জেলা প্রতিনিধি
০৫ নভেম্বর ২০২৬, ০৪:২৮ পিএম
জনগণের চলাচলের রাস্তা বা সরকারি অবকাঠামো রক্ষা করা যার দায়িত্ব, তিনি নিজেই ব্যবসায়িক ফায়দা হাসিলের জন্য হাত দিয়েছেন খোদ রাষ্ট্রের সম্পত্তিতে। কুমিল্লার মনোহরগঞ্জের বাইশগাঁও বাজারে ব্যক্তিগত সুবিধার জন্য এলজিইডি’র একটি ব্রিজের গার্ডার ভেঙে ফেলার চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে বাইশগাঁও ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের নেতা আলমগীর হোসেনের বিরুদ্ধে।
এই ন্যক্কারজনক ঘটনায় পুরো মনোহরগঞ্জ উপজেলাজুড়ে সাধারণ মানুষ ও সচেতন মহলে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে। স্থানীয় এলাকাবাসী ও বাজার সূত্রে জানা যায়, বাইশগাঁও বাজারের ব্যস্ততম এলাকায় আস সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে হোটেল ও দোকানঘরের মালিক সাবেক চেয়ারম্যান স্থানীয় পঞ্চগ্রাম স্কুল অ্যান্ড কলেজের এমপিওভুক্ত শিক্ষক আলমগীর হোসেন।
অভিযোগ রয়েছে, ওই দোকানের সামনের ব্রিজের গার্ড ওয়াল/গার্ডারটি তার হোটেলের সামনের অংশ আরও প্রশস্ত করা কিংবা দৃশ্যমানতা বাড়ানোর অসৎ উদ্দেশ্যে স্থানীয় কতিপয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাকে ম্যানেজ করে ভেঙে ফেলা হয়েছে। এর ফলে বাজারের ওই অংশের অবকাঠামোগত মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে এবং ভবিষ্যতে বড় ধরনের যানজট বা দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
ঘটনার পরপরই বাজারের কয়েকজন সচেতন নাগরিক ক্ষুব্ধ হয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবিসহ এর প্রতিবাদ জানান এবং বিচার দাবি করেন। তবে অভিযোগ উঠেছে, অভিযুক্ত নেতার প্রভাব এবং অদৃশ্য শক্তির জোরে সেই প্রতিবাদী পোস্টগুলো জোরপূর্বক ডিলিট বা মুছে ফেলতে বাধ্য করা হয়।
সংবাদ প্রকাশ বা সত্য উচ্চারণ রোধে এমন হুমকিতে এলাকাবাসীর মাঝে ভীতি ও ক্ষোভ আরও বেড়ে গেছে। জনস্বার্থের এই প্রকাশ্য ক্ষতি ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটের ঘটনায় সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনেও প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) দুপুরে বাইশগাঁও ইউনিয়ন জামায়াতে ইসলামীর আমির গাজী সাইফুল ইসলাম তুহিন বলেন, গতকাল পতিত আওয়ামী লীগের সাবেক চেয়ারম্যান আলমগীর হোসেন আস সুন্নাহ ফাউন্ডেশন কর্তৃক পরিচালিত বিসমিল্লাহ হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্টটি ভালভাবে নজরে আনার জন্য গতকাল ভেঙে ফেলেছেন। পতিত আওয়ামী লীগের এই নেতার এমন ধৃষ্টতা দেখে এলাকার লোকজনের মাঝে ক্ষোভ বিরাজ করছে। তিনি তার ফেসবুক আইডির এক স্ট্যাটাসে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘জনস্বার্থের পরিপন্থি এমন বেআইনি কাজ ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটের ঘটনা অত্যন্ত ন্যক্কারজনক।’ তিনি অবিলম্বে এই ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের নিরপেক্ষ তদন্ত সাপেক্ষে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির দাবি জানান। একজন শিক্ষক— যিনি সমাজ গড়ার কারিগর এবং সাবেক একজন জনপ্রতিনিধি হয়ে কীভাবে নিজ স্বার্থে সরকারি সম্পত্তি ধ্বংসের মতো এমন হীন কাজের নেতৃত্ব দিতে পারেন, তা নিয়ে এখন নানা প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় ইউনিয়ন বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি মোহাম্মদ উল্লাহ বলেন, আসলে মানুষের ধৃষ্টতার একটা সীমা থাকা উচিত। সরকারি সম্পদ নষ্ট করে নিজের সুবিধা হাসিলের জন্য এমন কাজ করেছেন পতিত আওয়ামী লীগের সাবেক চেয়ারম্যান আলমগীর হোসেন। স্থানীয় লোকজন আমাদের বলেছেন, এলাকার বিএনপির লোকজন এ বিষয়টি নিয়ে কি পদক্ষেপ নিয়েছেন। এটা আসলে অত্যন্ত দুঃখজনক ব্যাপার। আমরা গতকাল বুধবার ইউএনও মহোদয়কে জানিয়েছি দেখি উনি কি পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।
এলজিইডি কুমিল্লার নির্বাহী প্রৌকশলী মো. মফিজ উদ্দিনকে একাধিকবার কল দিয়ে তার মন্তব্য জানতে চাইলে তিনি কল রিসিভ করেননি। হোয়াটসঅ্যাপে পরিচয় দিয়ে ক্ষুদে বার্তা পাঠালেও তিনি কল ধরেননি।
মনোহরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার রিফাত জাহান বলেন, অভিযুক্ত আলমগীর হোসেন ব্রিজের গার্ডারটি মেরামত করে দিবেন বলে আমরা তার থেকে মুচলেকা নিয়েছি এবং মনোহরগঞ্জ এলজিইডি অফিসকে জানিয়েছি তারা আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত সাবেক চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগ নেতা (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) আলমগীর হোসেনের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায় নাই। সরকারি সম্পত্তি এভাবে বিনষ্ট করার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে স্থানীয় প্রশাসন।
মনোহরগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী কামাল উদ্দিন এ বিষয়ে বলেন, সরকারি বা এলজিইডি’র সেতু কিংবা ব্রিজের গার্ডার ভাঙার বিন্দুমাত্র কোনো আইনি সুযোগ নেই। এটি সম্পূর্ণ বেআইনি ও রাষ্ট্রীয় সম্পদহানি।
তিনি আরও বলেন, বাইশগাঁও বাজারের ব্রিজের গার্ডার ভাঙার ঘটনায় আমরা অত্যন্ত মর্মাহত। ঘটনার পরপরই বিষয়টি আমি আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানিয়েছি এবং এলজিইডি সদর দফতরে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন পাঠিয়েছি। কে বা কারা এই গার্ডার ভেঙেছে, সেই বিষয়ে খোঁজখবর নিয়ে খুব দ্রুত তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। সরকারি সম্পত্তি রক্ষায় আমি ইউনিয়নবাসীকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানাচ্ছি।
প্রতিনিধি/এফএ