Dhaka Mail Logo

সারাদেশ

পানের পাতায় জীবিকার চাবি, সেই পানেই এখন লোকসান

জেলা প্রতিনিধি

০৮ নভেম্বর ২০২৬, ০৫:০২ পিএম

পাহাড়ের উঁচু-নিচু ঢালে পানের বরজ। সেখানে গাছের পরিচর্যায় ব্যস্ত পুরুষেরা। আর পুঞ্জির ঘরের বারান্দায় বসে নারীরা নিপুণ হাতে সাজাচ্ছেন পানের পাতা। শত বছরের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে থাকা এই পান চাষই মৌলভীবাজারের খাসিয়াদের জীবন-জীবিকার প্রধান অবলম্বন। কিন্তু প্রকৃতির বিরূপতা, উৎপাদন হ্রাস, পানের দরপতন ও উৎপাদন খরচ বৃদ্ধিতে সেই জীবিকায় এখন সংকট দেখা দিয়েছে। সংসারের খরচ মেটাতে গিয়ে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন অনেক পানচাষী।

মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল, কমলগঞ্জ, কুলাউড়া, জুড়ী, বড়লেখা ও রাজনগরের পাহাড়ি এলাকায় রয়েছে ছোট-বড় ৬৫টি খাসিয়া পুঞ্জি। এসব পুঞ্জিতে ঐতিহ্যগত পদ্ধতিতে পান চাষ করা হয়। খাসিয়াদের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে পানপাতা। অতিথি আপ্যায়ন, জন্মদিন, বিয়ে কিংবা বিভিন্ন পালা-পার্বণে পান-সুপারি অন্যতম অনুষঙ্গ।

পুঞ্জিগুলোতে পান চাষের কাজে রয়েছে নারী-পুরুষের আলাদা ভূমিকা। পুরুষেরা পানগাছের পরিচর্যা ও পাতা সংগ্রহ করেন। অন্যদিকে নারীরা দলবদ্ধভাবে পান সাজিয়ে বাজারজাত করার উপযোগী গুছি তৈরি করেন। ১২টি পাতায় এক গুছি, ১২ গুছিতে এক কান্তা এবং ২০ কান্তায় এক কুড়ি পান হয়।

পানচাষীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বর্ষাকাল পানের ভরা মৌসুম হলেও চলতি বছরের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হওয়ায় উৎপাদন প্রায় অর্ধেকে নেমেছে। আগে দেড় মাস পরপর গাছ থেকে পান সংগ্রহ করা গেলেও এখন অপেক্ষা করতে হচ্ছে দুই থেকে আড়াই মাস। শুধু উৎপাদন কমেনি, ছোট হয়ে যাচ্ছে পাতার আকারও। ফলে বাজারে বড় পাতার তুলনায় ছোট পান কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।

অন্যদিকে বেড়েছে শ্রমিকের মজুরি ও উৎপাদন উপকরণের দাম। মৌসুমভেদে প্রতি কুড়ি পান ৫০০-৬০০ টাকা থেকে শুরু করে ২-৩ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। তবে উৎপাদন কমে যাওয়া ও বাজারদরের ওঠানামায় অনেক সময় বিক্রির অর্থ দিয়ে চাষের খরচও তুলতে পারছেন না তারা।

খাসিয়া পানের পাইকার রাখাল বৈদ্য বলেন, কাঁচামালের দাম কখনো বাড়ে, আবার কখনো কমে। কোনো সময় লাভ হয়, আবার কোনো সময় লোকসান গুনতে হয়।

খাসিয়া সোশ্যাল কাউন্সিলের প্রচার সম্পাদক সাজু মারছিয়াং বলেন, চলতি বছর মৌসুমের শুরুতে আশানুরূপ বৃষ্টি হলেও জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত দীর্ঘ সময় কম দামে পান বিক্রি করতে হয়েছে। এখন শীতের আগমনে পানের মৌসুম শেষের দিকে। অনেকের জুমে পানও কমে গেছে। এতে খাসিয়া পুঞ্জির অনেক পরিবার আর্থিক সংকটে পড়বে।

তিনি জানান, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়লেও পানের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় চাষীরা হতাশ। অনেকে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন। দেশের চাহিদা মিটিয়ে খাসিয়া পান বিদেশেও রফতানি হচ্ছে। এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে সরকারি আর্থিক সহায়তা, সহজ শর্তে ঋণ ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা জরুরি।

লাউয়াছড়া খাসিয়া পুঞ্জির মান্ত্রী (পুঞ্জিপ্রধান) ফিলা পতমী বলেন, পানের রোগবালাইয়ের ধকল কাটিয়ে এ বছর যে উৎপাদন হয়েছে, তারও ন্যায্যমূল্য পাওয়া যাচ্ছে না। সবকিছুর দাম বাড়ছে, অথচ পানের দাম কমছে। খাসিয়াদের আয়ের প্রধান উৎস পান চাষ। অনেকেই ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন। সরকারি আর্থিক সহায়তা ও পৃষ্ঠপোষকতা পেলে পানচাষীরা ঘুরে দাঁড়াতে পারতেন।

একই সংকটের কথা জানালেন কমলগঞ্জের মাধবপুর ইউনিয়নের হিরামতী খাসিয়া পুঞ্জির মান্ত্রী (পুঞ্জিপ্রধান) বিওয়ানলী সুঙ। তিনি বলেন, আগের মতো পান বিক্রি হয় না, দামও পাওয়া যায় না। পরিবার নিয়ে বিপাকে পড়তে হচ্ছে।

তারপরও জীবিকার তাগিদে ঐতিহ্য ধরে রাখতে পান চাষ চালিয়ে যাচ্ছেন তারা। সংসারের খরচ মেটাতে ঋণ করতে হচ্ছে। সরকার সহযোগিতা করলে তারা কিছুটা স্বস্তি পেতে পারেন।

পান চাষের সংকট ও চাষীদের সমস্যার বিষয়ে মৌলভীবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দিন বলেন, চাষীদের বিভিন্ন সমস্যায় কৃষি বিভাগ থেকে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। আরও কোনো সমস্যা থাকলে সেগুলোও দেখা হবে।

প্রতিনিধি/এফএ