images

সারাদেশ

রানি এলিজাবেথের স্মৃতিবিজড়িত গাজীপুরের আদর্শ গ্রাম

জেলা প্রতিনিধি

০৯ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০২:১৬ পিএম

বাংলাদেশের আর দশটি গ্রামের মতো নিভৃত পল্লী বৈরাগীরচালা। আজ থেকে ৩৯ বছর আগে গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার এই গ্রামে এসেছিলেন ব্রিটেনের সদ্য প্রয়াত রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ। গ্রামটির মানুষের কাছে এখনও সেই স্মৃতি দেদীপ্যমান। 

তাই তো ১৯৮৩ সালের ১৬ নভেম্বর দিনটি ইতিহাস হয়ে আছে শ্রীপুরবাসীর কাছে। দীর্ঘ ৩৯ বছর পরও বৈরাগীরচালা আদর্শ গ্রামের মানুষ ভুলেনি রানির স্মৃতি। রানির পদস্পর্শে ধন্য শ্রীপুরের মাটিতে পরবর্তীতে শুরু হয় শিল্পোন্নয়ন। এরই ধারাবাহিকতায় আজ শ্রীপুর শিল্প অধ্যূষিত এলাকা। বাংলাদেশের গাজীপুর জেলার শ্রীপুর উপজেলার বৈরাগীরচালা গ্রামে রানি যেন ইতিহাস হয়ে থাকলেন

বাংলাদেশে আসার পর রানী সেই গ্রাম পরিদর্শনে যাবেন এমন খবরে তোড়জোড় পড়ে যায় স্থানীয় প্রশাসনে। আর দশজন সাধারণ মানুষ নয়, খোদ ব্রিটেনের রানি! পায়ে হেঁটে গ্রামের আনাচে কানাচে দেখেছিলেন রানি এলিজাবেথ। কাছ থেকে দেখেছিলেন গ্রামবাংলার দৃশ্য।

স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ১৯৮৩ সালের ১৬ নভেম্বর ব্রিটেনের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ গাজীপুরের তৎকালীল শ্রীপুর ইউনিয়ন বর্তমানে পৌর এলাকার বৈরাগীরচালা আদর্শ গ্রাম দেখতে আসেন। ব্রিটেন থেকে রানির আগমন উপলক্ষে নানা সাজে সেজেছিল পুরো শ্রীপুর। শ্রীপুর রেলস্টেশন থেকে বৈরাগীরচালা পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার রাস্তা পিচ ঢালাই করা হয়েছিল। রাস্তার দু’পাশে রোপণ করা হয়েছিল গাছের চারা। সেজেছিল গ্রামের প্রতিটি বাড়ি। 

শ্রীপুর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সাবেক সভাপতি প্রয়াত মো. মিজানুর রহমান খান গড়ে তুলেছিলেন ওই আদর্শ গ্রাম। নিজ জমিতে প্রতিষ্ঠা করে ছিলেন মসজিদ, মক্তব। ছিল পোস্ট অফিস, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়। গ্রামে ছিল হাঁস মুরগীর খামার, পশু প্রজনন কেন্দ্র, কৃষি সেচের জন্য গভীর নলকূপ, ছিল বিদ্যুৎ সংযোগও। ঢাকা থেকে ৬৫ কিমি দূরে এই পল্লী গ্রামে রানি আসেন বিশেষে ট্রেনে। সেসময় লাল গালিচার সংবর্ধনায় বরণ করা হয়েছিল তাকে। সেখান থেকে বিশেষ গাড়িতে চড়ে যান আদর্শ গ্রাম বৈরাগীরচালায়। পুরো সড়কের দু’পাশে শিক্ষার্থীরা হাতে বাংলাদেশ ও ব্রিটেনের পতাকা নেড়ে ফুলের পাপড়ি ছিটিয়ে রানিকে স্বাগতম জানায়। সেদিন রাস্তার দু’পাশে ছিল অগণিত উৎসুক জনতার ভিড়। রানিকে এক নজর দেখতে ছিল মানুষের প্রাণান্ত চেষ্টা। হাত নেড়ে সকলকে শুভেচ্ছা জানিয়েছিলেন রানি। ঐতিহাসিক ক্ষণে আদর্শ গ্রামে এসে সাধারণ মানুষের সাথে মিলেমিশে একাকার হয়েছিলেন তিনি। 

ব্রিটেনের রানি এভাবে গ্রামবাসীর সঙ্গে মিশবেন এটি স্বপ্নকেও ছাড়িয়েছিল। গ্রাম ঘুরে রানি দেখেছিলেন বাংলার ঐতিহ্যবাহী মুড়ি ভাজার দৃশ্য। মুগ্ধ হয়ে ছিলেন শান বাঁধানো ঘাটে দাড়িয়ে পুকুর থেকে জাল দিয়ে মাছ ধরা দেখে। দেখেছিলেন তাঁতের কাপড় বোনা। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শ্রেণীকক্ষে পাঠ দানের দৃশ্যও মুগ্ধ করেছিল তাকে। 

তৎকালীন স্বনির্ভর গ্রামের যুব ফ্রন্টের সভাপতি মো. মনিরুজ্জামান খান রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের স্মৃতি চারণ করে বলেন, ‘তিনি আমাদের গ্রামে এসেছিলেন। গ্রাম ঘুরে দেখেছেন। রানির আগমনে গ্রামের মানুষ আবেগাপ্লুত হয়েছিল। আজও আমরা রানির স্মৃতি ভুলতে পারিনি। আমরা বৈরাগীরচালার মানুষ রানির মৃত্যুতে শোকাহত।’ 

স্বনির্ভর গ্রামের প্রতিষ্ঠাতা, প্রয়াত মো.মিজানুর রহমান খানের ছেলে মো. শাখাওয়াত হোসেন খান সাংবাদিকদের বলেন, ‘ব্রিটেনের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথকে কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল। একটি আদর্শ গ্রাম দেখতে তিনি বৈরাগীরচালার মতো নিভৃত পল্লীতে এসেছিলেন। গ্রামের মানুষের আন্তরিকতায় মুগ্ধ হয়েছিলেন। আমাদের গ্রামের মানুষ তাকে চিরকাল মনে রাখবে। দ্বিতীয় রানি এলিজাবেথের প্রয়ানে আমরা শোকাহত। তার আত্মার শান্তি কামনা করি।’

শ্রীপুর পৌরসভার মেয়র মো. আনিছুর রহমান বলেন, ‘ব্রিটেনের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের শ্রীপুরে আগমন বিশ্ববাসীর কাছে আমাদেরকে গৌরবান্বিত করেছে। তার পদচারণায় শ্রীপুরের উন্নয়নের সূচনা হয়েছে। আমরা রানির স্মৃতিকে ভুলব না।’

প্রসঙ্গত, ব্রিটেনের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ দুইবার ঢাকা সফরে এসেছিলেন। প্রথমবার এসেছিলেন স্বাধীনতার আগে ১৯৬১ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি। দ্বিতীয়বার স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৮৩ সালের ১৪-১৭ নভেম্বর। দ্বিতীয়বার এসে তিনি গাজীপুরে যান। স্কটল্যান্ডের বালমোরাল ক্যাসেলে বৃহস্পতিবার (৮ সেপ্টেম্বর) স্থানীয় সময় বিকেল ৫টার দিকে মারা যান রানি এলিজাবেথ।

প্রতিনিধি/এএ