Dhaka Mail Logo

সারাদেশ

দুই খালে বাঁশের সাঁকো থেকে লাল-সাদা কাঠের ব্রিজ, আনন্দিত হাতিয়াবাসী

জেলা প্রতিনিধি

০৮ নভেম্বর ২০২৬, ০২:১৩ এএম

স্বাধীনতার ৫৫ বছর অতিবাহিত হলেও নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার উল্লেখযোগ্য দুটি খালের উপর সাঁকো ছাড়া ভিন্ন কোনো পরিবর্তন আসেনি। এ সাঁকো দিয়েই দুই অঞ্চলের মানুষগুলো কয়েক যুগ ধরে এপার ওপার যাওয়া আসা করছিল। অবশেষে পরিবর্তনে নজর দিলেন ইউএনও রাসেল ইকবাল। উন্নয়ন সহায়তা তহবিল থেকে করে দিলেন কালারফুল (সাদা ও লাল) দুটি কাঠের ব্রিজ। এতে আনন্দিত দুই এলাকার মানুষ। আর দীর্ঘ যুগ অবহেলিত ও উপেক্ষিত থাকার দায় দিলেন জনপ্রতিনিধিদের ব্যর্থতাকে। কাঠের দুটি ব্রিজ যেন হাতিয়ার জনপ্রতিনিধিদের অক্ষমতার প্রতীক বলেও দাবি করেন অনেকে। 

উপজেলার তমরোদ্দি ইউনিয়নের ‘কাটাখালি’ ও চরকিং ইউনিয়নের ‘আজমা খাল’ স্থানীয় জনবসতির আদিকাল থেকেই প্রকৃতিগতভাবে সৃষ্ট বিশাল দুটি খাল। খরস্রোতা এ দুটি খালের উপর সাঁকো দিয়ে সেই আদিকাল থেকে দুই এলাকার একাংশের মানুষ যাতায়াত করতো। মুমূর্ষু রোগী কিংবা আহত কেউ চাইলে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যেতে পারতো না। বিনা চিকিৎসায় বাড়িতে মারা যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে অনেক।

Wooden_bridge_replaces_makeshift_footbridge_in_Hatiyaবর্তমানে ‘আজমা’ খাল পলি জমে অনেকটা ভরাট হয়ে গেছে, আর কাটাখালিতে পানিপ্রবাহ এখনো বহমান। যার সুবাদে বালু ও পাথর ব্যবসায়ীরা তাদের ব্যবসার ধারা চলমান রাখতে পেরেছে। ফলে খালটিতে যাতে কোনো ধরনের ব্রিজ নির্মাণ না হতে পারে- তারা সে প্রচেষ্টা চালিয়ে আসছে বলে স্থানীয়রা জানান। 

স্থানীয় ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে কথা বলে জানা গেছে, তমরোদ্দি কাটাখালি খালের উপর কাঠের ব্রিজ নির্মাণে স্থানীয় বালু-পাথর ব্যবসায়ী ও এর সুবিধা গ্রহীতাদের বাধার মুখে পড়েন ইউএনও রাসেল ইকবাল। কিন্তু এসব বাধা উপেক্ষা করে তিনি ব্রিজ নির্মাণের কাজ সম্পন্ন করে ফেলেন। এতে সফল হয়ে পার্শ্ববর্তী ইউনিয়ন চরকিং ‘আজমা খাল’র উপরও কাঠের ব্রিজ নির্মাণে হাত দেন তিনি। যা সম্পন্ন হয় গত ৫ নভেম্বর। আর এর ফলে বদলে যায় দুই ইউনিয়নের পশ্চিম সীমান্তের পাঁচ গ্রামের চিত্র। এতে প্রশংসা কুড়িয়ে নিলেন উপজেলা প্রশাসন।

কাটাখালি খাল: এ খালটি তমরোদ্দি বাজারের দক্ষিণে কোস্ট গার্ড স্টেশন সংলগ্ন। এর দক্ষিণে অর্থাৎ তমরদ্দি ইউনিয়নের দক্ষিণে কোরালিয়া, পশ্চিম জোড়খালী ও মাইজচরা গ্রামের অবস্থান। প্রায় ১৫ হাজার পরিবারের বসবাস এই তিন গ্রামে। বাসিন্দাদের তমরদ্দি বাজারসহ বিভিন্ন জায়গায় যেতে কাটাখালী খাল পার হয়ে যেতে হয়। প্রায় দুইশত ফুট দৈর্ঘ্য এই সাঁকো পার হতে গিয়ে অনেক দুর্ঘটনায় পড়তে হয়েছে বলে জানান স্থানীয়রা।

