জেলা প্রতিনিধি
০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১১:৩৪ এএম
অবিভক্ত বাংলার প্রথম মুখ্যমন্ত্রী শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের জন্মের ১৫৩ বছর পেরিয়ে গেছে। অথচ ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার সাতুরিয়ায় তার জন্মভবনে এখনো গড়ে ওঠেনি কোনো জাদুঘর। প্রায় ৩০০ বছরের পুরোনো ভবনটি প্রত্নসম্পদ হিসেবে সংরক্ষণের ঘোষণা দেওয়া হলেও সেখানে এখনো বসবাস করছেন তার মাতুলালয়ের স্বজনেরা। ভবনটি সংস্কার, সংরক্ষণ এবং সেখানে জাদুঘর নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, গবেষক ও স্থানীয় বিশিষ্টজনেরা।
১৮৭৩ সালের ২৬ অক্টোবর ব্রিটিশ ভারতের বাকেরগঞ্জ জেলার সাতুরিয়া গ্রামের মিয়া বাড়িতে মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন শেরেবাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হক। স্থানটি বর্তমানে ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার অন্তর্ভুক্ত।
উপমহাদেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা শেরেবাংলা কলকাতার প্রথম মুসলিম মেয়র, অবিভক্ত বাংলার প্রথম মুখ্যমন্ত্রী, পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি একসময় নিখিল ভারত মুসলিম লীগের সভাপতি ও ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।
এত গুরুত্বপূর্ণ একজন জাতীয় নেতার জন্মভবন সংরক্ষণে এখন পর্যন্ত প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের উদ্যোগ সীমিত রয়েছে। ২০১০ সালের মার্চে প্রায় ৩০০ বছরের পুরোনো ভবনটিকে প্রত্নসম্পদ হিসেবে গেজেটভুক্ত করা হয়। তবে ভবনটি এখনো অধিদফতরের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আসেনি। সেখানে বসবাস করছেন শেরেবাংলার মাতুলালয়ের স্বজনেরা।
ভবনটি সংরক্ষণ ও সংস্কারের বিষয়ে কথা বলেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের চারজন অধ্যাপক, গবেষক, ঝালকাঠির জেলা প্রশাসক এবং প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের খুলনা অঞ্চলের কর্মকর্তারা।

ভবনটি অধিগ্রহণ করে সংস্কার করা হচ্ছে না কেন—এমন প্রশ্নের জবাবে প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের খুলনা ও বরিশাল বিভাগের আঞ্চলিক পরিচালক মো. মহিদুল ইসলাম বলেন, শেরেবাংলার জন্মভিটার ভবনটি অধিদপ্তরের সংরক্ষিত পুরাকীর্তি। পাঁচ শতাংশ জমির ওপর অবস্থিত ভবনটি আগে একবার সংস্কার করা হয়েছিল। তবে সেখানে বসবাসকারীরা জমিটি নিজেদের বলে দাবি করছেন। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। জমির মালিকানা তাদের হলে সরকারের জমি অধিগ্রহণের নিয়ম ও প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে।
মহিদুল ইসলাম আরও বলেন, চলতি অর্থবছরে ভবনটি সংস্কার ও সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ জন্য দরপত্র প্রক্রিয়া চলছে। আশা করা হচ্ছে, আগামী ডিসেম্বর মাসে সংস্কার ও সংরক্ষণের কাজ শুরু হবে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. মাসউদ ইমরান মান্নু বলেন, প্রত্ননিদর্শন সংরক্ষণ আইন, ১৯৭৬-এর ১০ ও ১২ ধারা অনুযায়ী প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণের ঘোষণা এবং মালিকানা নির্ধারণের বিষয়টি বিবেচিত হয়। কোনো স্থাপনাকে প্রত্নসম্পদ হিসেবে ঘোষণা করা হলে সেটির সুরক্ষার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ওপর বর্তায়। সেখানে কোনো ধরনের পরিবর্তন বা সংস্কার করতে হলে অধিদফতরের অনুমতি প্রয়োজন।
