জেলা প্রতিনিধি
০৩ নভেম্বর ২০২৬, ০৫:০৪ পিএম
নিজেদের এক টুকরো জমিও নেই। অন্যের জমিতে ভাঙা চালাঘরে মাথা গুঁজে থাকা। সংসারের অভাব মোচন ও লেখাপড়ার খরচ জোগাতে দিনমজুরি, হোটেল বয় ও টিউশনি করেছেন কৌশিক। কিন্তু এক মুহূর্তের জন্যও লক্ষ্যচ্যুত হননি। সব বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে এবারের এইচএসসির পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগে অর্জন করেছেন ঈর্ষনীয় সাফল্য। সব বিষয়ে এ প্লাসসহ জিপিএ-৫ পেয়েছেন তিনি।
চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন পূরণে প্রধান বাধা চরম দারিদ্র্য ও পরিবারের ওপর ঋণের বোঝা। দুটি এনজিও থেকে নেওয়া ঋণের কিস্তি সপ্তাহে ২ হাজার ৩০০ টাকা। সেটাই জোগানোই দায়। তাই সেরা ফলের আনন্দ ফিকে কৌশিকের পরিবারে।
বিশাল সরকার কৌশিক কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ থেকে চলতি বছর বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ-৫ পেয়েছেন। কাঁঠালবাড়ী বিদ্যাকানন থেকে পঞ্চম শ্রেণিতে সাধারণ গ্রেডে বৃত্তি পাওয়ার পর বুক ভরা স্বপ্ন নিয়ে ১০ কিলো মিটার দূরে কুড়িগ্রাম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সেখান থেকে এসএসসিতে সব বিষয়ে এ প্লাসসহ জিপিএ-৫ পেয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেন।
স্বপ্ন দানা বাঁধতে শুরু করে। ভর্তি হন কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজে। এবার ফলাফল বিপর্যয়ের মাঝেও অন্ধকার ঘরে চাঁদের আলোর মতো জ্বলজ্বল করছে তার নাম। তার এই ধারাবাহিক সাফল্যের পেছনে নিদারুণ কষ্ট আর সংগ্রামের কাহিনি।
কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার কাঁঠালবাড়ী বাজারের পাশে কৌশিকদের জীর্ণ কুটির। তার বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে, ছোটখাটো ভাঙাচোরা তিনটি চালাঘরে দরিদ্র্যতার ছাপ আর দুঃখের জীবন। পুরোনো টিনের চালে অসংখ্য ফুটো। বাঁশঝাড়ের এক কোণায় খোলা রান্নাঘর। কৌশিকের মা কণা রানী একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুলের আয়া। সামান্য সম্মানী পান। বাবা সুকুমার সরকার অসুস্থতা সত্ত্বেও পেটের দায়ে সপ্তাহে দুদিন হাটবারে খোলা জায়গায় টি-স্টল চালান। এই সামান্য আয়ে সংসারে নুন আনতে পান্তা ফুরানোর অবস্থা।
সংসারের বোঝাটা আরও বড় হয়েছে ঋণের দায় থাকায়। অভাব আর ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার খরচ জোগাতে গ্রামীণ ব্যাংক থেকে ৮০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছেন মা কনা রাণী। কিস্তি শোধ করার মতো আয় না হওয়ায় বেসরকারি সংস্থা আশা থেকে আরও ৩০ হাজার টাকা ঋণ নেন। সপ্তাহে ২ হাজার ৩০০ টাকার কিস্তির ভার সইতে না পেয়ে ধার করেন আরও ৫০ হাজার। এভাবেই ঋণের জালে জড়িয়ে সহায়-সম্বলহীন পরিবারটি ধুঁকছে। বড় ছেলে কর্ণ সরকার টিউশনি করিয়ে নিজের পড়ালেখার খরচ জোগান কোনো রকমে।
কৌশিকের সফলতার পেছনে সংগ্রাম আর বেদনার নানা টুকরো গল্প শোনায়। কৌশিক ঢাকা মেইলকে জানান, স্কুলে ভর্তির পরেই বন্ধুর দেওয়া পুরোনো প্যান্ট আর জুতা দিয়েই শুরু হয় তার স্কুলজীবন। নবম শ্রেণি পর্যন্ত কোনো প্রাইভেট টিউশনি পড়তে পারেননি অর্থাভাবে। পরে কয়েকজন শিক্ষক তাকে ফ্রিতে পড়িয়েছেন। একইভাবে এসএসসিতেও প্রবাসী এক ব্যক্তির সহায়তাসহ শিক্ষকদের আন্তরিকতায় তার স্বপ্ন পূরণের যাত্রা অব্যাহত থাকে।
কৌশিক আরো বলেন, অটো ভাড়ার অভাবে অনেক দিন স্কুল ও কলেজে যাওয়া হয়নি। সারাদিন অভুক্ত থেকেছেন। ক্ষুধার যে কি কষ্ট কেউ বুঝবে না। চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন পূরণে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন কৌশিক। কিন্তু খরচ দিতে পারছিলেন না তার বাবা। কয়েকজন শিক্ষক তাকে বিনা ফিতে টিউশনি পড়ান এবং করেন অন্যান্য সহায়তা। নিজেও হোটেল বয়ের কাজ করে পড়াশোনার খরচ জোগান।
কৌশিকের বাবা সুকুমার সরকার জানান, তার ৩ ছেলে-মেয়ে সবাই মেধাবী। তার একটি ছোট টি-স্টল ছিল সড়কের ধারে সরকারি খাস জায়গায়। ২০২০ সালে উচ্ছেদের সময় ঘরবাড়িসহ দোকানও উচ্ছেদ হয়। এক প্রতিবেশীর সুপারি বাগান ও বাঁশ ঝাড়ের পাশে মাথা গুঁজে আছেন। বড় ছেলে কর্ণ সরকার কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজে অনার্সে পড়েন। আর একমাত্র মেয়ে সূচনাকে এসএসসি পাস করার পর বিয়ে দিয়েছেন।
বড় ভাই কর্ণ জানান, চরম অভাব-অনটনের মাঝেও ছোটভাইয়ের সেরা ফলাফলে আনন্দের বদলে কান্না এসেছিল। তার স্বপ্ন কীভাবে পূরণ হবে, সেটাই এখন পরিবারের সবার দুশ্চিন্তার কারণ।
মা কণা রানী জানান, তাদের দুজনের সামান্য আয়ে সংসারের খরচ মেটে না, তার ওপর রয়েছে ঋণের বোঝা। এ অবস্থায় ছেলের স্বপ্ন পূরণে লেখাপড়ার খরচ জোগানোর কোনো উপায় দেখছেন না। তিনি সরকার ও হৃদয়বান ব্যক্তিদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান ছেলের স্বপ্ন পূরণে।
প্রতিনিধি/এলএ