Wooden_bridge_replaces_makeshift_footbridge_in_Hatiya_2কোরালিয়া গ্রামের খালের পাড়ে দোকান করেন নুরউদ্দিন শেরআলী (৬০) আলাপকালে শের আলী জানান, তার দোকানের মালামাল আনতে হয় তমরদ্দি বাজার থেকে। ভ্যান গাড়ি চালক মাল নিয়ে এসে খালের ওপারে রেখে মাথায় বহন করে সাঁকো পার হয়ে দোকানে পৌঁছে দেন। গত বছর এভাবে মাল আনতে গিয়ে চিনির বস্তাসহ সাঁকো ভেঙে খালে পড়ে যান নুর ইসলাম নামে এই ভ্যান চালক। তাতে তার এক হাত এক পা ভেঙে যায়।

ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গায় চিকিৎসা করেও সুস্থ হননি। এখন পঙ্গু হয়ে ঘরে বসবাস করছেন। ২০২৫ সালের শেষের দিকে তমরোদ্দি হাইস্কুলে পড়ুয়া এক ছাত্রী খালে পড়ে ভেসে যাওয়ার ঘটনাও ঘটছে বলে জানান তিনি। 

Wooden_bridge_replaces_makeshift_footbridge_in_Hatiya_1অথচ বালু-পাথর ব্যবসায়ীদের বাধার কারণে যুগের পর যুগ খালটিতে কোনো প্রকারের ব্রিজ নির্মাণ হয়নি বলে জানান স্থানীয় নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি।

চরকিং ইউনিয়নের আজমা খাল: খালের উত্তরে চর বগুলা ও দক্ষিণে পশ্চিম ক্ষিরোদিয়া এলাকা। এই দুই এলাকার বহু মানুষের বসবাস। কিন্তু এ খালের উপর সাঁকো দিয়ে যুগ যুগ ধরে যাওয়া আসা করে আসছে।
স্থানীয়রা জানান, এ সাঁকো পার হতে দুর্ঘটনার শিকারও হয়েছেন অনেকে।

স্থানীয় আব্দুর রহিম দুলাল বলেন, ‘স্বাধীনতার এতো বছর পর এই কাঠের ব্রীজগুলো যেন হাতিয়ার জনপ্রতিনিধিদের অক্ষমতার প্রতীক হয়ে রইলো। তাদের যদি সদিচ্ছা থাকতো তবে কোনো এলাকা অন্ধকারে থাকতো না।’

Wooden_bridge_replaces_makeshift_footbridge_in_Hatiya_4এসব বাসিন্দারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার এ মহতী উদ্যোগের সাধুবাদ জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ নানাভাবে প্রশংসা করতে থাকেন।

ব্রিজ দুটি নির্মাণ ব্যয় সম্পর্কে উপজেলা প্রশাসন জানায়, তমরদ্দি ১৬০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৫ ফুট প্রস্থের কাঠের ব্রিজটিতে ব্যয় হয়েছে ছয় লাখ ৭৬ হাজার টাকা (ভ্যাট ও আয়কর ব্যতিত)। এবং চরকিং ‘আজমা খাল’ এ ২০০ ফুট দৈর্ঘ্য এবং ৫ ফুট প্রস্থের কাঠের ব্রিজ নির্মাণে ব্যয় হয়েছে- প্রায় সাত লাখ টাকা(ভ্যাট ও আয়কর ব্যতিত)। যা ইউনিয়ন পরিষদ উন্নয়ন সহায়তা তহবিল থেকে বহন করা হয়েছে। 

Wooden_bridge_replaces_makeshift_footbridge_in_Hatiya_3এ উদ্যোগের সফলতার বিষয়ে হাতিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাসেল ইকবাল বলেন, ‘শুধু যোগাযোগের অব্যবস্থাপনার কারণে মানুষের স্বাভাবিক চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। দায়িত্বশীলরা চাইলে মানুষের ছোট-ছোট চাহিদাগুলো সহজে পূরণ করতে পারেন। এই দুটি সাঁকোকে ব্রিজে রূপান্তর করে এখানকার মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে চেষ্টা করা হয়েছে মাত্র। আর এখানে ইট পাথরের সেতু তৈরি করার জন্য সংশ্লিষ্ট দফতরকেও অবহিত করা হয়েছে।’

প্রতিনিধি/এএম