জেলা প্রতিনিধি
০২ নভেম্বর ২০২৬, ১০:৪৬ এএম
উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) পরীক্ষার ফলাফলে পিরোজপুরের দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কলেজ শাখায় অংশ নেওয়া সাত শিক্ষার্থীর কেউই উত্তীর্ণ হতে পারেনি। প্রতিষ্ঠান দুটি হলো নাজিরপুরের দিঘিরজান মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজ এবং পিরোজপুর সদরের কদমতলা জর্জ হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজ। দুটি প্রতিষ্ঠানে মোট ২৪ জন শিক্ষক রয়েছেন। এ বছর প্রতিষ্ঠান দুটিতে মোট আটজন শিক্ষার্থী ফরম পূরণ করলেও পরীক্ষায় অংশ নেয় সাতজন। তাদের সবাই অকৃতকার্য হয়েছে।
রোববার (১ নভেম্বর) সরেজমিনে গিয়ে এসব তথ্য জানা যায়।
জানা গেছে, নাজিরপুরের দিঘিরজান মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজের কলেজ শাখা ২০১৪ সালে পাঠদানের অনুমতি পায়। গত চার বছরের এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটিতে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীর তুলনায় অনুত্তীর্ণের সংখ্যা বেশি।
২০২৩ সালে কলেজটি থেকে ৩৯ জন পরীক্ষায় অংশ নিয়ে উত্তীর্ণ হয় ১৮ জন। ২০২৪ সালে ২৭ জনের মধ্যে পাস করে ১৩ জন। ২০২৫ সালে ১৫ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয় মাত্র পাঁচজন। আর ২০২৬ সালে মানবিক বিভাগের পাঁচজন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিলেও কেউ পাস করতে পারেনি। প্রতিষ্ঠানটির কলেজ শাখায় আটজন শিক্ষক ও দুজন কর্মচারী রয়েছেন।

অন্যদিকে, পিরোজপুর সদরের কদমতলা জর্জ হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজের কলেজ শাখা ২০২৩ সালে পাঠদানের অনুমতি পায়। শুরু থেকেই এ শাখায় পাসের হার তুলনামূলক কম।
২০২৩ সালে কলেজটি থেকে ১২ জন পরীক্ষায় অংশ নিয়ে উত্তীর্ণ হয় ছয়জন। ২০২৪ সালে সাতজনের মধ্যে পাস করে তিনজন এবং ২০২৫ সালে সাতজনের মধ্যে চারজন উত্তীর্ণ হয়। চলতি বছর তিনজন শিক্ষার্থী ফরম পূরণ করলেও পরীক্ষায় অংশ নেয় দুজন। তাদের কেউই পাস করতে পারেনি।
তবে একই প্রতিষ্ঠানের স্কুল শাখার চিত্র ভিন্ন। গত চার বছরের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল তুলনামূলক ভালো। ২০২৩ সালে ৮৪ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করে ৭৫ জন। ২০২৪ সালে ৭৫ জনের মধ্যে ৬৯ জন, ২০২৫ সালে ৭০ জনের মধ্যে ৪৮ জন এবং ২০২৬ সালে ৫০ জনের মধ্যে ৪৫ জন উত্তীর্ণ হয়। প্রতিষ্ঠানটিতে ১৬ জন শিক্ষক ও দুজন কর্মচারী রয়েছেন।

এদিকে, বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের ছয় জেলার মধ্যে পাসের হারে শীর্ষে রয়েছে পিরোজপুর। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বরিশাল জেলা। তবে গত দুই বছরে পিরোজপুরে এইচএসসি পরীক্ষার পাসের হার কমেছে ৩১ দশমিক ৭৮ শতাংশ পয়েন্ট। ২০০৯ সাল থেকে পাওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এবারই জেলায় সর্বনিম্ন পাসের হার।
শনিবার সকালে বরিশাল মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের এইচএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর জেলাভিত্তিক ফলাফল বিশ্লেষণে এ তথ্য পাওয়া যায়।
এ বছর পিরোজপুর জেলায় এইচএসসি পরীক্ষায় মোট পরীক্ষার্থী ছিল সাত হাজার ৯৮ জন। এর মধ্যে পরীক্ষায় অংশ নেয় ছয় হাজার ৭৮২ জন। উত্তীর্ণ হয়েছে তিন হাজার ৪৯৬ জন। জেলায় পাসের হার ৫১ দশমিক ৫৫ শতাংশ। এ ছাড়া জিপিএ-৫ পেয়েছে ৬৬ জন।
জেলার গত কয়েক বছরের ফলাফল পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২৪ সালে পাসের হার ছিল ৮৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ। ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৬৪ দশমিক ০৭ শতাংশে। সর্বশেষ ২০২৬ সালে পাসের হার আরও কমে হয়েছে ৫১ দশমিক ৫৫ শতাংশ।

