জেলা প্রতিনিধি
১৩ অক্টোবর ২০২২, ১২:১৭ পিএম
দেড়শ বছরেরও বেশি পুরনো ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌরসভা। এই শহরে নিবন্ধিত ইজিবাইক ও রিকশার সংখ্যা ৪ হাজার ১০০টি। তবে বাস্তবে এই সংখ্যার প্রায় দ্বিগুণ ইজিবাইক ও রিকশা চলাচল করছে সড়কে। এর ফলে শহরে নিত্যদিন তৈরি হচ্ছে যানজট। আর দীর্ঘক্ষণ যানজটে পড়ে নষ্ট হচ্ছে মানুষের কর্মঘণ্টা। এছাড়া শহরের অধিকাংশ রাস্তাই ভাঙা। ড্রেনেজ ব্যবস্থা ভালো না হওয়ায় সামান্য বৃষ্টিতেই হাঁটু পানি জমে সড়কে। এ অবস্থায় সেবার মান না বাড়িয়ে উল্টো কর বাড়িয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ। এতে ক্ষুদ্ধ পৌরবাসী।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১৮৬৮ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌরসভা প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৮ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই পৌরসভায় প্রায় ২ লাখ মানুষের বসবাস। তবে প্রথম শ্রেণির ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌসভার অধিকাংশ রাস্তা ভাঙাচোরা। দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার না করায় এসব রাস্তায় চলাচলে দুর্ভোগে পড়তে হয় চলাচলকারীদের। সরু ড্রেনগুলো থেকে ময়লা উপচে পড়ে রাস্তায়। একটু বৃষ্টি হলেই রাস্তায় জমে হাঁটু পানি। তখন আর দুর্ভোগের অন্ত থাকে না পৌরবাসীর।

পৌরসভার কয়েকটি ড্রেন দিয়ে ময়লা গিয়ে পড়ে তিতাস নদীতে। বিশেষ করে শহরের পাইকপাড়া ও কুমারশীল মোড় এলাকার দুইটি ড্রেন দিয়ে প্রতিনিয়ত ময়লা পড়ে বিষাক্ত হচ্ছে নদীর পানি। এ নিয়েও উদাসীন পৌর কর্তৃপক্ষ। তবে এসব সমস্যার সমাধান না করে নতুন অর্থবছরের শুরুতেই হোল্ডিং ট্যাক্স বাড়ানো হয়েছে ২০ শতাংশেরও বেশি।
টিনের বাড়ির জন্য সর্বনিম্ন হোল্ডিং ট্যাক্স ৫০ টাকা বাড়িয়ে ৩৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া সেমি পাকা ঘরের ক্ষেত্রে প্রতি স্কয়ার ফিট ৪০ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৬০ পয়সা এবং পাকা বাড়ির জন্য হোল্ডিং ট্যাক্স দিতে হবে ৯৫ পয়সা থেকে ১.১৫ টাকা পর্যন্ত।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌরসভায় হোল্ডিং আছে প্রায় ২৬ হাজার। গেল অর্থবছরে পৌর কর্তৃপক্ষ হোল্ডিং ট্যাক্স আদায় করেছে ৬ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। তবে হোল্ডিং ট্যাক্স ছাড়াও বিভিন্ন লাইসেন্স এবং হাট-বাজার ইজারাসহ আরও কয়েকটি আয়ের খাত রয়েছে পৌরসভার।

করোনার করাণে গেল দুই বছর অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ যখন ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টায় রয়েছে, তখন হোল্ডিং ট্যাক্স বৃদ্ধির সিদ্ধান্তে ক্ষুব্দ পৌরবাসী। এছাড়া সেবার মান না বাড়িয়ে ট্যাক্স বাড়ানোকে অযৌক্তিক বলে মনে করছেন নাগরিক সমাজের নেতারা।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের কাজীপাড়া এলাকার বাসিন্দা আরিফুর রহমান জানান, এমনিতেই পৌরসভার রাস্তা-ড্রেনেজ ব্যবস্থার নাজেহাল অবস্থা। পৌরসভা যে ট্যাক্স নিচ্ছে সেইটি সেবার তুলনায় বেশি। এখন আবার ট্যাক্স বাড়ানো একেবারেই অযৌক্তিক। নাগরিকদের ওপর করের বোঝা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত থেকে পৌর কর্তৃপেক্ষর সরে আসার দাবি জানান তিনি।
শহরের হালদারপাড়া এলাকার বাসিন্দা মো. হানিফ জানান, পৌরসভা থেকে অতিরিক্ত ইজিবাইক ও রিকশার লাইসেন্স দেওয়ায় প্রতিদিন রাস্তায় তীব্র যানজট তৈরি হয়। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েন মানুষ। পাশাপাশি দীর্ঘসময় যানজটে পড়ে কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়। শহরের অনেক রাস্তাই সড়কই ভাঙা। নাগরিকদের দুর্ভোগ কমাতে এ সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধান করা প্রয়োজন পৌর কর্তৃপক্ষের।
নদী নিরাপত্তা সংগঠন ‘নোঙর’- এর ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক শামীম আহমেদ জানান, কিছু ড্রেনের ময়লা সরাসরি নদীতে গিয়ে পড়ছে। এতে বিষাক্ত হচ্ছে নদীর পানি। ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন, ভাঙা সড়কগুলো মেরামত না করে ট্যাক্স বাড়ানোর সিদ্ধান্ত অযৌক্তিক। পৌর কর্তৃপক্ষকে আগে নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে হবে।

জেলা নাগরিক ফোরামের সভাপতি পীযূষ কান্তি আচার্য বলেন, ‘গত দুইবছর করোনা মহামারির পর দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে মানুষ অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ অবস্থায় ট্যাক্স বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নাগরিকদের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। তাছাড়া পৌরসভার সেবার মান বাড়েনি। যানজট ও জলাবদ্ধতার কারণে নাগরিকদের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে’।
এ অবস্থায় নাগরিকদের কাঙ্ক্ষিত সেবা দিয়ে তাদের সন্তুষ্ট করে তারপর সহনীয় মাত্রায় ট্যাক্স বর্ধিত করার পরামর্শ দেন তিনি।
এ বিষয়ে জানাতে চাইলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌরসভার মেয়র নায়ার কবির ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘যতগুলো রিকশা ও ইজিবাইকের লাইসেন্স দেওয়া প্রয়োজন, ততগুলোই দেওয়া হয়েছে। একই লাইসেন্স দিয়ে একাধিক রিকশা-ইজিবাইক চলছে। এগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। আর ৬ বছর পর ২০ শতাংশ হোল্ডিং ট্যাক্স বাড়ানো হয়েছে। এটিও সবার সঙ্গে আলোচনা করেই করা হয়েছে। এছাড়া নাগরিক সুবিধা বাড়ানোর জন্যও কাজ চলছে। ভাঙা সড়কগুলো সংস্কার কাজও দ্রুত সময়ের মধ্যে শুরু হবে।’
টিবি