Dhaka Mail Logo

সারাদেশ

খুলে দিলেও কেন সেন্টমার্টিন যেতে পারছেন না পর্যটকরা?

০২ নভেম্বর ২০২৬, ০৩:৪৩ পিএম

সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রোববার (১ নভেম্বর) খুলে দেওয়া হয়েছে সেন্টমার্টিন। প্রস্তুত সেখানকার ১৫০টি হোটেল এবং রিসোর্ট। তারপরও প্রবাল দ্বীপটিতে যেতে পারছেন না পর্যটকরা। বাধা কোথায়?

জানা গেছে, সেন্টমার্টিন খুললেও দ্বীপে যাওয়ার জন্য এখনো প্রস্তুত নয় কোনো জাহাজ। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও অনুমোদন প্রক্রিয়া শেষ না হওয়ায় কোনো জাহাজকে চলাচলের অনুমতি দেয়নি কক্সবাজার জেলা প্রশাসন। ফলে নির্ধারিত দিনে পর্যটন মৌসুম শুরু হলেও সেন্টমার্টিনের উদ্দেশে ছেড়ে যাচ্ছে না কোনো জাহাজ।

এদিকে দ্বীপটিতে পর্যটকদের ভ্রমণ ও রাত্রিযাপনের বিষয়ে নতুন সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সংশোধিত নির্দেশনা অনুযায়ী, ১ নভেম্বর থেকে ১৫ মার্চ পর্যন্ত সাড়ে চার মাস পর্যটকরা দ্বীপে যাতায়াতের পাশাপাশি রাত্রিযাপনও করতে পারবেন। 

তবে ভ্রমণের অনুমতি থাকলেও প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ছাড়পত্র না পাওয়ায় নির্ধারিত সময়ে শুরু হচ্ছে না জাহাজ চলাচল। ফলে ভ্রমণের অপেক্ষায় থাকা পর্যটকদের মধ্যে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।

S

জানা গেছে, সেন্টমার্টিনে প্রায় ১৫০টি হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজের প্রতিটিতে গড়ে ৫ থেকে ২০ জন পর্যন্ত কর্মী (ম্যানেজার, রিসেপশনিস্ট, বয়, বাবুর্চি ও পরিচ্ছন্নতা কর্মী) কাজ করেন। সেই হিসাবে শুধু হোটেলগুলোতেই ১,৫০০ থেকে ২,৫০০ জন স্থায়ী ও অস্থায়ী কর্মচারী নিয়োজিত থাকেন। 

সেন্টমার্টিনের স্থায়ী বাসিন্দা প্রায় ১২ হাজার। স্থানীয় জনসাধারণের একটি বিশাল অংশ এই হোটেল-রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ, ক্ষুদ্র ব্যবসা, ভ্যান চালানো এবং ট্যুরিস্ট বোট বা নৌপরিবহনের সঙ্গে যুক্ত।

দ্বীপের ব্যবসায়ীরা জানান, ১ নভেম্বর পর্যটক নিয়ে জাহাজ আসবে সেই প্রত্যাশায় প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিলাম আমরা। কিন্তু পর্যটকবাহী কোনো জাহাজ চলাচল না করায় চরম হতাশ হয়েছেন তারা।

একটি রিসোর্টের মালিক আবদুল হাকিম জানান, ‘সব প্রস্তুতি নিয়েও জাহাজ চলাচল না করায় আমরা হতাশ হয়েছি। দীর্ঘদিন অপেক্ষার পর আর এক সপ্তাহ অপেক্ষা আমাদের জন্য নিশ্চয়ই সুফল বয়ে আনবে। আমার মতো দ্বীপের প্রায় ১০০ হোটেল-রিসোর্ট প্রস্তুত রয়েছে।

S

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, জাহাজ চলাচলের অনুমতি পেতে প্রয়োজনীয় নথিপত্র জমা ও বিভিন্ন সংস্থার ছাড়পত্র নেওয়ার প্রক্রিয়া এখনো শেষ হয়নি। পাশাপাশি পর্যটকদের নিবন্ধনের জন্য বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের নির্ধারিত ব্যবস্থাও পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করে আগামী বৃহস্পতিবার কিংবা শুক্রবার থেকে জাহাজ চলাচল শুরুর সম্ভাবনা রয়েছে।

কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের পর্যটন সেলের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মাহমুদুর রহমান সায়েম বলেন, ‘পর্যাপ্ত কাগজপত্র জমা দিতে না পারায় এখনো পর্যন্ত কোনো জাহাজকে সেন্টমার্টিনে চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়নি। ট্যুরিজম বোর্ডের কিছু কার্যক্রমও পুরোপুরি প্রস্তুত হয়নি।’ 

তিনি আরও জানান, আগামী বুধবার জেলা প্রশাসক সেন্টমার্টিন দ্বীপে গিয়ে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। এরপর জাহাজ চলাচলের বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসতে পারে।