কদমতলা এলাকার এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক মো. সাইদুল ইসলাম বলেন, গত বছর এ কলেজে নতুন করে কেউ ভর্তি হয়নি। আগের বছর ভর্তি হওয়া দুজন শিক্ষার্থীই এ বছর পরীক্ষা দিয়েছে। তারা গত বছরও ফেল করেছে, এবারও পাস করতে পারেনি। এ কারণে কলেজ শাখার ফলাফল খারাপ হয়েছে। কলেজটি এমপিওভুক্ত হলে এবং সরকারি সুযোগ-সুবিধা পেলে স্থানীয় শিক্ষার্থীরা এখানেই ভর্তি হবে। এতে ফলাফলও ভালো হবে বলে আশা করি।
স্থানীয় আরেক অভিভাবক সুমি আক্তার বলেন, এখানে স্কুল শাখার পাশাপাশি কলেজ শাখার ফলাফলও ভালো হয়। তবে জানতে পেরেছি, গত বছর যারা এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছিল, তারাই এবার আবার পরীক্ষা দিয়ে ফেল করেছে।

কদমতলা এলাকার দুই বাসিন্দা মো. মাসুম বিল্লাহ ও সুলতানা জেসমিন মাহিনুর বলেন, তারাও এ প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করেছেন। এখানে এসএসসির ফলাফল ভালো হয়। ২০২৩ সালে কলেজ শাখা চালু হয়েছে। কিন্তু কলেজটি এমপিওভুক্ত না হওয়ায় এসএসসি পাস করা শিক্ষার্থীরা অন্য কলেজে ভর্তি হয়। কলেজটি এমপিওভুক্ত হলে স্থানীয় শিক্ষার্থীরা এখানেই উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে পড়তে পারবে। এতে তাদের সন্তানদের দূরের কোনো প্রতিষ্ঠানে যেতে হবে না। এ জন্য তারা কলেজটি এমপিওভুক্ত করার দাবি জানান।
দিঘিরজান মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজের ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের শিক্ষক সুমন বিশ্বাস বলেন, ২০১৪ সালে কলেজটি পাঠদানের অনুমতি পাওয়ার পর থেকে প্রতিবছরই পাবলিক পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে। বিগত বছরগুলোতে পরীক্ষার ফলাফল মোটামুটি সন্তোষজনক ছিল। তবে প্রতিষ্ঠানটি নন-এমপিওভুক্ত হওয়ায় শিক্ষকরা সরকারিভাবে কোনো বেতন-ভাতা পান না। ফলে তারা আর্থিক অসচ্ছলতার মধ্যে জীবনযাপন করছেন।
তিনি আরও বলেন, নন-এমপিওভুক্ত হওয়ায় এ প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী ভর্তি হতে চায় না। তারপরও কলেজটি টিকিয়ে রাখতে প্রতিবছর শিক্ষার্থীদের উদ্বুদ্ধ করে কিছু শিক্ষার্থী ভর্তি করানো হয়। শিক্ষার্থীদের নিয়মিত ক্লাসমুখী করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাস্তবে তাদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। শিক্ষার্থীরা ক্লাস করার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হলেও কলেজে আসে না। ফলে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে এবং পরীক্ষার ফলাফলেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। আজ ছয়জন শিক্ষক উপস্থিত থাকলেও একজন শিক্ষার্থীও কলেজে আসেনি। শিক্ষার্থীরা নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত না হলে ভালো ফলাফল করা সম্ভব নয়। শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতিই ফলাফল বিপর্যয়ের অন্যতম প্রধান কারণ।

পিরোজপুর সদরের কদমতলা জর্জ হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. হাফিজুর রহমান বলেন, তাঁদের বিদ্যালয় শাখার ফলাফল ভালো। কলেজ শাখার পাঠদানের অনুমতি পাওয়ার পর থেকে ফলাফলও সন্তোষজনক ছিল। তবে এ বছর নতুন কোনো শিক্ষার্থী ভর্তি না হওয়ায় ফলাফলে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এ অবস্থার উন্নতি করতে হলে কলেজ শাখাটিকে এমপিওভুক্ত করা জরুরি।
তিনি আরও বলেন, এটি গ্রাম পর্যায়ের একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। কলেজ শাখায় পাঠদানের জন্য প্রয়োজনীয় বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নেই। ফলে বিদ্যালয় শাখার শিক্ষকদের দিয়েই কলেজের কার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে। কলেজটি এমপিওভুক্ত হলে প্রয়োজনীয় বিষয়ে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হবে। এতে বিদ্যালয় শাখার শিক্ষার্থীদের উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে পড়াশোনার জন্য শহরমুখী হতে হবে না। তারা নিজ প্রতিষ্ঠানেই পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারবে। পাশাপাশি শিক্ষার মান উন্নয়নের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের ভালো ফলাফল ধরে রাখা সম্ভব হবে।
বরিশাল অঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা পরিচালক অধ্যাপক মো. জাকির হোসেন বলেন, যেসব প্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থী পাস করেনি, সেসব প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষকদের নিয়ে জেলাভিত্তিক সভা করা হবে। যেসব প্রতিষ্ঠানে পাসের হার শূন্য, সেগুলোর বেশির ভাগই নন-এমপিওভুক্ত। এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে আমরা ব্যবস্থা নিতে পারি, আর নন-এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের মতো চেষ্টা করে যাচ্ছে। এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানগুলোর বিগত দিনের কার্যক্রম পর্যালোচনা করে একটি সমাধানে পৌঁছানোর চেষ্টা করা হবে।
প্রতিনিধি/এসএস