Dhaka Mail Logo

সারাদেশ

হাতির গতিবিধি জানাচ্ছে এআই ক্যামেরা, সংঘাত এড়ানোর উদ্যোগ

জেলা প্রতিনিধি

০৬ নভেম্বর ২০২৬, ০৮:৩৯ পিএম

শেরপুরের সীমান্তবর্তী পাহাড়ি এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে বন্যহাতি ও মানুষের সংঘাত চলছে। খাদ্যের সন্ধানে প্রায়ই পাহাড় থেকে লোকালয়ে নেমে আসে হাতির দল। এতে ফসলের ক্ষতির পাশাপাশি ঘটছে মানুষ ও হাতির প্রাণহানি। এমন পরিস্থিতি মোকাবিলায় নালিতাবাড়ী উপজেলার হাতির চলাচলের ১৫টি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পরীক্ষামূলকভাবে স্থাপন করা হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির ক্যামেরা। হাতির উপস্থিতি শনাক্ত হওয়ার এক মিনিটের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মুঠোফোনে পৌঁছে যাচ্ছে সতর্কবার্তা। এতে আগেভাগে সতর্ক হওয়ার পাশাপাশি সংঘাত এড়াতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

শেরপুরের সীমান্তবর্তী তিন উপজেলা শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ীর পাহাড়ি অঞ্চল বন্যহাতির অন্যতম বিচরণক্ষেত্র। খাবারের সন্ধানে হাতির দল প্রায়ই পাহাড়ের বিভিন্ন টিলায় ঘুরে বেড়ায়। কখনো খাবারের অভাবে লোকালয়ের বসতবাড়ি ও কৃষিজমিতে হানা দেয় তারা। এতে বিপাকে পড়েন স্থানীয় বাসিন্দারা। ফসল রক্ষায় অনেকে হাতি তাড়াতে এগিয়ে আসেন। এ সময়ই মানুষ ও হাতির মধ্যে সংঘাতের ঘটনা ঘটে। হাতির আক্রমণে মানুষের প্রাণহানি ও আহত হওয়ার ঘটনা যেমন ঘটছে, তেমনি মানুষের বাধার মুখে প্রাণ হারাচ্ছে বন্যহাতিও।

গত ১৩ বছরের চিত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, শেরপুরের সীমান্তবর্তী পাহাড়ি এলাকায় বন্যহাতি ও মানুষের সংঘাতে দুই পক্ষের প্রাণহানির সংখ্যা প্রায় সমান। বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এ সময়ে ৩৩টি হাতি মারা গেছে। অন্যদিকে প্রাণ হারিয়েছেন ৩৪ জন মানুষ। দীর্ঘদিনের এই সংঘাত মানুষ ও বন্যপ্রাণী—উভয়ের জন্যই হুমকি হয়ে উঠেছে। লোকালয়ে হাতির অনুপ্রবেশ ঠেকাতে তাৎক্ষণিক নানা পদক্ষেপ নেওয়া হলেও সেগুলোতে স্থায়ী সমাধান মিলছে না। ফলে দুই পক্ষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি কার্যকর উদ্যোগের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে মানুষ ও বন্যহাতির সংঘাত কমাতে নালিতাবাড়ী উপজেলার হাতির বিচরণক্ষেত্রে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি শুরু হয়েছে। এর আওতায় সমচূড়া, মধুটিলা, বুরুঙ্গা, ডালুকোণা এবং দাওধারা-কাটাবাড়ীসহ ১৫টি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পরীক্ষামূলকভাবে বসানো হয়েছে এআই ক্যামেরা। বাংলাদেশ অ্যানিম্যাল ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন, ক্রিয়েটিভ কনজারভেশন অ্যালায়েন্স ও মোবাইল অপারেটর গ্রামীণফোনের কারিগরি ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তায় এই কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

