসেছেন। তিনি উদ্যোমী একজন নারী; কখনো হার মানেননি। তিনি একজন সফল নারী।
কুলসুম বেগম জানান, অনেক পুরুষ মানুষও এমনভাবে সংসারের হাল ধরতে পারেন না। তিনি খুব কম বয়সে সংসারের হাল ধরেছেন। তার ভাইয়েরা এখন সমাজে প্রতিষ্ঠিত। সবাইকে নিয়ে এখনও এক সংসারে রয়েছেন।
অপ্রতিরোধ্য রূপা বলেন, ‘আমার স্বপ্ন পুরুন হয়চে। ভাইদের মুখের দিকে তাকালে আমার মন ভইরে যায়। এইডাই আমার সুখ।’
জানা গেছে, প্রতিদিন বিকেলে স্থানীয় ব্যাপারীরা রূপাদেরকে সেদ্ধ চাল সরবরাহ করেন। আর পরদিন সকালে রূপাদের কাছ থেকে নেন মুড়ি। এক বস্তা (৫০ কেজি) সিদ্ধ চালের মুড়ি ভেজে দিলে ব্যাপারীরা ৩৩০ টাকা থেকে ৩৮০ টাকা দেন।
ওই এলাকার মুড়ির ব্যাপারী মোঃ আবুল কাশেম জানান, হাতে ভাজা মুড়ির স্বাদ আলাদা। আধুনিক যুগে এখন আগের মতো হাতে ভাঁজা মুড়ি চলে না। তবে এ ধরণের মুড়ির কদর রয়েছে। দামও একটু বেশি।
এএ