Dhaka Mail Logo

সারাদেশ

টেকনাফের গহিন পাহাড়ে মানবপাচারের ভয়ংকর সাম্রাজ্য

জেলা প্রতিনিধি

০৮ নভেম্বর ২০২৬, ০৫:৩৮ পিএম

কক্সবাজারের টেকনাফের দুর্গম পাহাড়গুলো যেন ক্রমেই আন্তর্জাতিক মানবপাচারকারী চক্রের নিরাপদ আস্তানায় পরিণত হচ্ছে। অধিক বেতনের প্রলোভন দেখিয়ে সাগরপথে মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডে পাঠানোর কথা বলে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা অসহায় যুবক এবং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দাদের এসব পাহাড়ি আস্তানায় আটকে রাখা হচ্ছে। সেখানে মুক্তিপণ আদায়, নির্যাতন ও প্রাণনাশের হুমকির মাধ্যমে চালানো হচ্ছে অমানবিক নির্যাতন।

মানবপাচারের এই ভয়ংকর নেটওয়ার্কের সর্বশেষ নির্মম চিত্র সামনে এসেছে গত ৫ নভেম্বর। হ্নীলা ইউনিয়নের রঙ্গীখালী ও লেদা নুরালীপাড়া সংলগ্ন গহিন পাহাড়ে সশস্ত্র পাচারকারীদের আস্তানায় যৌথ বাহিনীর অভিযানে ঘটে তুমুল গোলাগুলি। পাচারকারীদের প্রতিরোধের মুখে পরিচালিত এ অভিযানে দেশের নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে জীবন উৎসর্গ করেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তরুণ সৈনিক মো. তিতাস শেখ (২৭)। তাঁর আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে আবারও সামনে এসেছে টেকনাফের পাহাড়ে বিস্তার লাভ করা মানবপাচারের ভয়াবহ চিত্র এবং এর পেছনে সক্রিয় সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের ভয়ংকর তৎপরতা।

আরও পড়ুন

পাচার হচ্ছে সার, বিনিময়ে ঢুকছে মাদক-অস্ত্র!

আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদফতর (আইএসপিআর) ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্যমতে, গোয়েন্দা সূত্রে খবর ছিল ১৫ থেকে ১৬ জনের একটি সশস্ত্র মানবপাচারকারী দল রঙ্গীখালীর দুর্গম পাহাড়ে প্রায় ১২০ জন রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশি নাগরিককে জিম্মি করে রেখেছে। ৫ নভেম্বর বিকেল ৫টার দিকে সেনাবাহিনীর ১০ পদাতিক ডিভিশন, বিজিবি ও পুলিশের সমন্বয়ে গঠিত একটি যৌথ আভিযানিক দল সেখানে অভিযান চালায়। যৌথ বাহিনীর উপস্থিতি টের পেয়েই পাহাড়ের চূড়া থেকে এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ শুরু করে পাচারকারীরা।

Teknaf2

পাল্টা জবাব দেয় যৌথ বাহিনী। গোলাগুলির একপর্যায়ে বাঁ কাঁধে ও বুকের পাশে গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার লস্করদিয়া গ্রামের সন্তান সেনাসদস্য তিতাস শেখ। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে অবস্থার অবনতি হলে তাকে উদ্ধার করে প্রথমে নিকটস্থ হাসপাতালে এবং পরে রামু সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তিতাসের এই আত্মত্যাগের বিনিময়ে ওই আস্তানা থেকে ৫৭ জন জিম্মিকে জীবিত উদ্ধার এবং চক্রের ৫ সদস্যকে অস্ত্রসহ আটক করতে সক্ষম হয় বাহিনী।

যেভাবে চলছে ‘মৃত্যুফাঁদ’ সিন্ডিকেট

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক সূত্র ও স্থানীয়দের অনুসন্ধানে জানা গেছে, টেকনাফের এই মানবপাচার সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণ করছে স্থানীয় প্রভাবশালী ও রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের সমন্বয়ে গঠিত কয়েকটি দুর্ধর্ষ সিন্ডিকেট। যার মধ্যে অন্যতম হলো কুখ্যাত পাচারকারী ‘লেংগা ছৈয়দুল’ চক্র এবং রঙ্গীখালী ও লেদাকেন্দ্রিক আবদুল করিম ও পাহাড়ি ডাকাত সিন্ডিকেট ।