ক্যামেরায় হাতির উপস্থিতি শনাক্ত হলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে টেলিগ্রাম অ্যাপের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে সতর্কবার্তা চলে যায়। সর্বোচ্চ এক মিনিটের মধ্যে মুঠোফোনে পৌঁছে যায় এই সংকেত। ফলে হাতির অবস্থান সম্পর্কে আগাম তথ্য পেয়ে বন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিমের সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে পারেন। একই সঙ্গে হাতির সম্ভাব্য গতিপথ সম্পর্কে স্থানীয় বাসিন্দাদের সতর্ক করাও সম্ভব হচ্ছে। এতে হাতি লোকালয়ে প্রবেশের আগেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, ক্যামেরা স্থাপনের পর হাতির গতিবিধি সম্পর্কে আগেভাগে সতর্ক হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। আগে হাতি লোকালয়ে চলে আসার পরই অনেক সময় বিষয়টি জানা যেত। ফলে প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ থাকত না। এখন আগাম সংকেত পাওয়ায় সতর্ক হওয়া যাচ্ছে। তবে দুর্গম ও বিস্তৃত পাহাড়ি এলাকায় ক্যামেরার সংখ্যা আরও বাড়ানো গেলে এর সুফল বেশি পাওয়া যাবে বলে মনে করেন তাঁরা।

সমচূড়া এলাকার বাসিন্দা ও এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিমের সভাপতি আরফান আলী বলেন, আগে হাতির আগমনের খবর সময়মতো পাওয়া যেত না। অনেক সময় হঠাৎ সামনে হাতি চলে আসায় মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়তেন। এখন ক্যামেরার সংকেত পাওয়ায় আগেই সতর্ক হওয়া যাচ্ছে। খবর পেয়ে বন বিভাগের লোকজনও দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছাচ্ছেন। পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দাদের সচেতন করার কাজও করা সম্ভব হচ্ছে। এই উদ্যোগ চালুর পর এলাকায় হাতির আক্রমণের ঘটনা আগের তুলনায় অনেকটাই কমেছে বলে দাবি করেন তিনি।

দাওধারা-কাটাবাড়ী এলাকার বাসিন্দা রহমত আলী বলেন, ছোটবেলা থেকেই মানুষ ও বন্যহাতির সংঘাত দেখে আসছেন তিনি। বছরের পর বছর ধরে চলা এই পরিস্থিতির অবসান চান স্থানীয় বাসিন্দারা। হাতি মেরে কিংবা মানুষের জীবন বিপন্ন করে কোনো সমস্যার সমাধান হতে পারে না। বন্যপ্রাণী রক্ষার পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হবে। ক্যামেরা স্থাপনের ফলে হাতির আগমনের খবর আগে থেকে পাওয়ায় কিছুটা স্বস্তি এসেছে। তবে হাতির বিচরণ বেশি এমন অন্যান্য স্থানেও এ ধরনের প্রযুক্তি স্থাপন করা প্রয়োজন।

মধুটিলা রেঞ্জের সমচূড়া বিট কর্মকর্তা কাওসার হোসেন জানান, পরীক্ষামূলকভাবে স্থাপন করা এআই ক্যামেরাগুলো হাতির উপস্থিতি শনাক্ত করে দ্রুত তথ্য পাঠাচ্ছে। ফলে হাতির অবস্থান জানার পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সময় নষ্ট না করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে পারছেন। এতে মানুষ ও হাতির সরাসরি মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কা কমছে। হাতির নিয়মিত চলাচলের পথ ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতেও এ ধরনের ক্যামেরা স্থাপন করা গেলে নিরাপত্তাব্যবস্থায় আরও সুফল পাওয়া যাবে বলে মনে করেন তিনি।

ময়মনসিংহ বন বিভাগের মধুটিলা রেঞ্জ কর্মকর্তা আব্দুল করিম বলেন, হাতির চলাচলের এলাকায় এআই ক্যামেরা বসানোর পর বন বিভাগ আগের তুলনায় দ্রুত তাদের উপস্থিতির খবর পাচ্ছে। এতে পরিস্থিতি মোকাবিলায় সময়মতো লোকবল পাঠানো সম্ভব হচ্ছে। ক্যামেরার মাধ্যমে হাতির অবস্থান ও সংখ্যা সম্পর্কে বনকর্মীদের পাশাপাশি এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিমের সদস্যরাও তথ্য জানতে পারছেন। এই সুবিধা বিবেচনায় হাতির নিয়মিত চলাচলের অন্যান্য পথেও ক্যামেরা স্থাপনের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

