জেলা প্রতিনিধি
২৫ অক্টোবর ২০২২, ০৬:৫০ এএম
প্রায় ৬ শ বছরের পুরানো মাচাইন জামে মসজিদটি কালের সাক্ষী হয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে। মসজিদটি ‘মাচাই মসজিদ ও মাজার’ নামেও পরিচিত। ত্রি-গম্বুজ বিশিষ্ট ও আকর্ষণীয় শিল্পমন্ডিত এই মসজিদটি দেশের অন্যতম পুরাকীর্তির একটি।
শিলালিপি অনুযায়ী, মসজিদটি ১৫০১ সালে হোসেন শাহ্ কর্তৃক নির্মিত হয়েছিল।
মসজিদটির অবস্থান মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলায় মাচাইন গ্রামে।
মাচাইন মাজার পরিচালনা কমিটির সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা শফিউদ্দিন আহমেদ জানান, মাচাইন গ্রামের এই মসজিদটি বর্তমানে মানিকগঞ্জ জেলার অন্যতম প্রাচীন স্থাপত্য ও পুরাকীর্তি।
এটি মানিকগঞ্জ জেলার ঐতিহ্যের প্রতীক বলে তিনি দাবি করেন।

জেলা সদর থেকে ২২ কিলোমিটার দূরে মূল অংশের ওপর রয়েছে তিনটি গম্বুজ। মূল অংশের উত্তর ও দক্ষিণ পাশের গম্বুজের চেয়ে মাঝের গম্বুজটি একটু বড়। মসজিদটির মূল অংশের ওপর রয়েছে নিখুঁত খাঁজকাটা কারুকাজ। প্রতিটি দেয়ালে প্রচুর কারুকাজ রয়েছে, যা সবার দৃষ্টি কাড়ে।
জানা যায়, মসজিদটি নির্মাণে ব্যবহার করা হয়েছে চুন, সুরকি ও সাদা সিমেন্ট। ঐতিহ্যের সাক্ষী হয়ে টিকে আছে মসজিদটি; কিন্তু মুসলিম ঐতিহ্যের চোখ-জুড়ানো এই শৈল্পিক স্থাপনাটি পৃষ্ঠপোষক, রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কারের অভাবে দিন দিন মলিন হয়ে যাচ্ছে।
স্থানীয়দের সূত্রে জানা যায়, বাংলার বিখ্যাত হোসেন শাহী বংশের সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহের রাজত্বকালে ইরাকের রাজধানী বাগদাদ থেকে ইসলাম প্রচারের জন্য শাহ্ রুস্তম বাগদাদী (রহ.) মানিকগঞ্জ অঞ্চলে আসেন। সেই সময় মাচাইন গ্রামে খানকা প্রতিষ্ঠা করেন। আর সেখানেই তার ভক্তরা মাচাইন মসজিদ ও মাজার নির্মাণ করেছে।
শাহ্ রুস্তম বাগদাদীর অলৌকিক গুণে মুগ্ধ হয়ে এলাকার লোকজন ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন।
৭৫ বছর বয়সী মো. কাদের মোল্লা জানালেন মাচাইন গ্রামের ইতিহাস। তিনি বলেন, বাবা-দাদাদের কাছ থেকে শুনেছি রুস্তম বাগদাদী ছিলেন অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী। তিনি নাকি বাঁশের মাচানের ওপর অবস্থান করতেন। পরে ধীরে ধীরে হজরত শাহ রুস্তমের ভক্তরা ওই মাচান ও খানকার আশপাশে বাড়িঘর নির্মাণ করে বসবাস করতে থাকেন। সেই থেকে এই গ্রামের নাম হয়েছে মাচাইন।
মো. কাদের মোল্লা বলেন, মাচাইন গ্রামটি বর্তমানে ইছামতি নদীর তীরে অবস্থিত। কিন্তু হজরত শাহ্ রুস্তম যখন মাচাইন গ্রামে আসেন, তখন কোশী ও তিস্তার স্রোতধারা অবলম্বন করে প্রাচীন ভুবনেশ্বর নদী প্রবহমান ছিল। বিক্রমপুর, সোনারগাঁও, ঢাকা, সাভার ও ধামরাইয়ের সঙ্গে পশ্চিম বাংলা ও পশ্চিম ভারতীয় রাজধানীগুলোর জলপথের গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ অঞ্চলে ছিলো এ গ্রাম।

মো. শহীদ মিয়া নামে আরেকজন জানান, গ্রামের মুরুবিদের কাছ থেকে শুনেছি, পদ্মা নদীতে একটি পণ্যবাহী বড় নৌকা ঝড়ের কবলে পড়ে ডুবে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। বিপদে পড়া মাঝিমাল্লারা এই হজরত শাহ রুস্তমের মাজারে শিন্নি করবে বলে মানত করলে নৌকাটি ডুবে যাওয়া থেকে রক্ষা পায়।
শহীদ মিয়ার কাছে জানা যায়, এই মাজারের ভেতরে ৬ শ বছর আগের কিছু পুরনো পাথর রয়েছে। হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ ও কিছু মুসলমান ধর্মের মানুষ এই পাথরে দুধ ও বাতাসা দেন। মসজিদ ও মাজার কমিটি নিষেধ করার পরেও মানুষ এখনও ভ্রান্ত ধারনা নিয়ে এসব দেন।
মাচাইন মাজারের খাদেম ও মসজিদের ঈমাম মিজানুর রহমান জানান, আজ থেকে প্রায় ৬ শ বছর আগের পুরাতন মাজার এটি। হজরত রুস্তম বোগদাদী (রহ.) ইসলাম প্রচারের জন্য ইরাকের বাগদাদ শহর থেকে মানিকগঞ্জের মাচাইন গ্রামে আসেন। সেখানে তিনি একটি মাচা বানিয়ে থাকতেন। সারাদিন ইসলাম প্রচার করতেন। রাতে এই মাচায় তিনি বিশ্রাম করতেন। পরবর্তীতে এখানে তিনি একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। তিনি মারা গেলে এখানে তার সমাধি হয়। এখন তার মাজারে প্রতিবছর বাৎসরিক ওরস মোবারক আয়োজন করা হয়।
এছাড়াও দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে এই মসজিদে নামাজ পরার জন্য অনেকে আসেন।
প্রতিনিধি/এইচই