আরও পড়ুন

কক্সবাজারে ছিনতাইকারীদের দৌরাত্ম্যে অসহায় পর্যটক ও স্থানীয়রা

লোভের ফাঁদ, দালালের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে অসহায় যুবকদের বিনা খরচে বা স্বল্প খরচে মালয়েশিয়ায় উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে টেকনাফে আনা হয়। এরপর তাদের মেরিন ড্রাইভ বা উপকূলীয় এলাকা থেকে অপহরণ করে গহিন পাহাড়ের গোপন আস্তানায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে হাত-পা বেঁধে নির্যাতন চালিয়ে পরিবারের কাছে ভিডিও কল দিয়ে লাখ লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায় করা হয়। এই চক্রগুলোর হাতে রয়েছে দেশি-বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র। রঙ্গীখালীর অভিযানেও পিস্তল ও দেশীয় বন্দুক উদ্ধার হয়েছে। মূলত পাহাড়ের দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে এরা গড়ে তুলেছে নিজস্ব সাম্রাজ্য।

আতঙ্ক ও অনিশ্চিত দিন কাটে স্থানীয়দের

পাহাড়কেন্দ্রিক এই সশস্ত্র চক্রগুলোর দৌরাত্ম্যে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন টেকনাফের সাধারণ মানুষ। রঙ্গীখালী এলাকার বাসিন্দা আবদুল্লাহ আল মামুন ঢাকা মেইলকে বলেন, সন্ধ্যা নামলেই পাহাড়ের দিক থেকে গুলির শব্দ আর জিম্মিদের আর্তনাদ শোনা যায়। পাচারকারীরা ভারী অস্ত্র নিয়ে পাহাড়ে অবস্থান করে, ভয়ে আমরা জুম চাষ বা কাঠ সংগ্রহের জন্যও পাহাড়ে যেতে পারি না।

Teknaf3

লেদা এলাকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী রশিদ আহমেদ জানান, দেশের বিভিন্ন জেলা ও স্থানীয়ভাবে আসা অপরিচিত লোকজনকে প্রতিদিনই ইজিবাইক বা সিএনজিতে করে পাহাড়ের পাদদেশে নিয়ে যেতে দেখা যায়। স্থানীয় দালালদের সহযোগিতায় এদের পাহাড়ে তুলে দেওয়া হয়। প্রতিবাদ করলে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়।

হ্নীলা ইউনিয়নের প্রবীণ বাসিন্দা মাস্টার নুরুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে ঢাকা মেইলকে বলেন, আগে শুধু সাগরপথে পাচার হতো, এখন পাহাড়কে টর্চার সেল বানানো হয়েছে। সেনাবাহিনীর একজন সদস্যকে তারা গুলি করে মেরে ফেলল, এতেই বোঝা যায় এই সিন্ডিকেট কতটা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। স্থায়ী ক্যাম্প না বসালে এদের থামানো কঠিন হবে।

এই সিন্ডিকেট নির্মূলে যৌথ বাহিনীর কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম ঢাকা মেইলকে বলেন, রঙ্গীখালী ও লেদা পাহাড়ে দীর্ঘদিন ধরে একটি সশস্ত্র চক্র জিম্মি ও মানবপাচারের আস্তানা গড়ে তুলেছিল। অভিযানে ৫৭ জনকে উদ্ধার ও ৫ জনকে অস্ত্রসহ আটক করা হয়েছে। আটককৃতদের জিজ্ঞাসাবাদে চক্রের মূল হোতাদের নাম পাওয়া গেছে। তাদের গ্রেফতারে আমাদের অভিযান চলমান রয়েছে এবং এ ঘটনায় কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

আরও পড়ুন

কক্সবাজারের অধিকাংশ হোটেল-রিসোর্ট অনুমোদনহীন, নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা

বাহারছড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ আবু সাঈদ ঢাকা মেইলকে বলেন, এখানে যারা অপহরণকারী এরাই ডাকাত, আবার এরাই মানবপাচারকারী। সাম্প্রতিক সময়ে অপহরণকারী বা ডাকাত চক্রের পাঁচজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। মানবপাচারকারী গ্রেফতার হয়েছে ২৫ জন। পাচারকারীরা মূলত মেরিন ড্রাইভ ও বাহারছড়া উপকূলীয় পয়েন্টগুলো ব্যবহার করে ট্রলারে ভুক্তভোগীদের সাগরে ভাসানোর চেষ্টা করে। পাহাড় ও উপকূলের সংযোগস্থলগুলোতে আমরা নজরদারি ও চেকপোস্ট জোরদার করেছি, যাতে কোনো দালাল চক্র ভুক্তভোগীদের উপকূলে নামাতে না পারে।

১৬ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) অধিনায়ক কাউছার সিকদার জানান, উদ্ধার হওয়া জিম্মিদের মধ্যে রোহিঙ্গা নাগরিকও রয়েছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ভেতর থেকে যেসব দালাল সাধারণ রোহিঙ্গাদের প্রলোভন দেখিয়ে বা অপহরণ করে পাহাড়ের পাচারকারী চক্রের হাতে তুলে দিচ্ছে, তাদের চিহ্নিত করা হয়েছে। ক্যাম্পগুলোতে গোয়েন্দা নজরদারি ও ব্লক রেইড বাড়ানো হয়েছে।

Teknaf4

কক্সবাজারের জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) এএনএম সাজেদুর রহমান ঢাকা মেইলকে বলেন, দেশের সার্বভৌমত্ব ও মানুষের নিরাপত্তার স্বার্থে কাজ করতে গিয়ে সেনাসদস্য তিতাস শেখ যে আত্মত্যাগ করেছেন, তা জাতি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে। পাহাড়ে কোনো সন্ত্রাসী বা মানবপাচারকারী চক্রের অস্তিত্ব রাখা হবে না। পুলিশ, সেনাবাহিনী, বিজিবি ও এপিবিএন সমন্বিতভাবে কাজ করছে। এই চক্রের গডফাদারদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।

মানবপাচারের উদ্বেগজনক চিত্র

বাংলাদেশে মানবপাচার রোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অবস্থান এবং ২০২৬ সালে সরকার ‘মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন অধ্যাদেশ, ২০২৬’ প্রণয়ন করা হলেও পাচারকারীদের দৌরাত্ম্য থামছে না। মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের (US State Department) ২০২৫ এবং ২০২৬ সালের ‘ট্র্যাফিকিং ইন পারসন্স’ (TIP) প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণ করলে গত দুই বছরের একটি উদ্বেগজনক চিত্র ফুটে ওঠে।

আরও পড়ুন

রোহিঙ্গা সংকটের বিষফল: মাদকের আগ্রাসন, চাপে পরিবেশ-অর্থনীতি-নিরাপত্তা

২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত সময়ের তথ্য পর্যালোচনা করে প্রকাশিত ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশে মানবপাচার সংক্রান্ত মামলা ও তদন্তের সংখ্যা বাড়লেও অপরাধীদের সাজার হার এবং ভুক্তভোগী শনাক্তের সংখ্যা কমেছে।

২০২৪ সালে সারা দেশে মাত্র ৭৬ জন মানবপাচারকারী আদালতে দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন। অন্যদিকে, ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় যে, অভ্যন্তরীণ শ্রম ও যৌন পাচার এবং বিশেষ করে রোহিঙ্গা শরণার্থী ও বিদেশফেরত কর্মীদের সুরক্ষায় পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় বাংলাদেশকে টানা ‘টিয়ার-২’ (Tier-2) তালিকাভুক্ত রাখা হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাওয়া এবং বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার কারণেই টেকনাফের পাহাড়ে সিন্ডিকেটগুলো এতটা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।

প্রতিনিধি/জেবি