বন্যহাতির সঙ্গে সংঘাত নিয়ন্ত্রণে ক্যামেরা স্থাপনের পাশাপাশি আরও কিছু উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান আব্দুল করিম। তিনি বলেন, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে নালিতাবাড়ীর হাতিপ্রবণ এলাকায় পাঁচ কিলোমিটারজুড়ে কাঁটাযুক্ত উদ্ভিদের বেষ্টনী বা বায়ো ফেন্সিং তৈরির কাজ চলছে। পাশাপাশি হাতির খাবারের জোগান বাড়াতে পাঁচ হেক্টর জমিতে বাঁশবাগান গড়ে তোলার কার্যক্রমও চলমান রয়েছে।

ক্রিয়েটিভ কনজারভেশন অ্যালায়েন্সের কমিউনিটি গভর্নেন্স স্পেশালিস্ট আবরার আহমাদ বলেন, হাতির গতিবিধি পর্যবেক্ষণের জন্য ১৫টি ক্যামেরা স্থাপনের কাজ শেষ হয়েছে। ক্যামেরায় হাতির উপস্থিতি ধরা পড়ার পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে মুঠোফোনে সতর্কবার্তা চলে যাচ্ছে। এই ব্যবস্থায় বন বিভাগের পাশাপাশি স্থানীয় এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিমকেও যুক্ত করা হয়েছে। ফলে আগাম সংকেত পাওয়ার পর সদস্যরা সমন্বিতভাবে কাজ করতে পারছেন। এতে হাতিকে আঘাত না করে নিরাপদে পাহাড়ের দিকে সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

তবে পরিবেশবিদদের মতে, এআই ক্যামেরা হাতির উপস্থিতি সম্পর্কে আগাম সতর্কতা দিতে পারলেও সংঘাতের মূল কারণ দূর করতে পারবে না। মানুষ ও বন্যহাতির সহাবস্থান নিশ্চিত করতে হাতির প্রাকৃতিক আবাসস্থল, খাদ্যের উৎস এবং নির্বিঘ্নে চলাচলের পথ সংরক্ষণসহ সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

ভূগোল ও পরিবেশ বিষয়ের প্রভাষক হাবিবুল হক পলাশ বলেন, মানুষ ও বন্যহাতির সংঘাত কমাতে হলে পাহাড়ের ভেতরেই হাতির বেঁচে থাকার উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য হাতির স্বাভাবিক আবাসস্থল অক্ষত রাখার পাশাপাশি পর্যাপ্ত পানির উৎস তৈরি এবং তাদের পছন্দের খাদ্যবৃক্ষ রোপণ করা জরুরি। পাহাড়ে খাবার ও পানির সহজলভ্যতা বাড়লে খাদ্যের সন্ধানে লোকালয়ে হাতির প্রবেশ কমতে পারে। একই সঙ্গে এসব উদ্যোগ এআই ক্যামেরাভিত্তিক পরীক্ষামূলক প্রকল্পের কার্যকারিতা বাড়াতেও সহায়ক হবে বলে মনে করেন তিনি।

শেরপুর-২ (নকলা-নালিতাবাড়ী) আসনের সংসদ সদস্য প্রকৌশলী মোহাম্মদ ফাহিম চৌধুরী বলেন, উদ্যোগটি এখনো পরীক্ষামূলক পর্যায়ে থাকলেও এর মাধ্যমে স্থানীয় বাসিন্দারা ইতিমধ্যে ইতিবাচক পরিবর্তন পাচ্ছেন। ভবিষ্যতে হাতির চলাচলের আরও এলাকায় এআই ক্যামেরার আওতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। তবে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির পাশাপাশি পাহাড়ে হাতির খাবার ও পানির সংকট দূর করতেও পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

মোহাম্মদ ফাহিম চৌধুরী আরও জানান, হাতির বিচরণক্ষেত্রে কৃত্রিম জলাধার নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব জলাধারে গভীর সাবমার্সিবল পাম্প স্থাপন করা হবে। এতে প্রাকৃতিকভাবে পানি সংরক্ষণের পাশাপাশি শুষ্ক মৌসুমেও পানির সরবরাহ বজায় রাখা সম্ভব হবে। পাম্পগুলো নিরাপদ দূরত্ব থেকে পরিচালনার ব্যবস্থা থাকবে। এর মাধ্যমে বনের ভেতরেই হাতির পানির চাহিদা পূরণ করা যাবে। ফলে পানির সন্ধানে লোকালয়ে হাতির চলে আসার প্রবণতা কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।

প্রতিনিধি/এআর