জেলা প্রতিনিধি
০৫ নভেম্বর ২০২৬, ০১:৪০ পিএম
পাহাড়ের দুর্গম পাড়ায় জন্ম। পরিবারে আর্থিক অনটন, বাবা দীর্ঘদিন ধরে প্যারালাইসিসে আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী। পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস জুমচাষ। এমন প্রতিকূলতার মধ্যেও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় অসাধারণ ফল করে মেধার স্বাক্ষর রেখেছে বান্দরবানের খুমী সম্প্রদায়ের তরুণ শিক্ষার্থী নেংএউং খুমী।
চলতি বছরের এইচএসসি পরীক্ষায় ১ হাজার ২০০ নম্বরের মধ্যে ১ হাজার ১২১ নম্বর পেয়ে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের মেধাতালিকায় দশম এবং সারা দেশে ৯০তম স্থান অর্জন করেছে সে।
নেংএউংয়ের স্বপ্ন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে ইংরেজি, আইন অথবা অর্থনীতি বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করা। পড়াশোনা শেষে দেশ ও সমাজের কল্যাণে কাজ করতে চায় সে। তবে মেধা ও স্বপ্নের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে পরিবারের আর্থিক সংকট।
নেংএউং খুমী এ বছর চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীনে বান্দরবানের লামা উপজেলায় অবস্থিত কোয়ান্টাম কসমো স্কুল অ্যান্ড কলেজের মানবিক বিভাগ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়। তার গ্রামের বাড়ি বান্দরবানের রোয়াংছড়ি উপজেলার তারাছা ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের অং তং খুমীপাড়ায়। তার বাবা কিংনাং খুমী একজন জুমচাষি। তিন ভাই ও এক বোনের মধ্যে নেংএউং সবার ছোট।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, প্রায় চার বছর ধরে প্যারালাইসিসে আক্রান্ত হয়ে বিছানায় পড়ে আছেন তার বাবা। শারীরিক অক্ষমতার কারণে তিনি স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারেন না। মা গৃহিণী। পরিবারের অন্য সদস্যরাও জুমচাষের সঙ্গে যুক্ত। একসময় পরিবারটি আর্থিকভাবে স্বচ্ছল থাকলেও বাবার অসুস্থতার পর থেকে তাদের আর্থিক অবস্থার অবনতি ঘটে। এমন পরিস্থিতিতে ছেলের উচ্চশিক্ষার ব্যয় বহন করা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তার বাবা-মা।
ছোটবেলা থেকেই নামিদামি কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ার সুযোগ হয়নি নেংএউংয়ের। নিজ গ্রামের ক্যচ্ছালংপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পঞ্চম শ্রেণি শেষ করে বান্দরবান সদরের গোয়ালিয়াখোলা উচ্চবিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করে সে। পরে ম্রো আবাসিক উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করে কোয়ান্টাম কসমো স্কুল অ্যান্ড কলেজে পড়ার সুযোগ পায়। নিজের অধ্যবসায়, চেষ্টা ও শিক্ষকদের সহযোগিতায় এবার এইচএসসিতে এমন সাফল্য অর্জন করেছে সে।
খুমী স্টুডেন্টস কাউন্সিলের সভাপতি ও নেংএউংয়ের মামা সই নাং খুমী বলেন, ছোটবেলা থেকেই নেংএউংয়ের পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ ছিল। সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও সে নিজের চেষ্টায় ভালো ফল করেছে। তার এই অর্জনে তারা গর্বিত। তিনি চান, নেংএউং উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে নিজের জনগোষ্ঠীসহ বৃহত্তর সমাজের কল্যাণে কাজ করুক।
নেংএউংয়ের বড় ভাই থং এউ খুমী বলেন, ছোট ভাইয়ের এমন ফলাফলে পরিবারের সবাই আনন্দিত। কিন্তু বাবার অসুস্থতার কারণে পরিবারের পক্ষে তার উচ্চশিক্ষার খরচ বহন করা কঠিন। কোয়ান্টাম কর্তৃপক্ষ কিংবা কোনো উদারমনা ব্যক্তি তার পড়াশোনার ব্যয়ভার বহনে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলে সে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন পূরণের সুযোগ পাবে।
খুমী সম্প্রদায়ের প্রথম উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তি ও উন্নয়নকর্মী লেলুং খুমী ঢাকা মেইলকে বলেন, নেংএউং প্রমাণ করেছে, দুর্গম এলাকায় জন্ম কিংবা সীমিত সুযোগ-সুবিধা মেধাবীদের এগিয়ে যাওয়ার পথে বাধা হতে পারে না। প্রয়োজন শুধু উপযুক্ত পরিবেশ ও সামান্য সহযোগিতা। বান্দরবান ও রাঙামাটি জেলায় খুমী সম্প্রদায়ের জনসংখ্যা প্রায় সাড়ে তিন হাজার। এই ছোট জনগোষ্ঠী থেকে নেংএউংয়ের এমন অর্জন অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক।
তিনি আরও বলেন, নেংএউংয়ের বাবা একসময় আর্থিকভাবে স্বচ্ছল ছিলেন। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী থাকায় পরিবারের উপার্জনের পথ সংকুচিত হয়েছে। উচ্চশিক্ষার জন্য কোয়ান্টাম কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে সহযোগিতার সুযোগ রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত নন তিনি। তবে ইতিমধ্যে দুজন ব্যক্তি নেংএউংয়ের পড়াশোনার দায়িত্ব নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন বলে জানান তিনি।

কোয়ান্টাম কসমো স্কুল অ্যান্ড কলেজের ডেপুটি ইনচার্জ ও কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের শিক্ষা কার্যক্রমের ইনচার্জ সাকিব হায়াৎ চৌধুরী (তানিম) ঢাকা মেইলকে বলেন, নেংএউং মানবিক বিভাগ থেকে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের মেধাতালিকায় দশম এবং সারা দেশে ৯০তম স্থান অর্জন করেছে। সে শুধু একটি পরিবারের নয়, দেশের সম্পদ। কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের সব নিয়মকানুন মেনে চললে ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকেই তার উচ্চশিক্ষার যাবতীয় ব্যয় বহন করা হবে।
তিনি আরও বলেন, নেংএউং বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি নিচ্ছে। কোয়ান্টামের নিয়ম অনুযায়ী তাকে এখনো মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে দেওয়া হয় না। তাই তার সঙ্গে সরাসরি কথা বলা সম্ভব হয়নি। তবে তার শিক্ষকের মাধ্যমে জানা গেছে, সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি, আইন অথবা অর্থনীতি বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে দেশ ও জাতির সেবা করতে চায়।
দুর্গম পাহাড়ের একটি ছোট পাড়া থেকে উঠে এসে বোর্ডের মেধাতালিকায় জায়গা করে নেওয়া নেংএউং খুমীর এই সাফল্য শুধু তার পরিবারের নয়, পুরো খুমী জনগোষ্ঠীর জন্যও গর্বের। এখন তার স্বপ্ন পূরণে প্রয়োজন উচ্চশিক্ষার সুযোগ ও ধারাবাহিক সহযোগিতা।
প্রতিনিধি/এসএস