তবে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের উপপরিচালক (প্রশাসন ও সমন্বয়) নিজাম উদ্দিনের দাবি, দ্বীপে পর্যটক যাতায়াতের ক্ষেত্রে বোর্ডের দায়িত্ব মূলত ট্রাভেল পাস দেওয়া। এ কার্যক্রমের প্রস্তুতি পুরোপুরি সম্পন্ন হয়েছে।

দীর্ঘ এক বছর পর পর্যটকদের যাতায়াত ও রাত্রিযাপনের সুযোগ তৈরি হওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে। একসময় দ্বীপের অধিকাংশ মানুষের প্রধান পেশা ছিল মাছ ধরা ও কৃষিকাজ। তবে গত দুই দশকে পর্যটকদের আনাগোনা বাড়তে থাকায় অনেকেই বাপ-দাদার পেশা ছেড়ে পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসা ও সেবামূলক কাজে যুক্ত হয়েছেন।

তবে পর্যটক চলাচলে বিধিনিষেধের কারণে গত এক বছরে হোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ, পরিবহন ও অন্যান্য পর্যটননির্ভর ব্যবসায় স্থবিরতা তৈরি হয়। নতুন সিদ্ধান্তের ফলে এসব ব্যবসা আবারও সচল হওয়ার আশা করছেন দ্বীপবাসী।

S

সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফয়জুল ইসলাম বলেন, ‘পর্যটকদের আগমনকে সামনে রেখে দ্বীপের সব পেশার মানুষ কর্মব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। সবাই নিজেদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সংস্কার ও প্রস্তুতির কাজে ব্যস্ত রয়েছেন।’

জাহাজ চলাচলের অনুমোদন প্রক্রিয়া সম্পর্কে সেন্টমার্টিনগামী জাহাজ মালিকদের সংগঠন সি ক্রুজ অপারেটর ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক হোসাইন ইসলাম বাহাদুর বলেন, ‘জাহাজ চালাতে পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের ছাড়পত্র, নৌপরিবহন অধিদফতরের অনুমোদন, বিআইডব্লিউটিএ’র রুট পারমিট এবং কক্সবাজার জেলা প্রশাসকের অনুমতি প্রয়োজন।’

তিনি জানান, ‘এসব প্রক্রিয়া এখনো শেষ হয়নি। অন্যদিকে পর্যটকদের তথ্য সংগ্রহের জন্য ট্যুরিজম বোর্ডের যে সফটওয়্যার চালুর কথা, সেটিও প্রস্তুত হয়নি। এ কারণে আপাতত জাহাজ চালানো সম্ভব হচ্ছে না। তবে বৃহস্পতি বা শুক্রবার থেকে চলাচল শুরুর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।’

বিআইডব্লিউটিএ চট্টগ্রাম বিভাগ ও কক্সবাজার নদীবন্দরের উপপরিচালক নয়ন শীল বলেন, ‘সেন্টমার্টিনে যাতায়াতের জন্য বিআইডব্লিউটিএ থেকে রুট পারমিট নিতে হয়। এখন পর্যন্ত কোনো জাহাজ মালিক চলাচলের অনুমতি চেয়ে আবেদন করেননি। আবেদন পাওয়ার পর জাহাজ পরিদর্শন করে অনুমোদন দেওয়া হবে।’

S

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আব্দুল মান্নান বলেন, ‘সেন্টমার্টিন পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত হলেও জাহাজের ফিটনেস ও নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে চলাচলের অনুমতি দেওয়া হবে না। জাহাজ মালিকদের সঙ্গে প্রশাসনের বৈঠকে চলাচল শুরুর সুনির্দিষ্ট তারিখ নির্ধারণ করা হতে পারে।

তিনি আরও জানান, ‘কক্সবাজার শহরের নুনিয়ারছড়া বিআইডব্লিউটিএ জেটি ঘাট ছাড়া টেকনাফ, শাহপরীর দ্বীপ কিংবা উখিয়া থেকে নৌযানে সেন্টমার্টিন যাওয়ার সুযোগ নেই। সরকার অনুমোদিত জাহাজে অনলাইন নিবন্ধনের মাধ্যমেই পর্যটকদের দ্বীপে যেতে হবে।’

এদিকে পর্যটকদের জন্য দ্বীপ উন্মুক্ত করার প্রস্তুতির মধ্যেই সেন্টমার্টিনের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন। কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় দ্বীপে প্রথমবারের মতো চালু করা হয়েছে বেওয়ারিশ কুকুরের জন্য একটি আশ্রম এবং প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় স্থায়ী ‘প্লাস্টিক এক্সচেঞ্জ স্টোর’।

শনিবার (১ নভেম্বর) প্রকল্প দুটি উদ্বোধন করেন বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান কিশোর কুমার দাশ। এসময় তিনি বলেন, সেন্টমার্টিনের পরিবেশ রক্ষা করতে হলে প্রকৃতি, প্রাণী ও মানুষের প্রয়োজনকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

প্রতিনিধি/এএইচ