Dhaka Mail Logo

সারাদেশ

বন্য প্রাণীদের নিরাপদ আশ্রয় গড়ছে ‘চা বাগান’

জেলা প্রতিনিধি

০৬ নভেম্বর ২০২৬, ০৯:২৫ পিএম

একদিকে চা-বাগানের সবুজ পাহাড়, অন্যদিকে নির্জন বনভূমি আর তার পাশে বড়তল লেক। প্রকৃতির এমন শান্ত পরিবেশে অবাধে বিচরণ করছে মেছোবাঘ, বনবিড়াল, অজগরসহ নানা প্রজাতির বন্য প্রাণী। কিন্তু দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে তাদের নিরাপদ আবাসস্থল। মানুষের দখল, বন উজাড় ও পরিবেশের নানা বিরূপ প্রভাবে যখন বন্য প্রাণীদের অস্তিত্ব হুমকির মুখে, তখন তাদের জন্য নিরাপদ আশ্রয় গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে একটি চা বাগান কর্তৃপক্ষ।

মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার উত্তরভাগ চা বাগানের প্রায় ৫০ একর নির্জন বনভূমিতে পরীক্ষামূলকভাবে শুরু হয়েছে বন্য প্রাণীর অভয়ারণ্য তৈরির কাজ। পলিমার এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের মালিকানাধীন উত্তরভাগ ও ইন্দানগর চা বাগানের বড়তল লেকসংলগ্ন বনভূমিতে নেওয়া হয়েছে এ উদ্যোগ। বন্য প্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রকৃতির স্বাভাবিক ভারসাম্য রক্ষাই এর লক্ষ্য।

বাগান কর্তৃপক্ষের আশা, বনভূমিটি নিরাপদ থাকলে এখানে বন্য প্রাণীদের বিচরণ ও প্রজননের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হবে। বাড়বে জীববৈচিত্র্য। প্রকৃতির এই ছোট্ট আশ্রয়স্থল একসময় হয়ে উঠতে পারে নানা প্রজাতির প্রাণীর নিরাপদ ঠিকানা।

ইতিমধ্যে বড়তল লেকসংলগ্ন বনভূমিতে বন্যপ্রাণীর আনাগোনা বেড়েছে। বিশেষ করে মেছোবাঘ, বনবিড়াল, অজগর ও বিলুপ্তপ্রায় গুইসাপের উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে। সম্প্রতি ক্রিয়েটিভ কনজারভেশন অ্যালায়েন্সের সহযোগিতায় এবং জেলা বন বিভাগের অনুমতিক্রমে একটি আহত মেছোবাঘ উদ্ধার করা হয়। চিকিৎসা শেষে সেটির শরীরে স্যাটেলাইট বেল্ট পরিয়ে পরীক্ষামূলকভাবে আবার বনে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রাণীটির চলাচল ও বিচরণক্ষেত্র পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

শুক্রবার (৬ নভেম্বর) দুপুরে বড়তল এলাকায় কথা হয় চা শ্রমিক রামাকান্তের সঙ্গে। দীর্ঘদিন ধরে এই বনে বন্য প্রাণীর বিচরণ দেখছেন তিনি। বলেন, ‘অনেক দিন ধরেই এই বনে মেছোবাঘ, বনবিড়াল, অজগর ও গুইসাপের আনাগোনা বেড়েছে। বাগান কর্তৃপক্ষ বন্য প্রাণী সংরক্ষণের যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা খুবই ভালো। বনটি নিরাপদ থাকলে প্রাণীগুলোও বাঁচবে।’

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বড়তল লেক থাকায় এই এলাকায় মেছোবাঘের বিচরণ বেশি। মাছ এ প্রাণীর অন্যতম প্রিয় খাবার। বনভূমি ও জলাশয়ে প্রাকৃতিক খাদ্যের জোগান বাড়লে বন্য প্রাণীর আনাগোনাও বাড়বে বলে মনে করেন তারা।

ক্রিয়েটিভ কনজারভেশন অ্যালায়েন্সের ম্যানেজার শিমুল নাথ বলেন, বন্য প্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে সবার আগে প্রয়োজন গণসচেতনতা। প্রাণীদের নিরাপদ আবাসস্থল নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রকৃতির প্রতি মানুষের দায়িত্বশীল আচরণ গড়ে তুলতে হবে। বন্যপ্রাণী প্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাদের রক্ষা করা মানে প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করা।

উত্তরভাগ ও ইন্দানগর চা বাগানের সিনিয়র ম্যানেজার লোকমান চৌধুরী বলেন, নির্বিচারে বন উজাড়, অবৈধ শিকার, বন্য প্রাণী পাচার, জলাভূমি ভরাট ও পরিবেশদূষণের কারণে অনেক প্রাণী তাদের স্বাভাবিক আবাসস্থল হারাচ্ছে। এতে প্রকৃতির খাদ্যশৃঙ্খল ও পরিবেশের ভারসাম্য বিঘ্নিত হচ্ছে। বাগানের মালিকপক্ষ প্রকৃতি সংরক্ষণের বিষয়ে আন্তরিক। সেই ভাবনা থেকেই বন্য প্রাণীদের জন্য নিরাপদ আশ্রয় গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের সহকারী বন সংরক্ষণ কর্মকর্তা মির্জা মেহদী সরওয়ার বলেন, বন বিভাগের অনুমতি নিয়ে ক্রিয়েটিভ কনজারভেশন অ্যালায়েন্সের সহযোগিতায় চা বাগান কর্তৃপক্ষ পরীক্ষামূলকভাবে এ কার্যক্রম শুরু করেছে। তার জানা মতে, বাংলাদেশে কোনো চা বাগানের পক্ষ থেকে এ ধরনের উদ্যোগ এটিই প্রথম। উদ্যোগটি বাস্তবায়নে বন বিভাগের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হবে।

প্রতিনিধি/এসআই