অধ্যাপক মান্নু আরও বলেন, শেরেবাংলার জন্মভবন শুধু বাংলাদেশের নয়, বিশ্বের মানুষের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক সম্পদ। শেক্সপিয়ার বা কার্ল মার্ক্সের স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলোর মতো এ বাড়িটিও ঐতিহ্যের অংশ। শেরেবাংলার জন্ম ও শৈশবের স্মৃতি ঘিরে সেখানে একটি জাদুঘর নির্মাণ করা উচিত। এতে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষ ঐতিহাসিক স্থানটি দেখতে আসতে পারবেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে শেরেবাংলার গুরুত্ব কখনোই ফুরিয়ে যাওয়ার নয়।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ বলেন, ঝালকাঠির রাজাপুরে শেরেবাংলার জন্মভিটা ইতিহাসের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। এটি সংরক্ষণ করা জরুরি। প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতর সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে এসব স্থাপনা দেখভাল করলেও বাজেট ও জনবলসংকটের কারণে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায় না।
ইতিহাস গবেষক ও সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) ঝালকাঠি জেলা সম্পাদক ইসমাঈল মুসাফির বলেন, ভবনটিতে কে বা কারা বসবাস করছেন, সেটি বড় বিষয় নয়। প্রয়োজনে তাঁদের পুনর্বাসন করে হলেও শেরেবাংলার জন্মভবন রক্ষা করতে হবে। উপমহাদেশের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা একজন নেতার জন্মভবন সংরক্ষণে সরকারের পর্যাপ্ত বাজেট ও জনবল না থাকা দুঃখজনক। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলামের স্মৃতিবিজড়িত বিভিন্ন স্থান সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শেরেবাংলার জন্মভবনের ক্ষেত্রেও একই ধরনের উদ্যোগ প্রয়োজন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক সুফি মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ভবনসহ পুরো জায়গা সংরক্ষণ করতে হবে। শুধু সরকারি ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভর করলে হবে না। এ ধরনের ঐতিহাসিক স্থাপনা রক্ষায় স্থানীয় বাসিন্দাদেরও এগিয়ে আসতে হবে। তাদের সচেতন করা গেলে তারাই ঐতিহ্যগুলো আগলে রাখবেন।
একই বিভাগের অধ্যাপক সিকদার জুলকারনাইন বলেন, ভবনটির সঙ্গে ওই সময়ের রাজনীতি, সমাজ ও সাংস্কৃতিক জীবনের ইতিহাস জড়িয়ে আছে। শেরেবাংলার শৈশবের উল্লেখযোগ্য সময় কেটেছে তার মাতুলালয়ে। তাই ভবনটি সংরক্ষণের পাশাপাশি পাশের কিছু জমি অধিগ্রহণ করে সেখানে শেরেবাংলা স্মৃতি জাদুঘর নির্মাণ করা প্রয়োজন।
ঝালকাঠির জেলা প্রশাসক মো. মমিন উদ্দিন বলেন, শেরেবাংলা উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নেতা। তার জন্মভবনটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর অনেক দেরিতে সংরক্ষণের আওতায় এনেছে। তবে এখনো তেমন কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি। রাজাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) দুই দিনের মধ্যে সরেজমিন প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছিল। সেই প্রতিবেদন পাওয়া গেছে। আগামী সপ্তাহের মধ্যে জমি অধিগ্রহণসহ একটি পূর্ণাঙ্গ জাদুঘর নির্মাণের প্রস্তাব সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। ভবনটি ঢাকা-বরিশাল-খুলনা মহাসড়কের পাশে হওয়ায় এর পর্যটন সম্ভাবনাও রয়েছে।
১৯৬২ সালের ২৭ এপ্রিল মৃত্যুবরণ করেন শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক। তাকে ঢাকার তিন নেতার মাজারে সমাহিত করা হয়। সেখানে তার সঙ্গে শায়িত আছেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও খাজা নাজিমুদ্দিন।
প্রতিনিধি/এসএস