Dhaka Mail Logo

সারাদেশ

নিঝুম দ্বীপসহ হাতিয়ার চরাঞ্চলে নেই পর্যাপ্ত চিকিৎসাব্যবস্থা

উপজেলা প্রতিনিধি

০১ নভেম্বর ২০২৬, ০১:৪৮ পিএম

দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন হিসেবে পরিচিত প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি হাতিয়ার নিঝুম দ্বীপ। ২ হাজার ১০০ বর্গকিলোমিটারেরও বেশি আয়তনের এ দ্বীপ উপজেলার চারপাশে রয়েছে অসংখ্য ছোট-বড় দ্বীপ ও চরাঞ্চল। এসব চরের অধিকাংশে কয়েক যুগ ধরে বসবাস করছেন হাজারো নদীভাঙন ও বাস্তুচ্যুত মানুষ। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য নিঝুমদ্বীপ, চর আতাউর, ঢালচর ও চর গাসিয়া।

ক্রমবর্ধমান জনবসতিপূর্ণ এসব দ্বীপ ও চরাঞ্চলে প্রায় ৬৫ হাজার মানুষের বসবাস। তবে তুলনামূলক কম জনবসতিপূর্ণ চরগুলো বাদ দিলেও উল্লেখিত জনবহুল চরাঞ্চলগুলোতে মানুষের চিকিৎসাসেবার জন্য কার্যকর হাসপাতাল বা ক্লিনিক গড়ে ওঠেনি।

সাগর ও নদীবেষ্টিত প্রান্তিক এসব এলাকার মানুষ উপজেলা ও জেলা সদরে গিয়ে চিকিৎসাসেবা নিতে নানা দুর্ভোগের শিকার হন। সময়মতো চিকিৎসাকেন্দ্রে পৌঁছাতে না পারায় গর্ভবতী ও প্রসূতি নারীদের পথে ও জলযানে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। নবজাতক এবং হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়া মানুষের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে। চিকিৎসাসেবার এমন সংকট দীর্ঘদিন ধরে উপেক্ষিত বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

f643e042-a46f-48a9-bc44-da78f290a364

সম্প্রতি নিঝুমদ্বীপসহ উল্লেখিত চরাঞ্চলগুলো ঘুরে স্থানীয়দের সঙ্গে চিকিৎসাসেবা নিয়ে কথা বলেন প্রতিবেদক। তারা জানান, এসব এলাকায় নিরাপদ প্রসবপূর্ব ও প্রসব-পরবর্তী চিকিৎসার অভাবে নারীরা মারাত্মক ঝুঁকিতে থাকেন। একইভাবে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়া রোগীদের দুর্গম এলাকা থেকে সময়মতো উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে। এসব কারণে বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে বলে তাদের অভিযোগ।

এ ছাড়া সাধারণ স্বাস্থ্যসেবা কিংবা দুর্ঘটনাজনিত চিকিৎসার জন্য চর ও দ্বীপের বাসিন্দাদের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে জেলা সদরে যেতে হয়। দ্বীপের মৎস্যজীবী, কৃষক ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর অনেকের পক্ষে এই ব্যয় ও যাতায়াতের ভোগান্তি সামলানো সম্ভব হয় না।

সরেজমিনে দেখা যায়, নিঝুমদ্বীপে একটি সাইক্লোন শেল্টারে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্র থাকলেও সেখানে কোনো মেডিকেল অফিসার নেই। পরিবারকল্যাণ পরিদর্শিকা ও উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসারও নেই। কয়েক বছর আগে কেন্দ্রটিতে পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতরের অধীনে ইউএসএআইডির সহযোগিতায় ‘মা-মণি’ নামে একটি প্রকল্প চালু ছিল। বর্তমানে ইউএনএফপিএর সহযোগিতায় একজন মিডওয়াইফের মাধ্যমে সীমিত পরিসরে স্বাভাবিক প্রসবসেবা দেওয়া হচ্ছে। তবে সরকারি অক্সিজেন সিলিন্ডার, গ্লাভসসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের সুবিধা ছাড়াই কোনোভাবে এ সেবা চালানো হচ্ছে বলে জানা গেছে।

703f7322-8377-48f0-8ec3-eaa50d031a1b

অন্যদিকে, দ্বীপের প্রায় ৪০ হাজার মানুষের সাধারণ স্বাস্থ্যসেবার জন্য তিনটি কমিউনিটি ক্লিনিক থাকলেও সেখান থেকে নিয়মিত সেবা পাওয়া কঠিন। অনুন্নত যোগাযোগব্যবস্থা এবং সভা-সেমিনারে অংশ নেওয়ার কারণে কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডাররা (সিএইচসিপি) নিয়মিত ক্লিনিকে উপস্থিত থাকেন না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। ফলে নারীস্বাস্থ্যসেবাসহ সাধারণ চিকিৎসার জন্য অনেককে স্থানীয় ফার্মেসি কিংবা কবিরাজি চিকিৎসার ওপর নির্ভর করতে হয়।

নিঝুমদ্বীপের এই সীমিত চিকিৎসাসেবার সুবিধাটুকুও নেই বাকি তিনটি জনবহুল চর—চর আতাউর, ঢালচর ও চর গাসিয়ায়।

এ বিষয়ে হাতিয়া উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মেহেদী হাসান বলেন, নিঝুমদ্বীপসহ চরাঞ্চলগুলোতে প্রয়োজনীয় কর্মী নেই। একটি কেন্দ্র থেকে মূল ভূখণ্ডে যতটুকু সেবা দেওয়া সম্ভব, ততটুকুই দেওয়া হচ্ছে।

আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে নিঝুমদ্বীপে একটি হাসপাতাল স্থাপনের দাবিতে এর আগে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছেন স্থানীয়রা। নিঝুমদ্বীপ ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান লাভলী আক্তার বলেন, একদিকে রাস্তাঘাটের দুরবস্থা, অন্যদিকে জেলা ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দূরত্ব বেশি হওয়ায় দরিদ্র ও অসহায় গর্ভবতী নারীদের চিকিৎসাসেবা নিতে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়। তাই এখানে ৩০ শয্যা একটি হাসপাতাল স্থাপন জরুরি হয়ে পড়েছে।

7b001ae8-42ed-4a82-9331-0def0fa157c8

এদিকে, উপজেলার সোনাদিয়া ইউনিয়নসংলগ্ন চর আতাউর আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা হাছান উদ্দিন জানান, আশ্রয়ণ প্রকল্পসহ সেখানে ২২০টি পরিবারে প্রায় ৫০০ মানুষের বসবাস। কিন্তু সেখানে কোনো স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র নেই। এমনকি ছেলেমেয়েদের পড়ালেখার জন্যও কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নেই।

সুখচর ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ড ঢালচরের প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার বাসিন্দা চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত বলে জানান আমজাদ ও আমির হোসেনসহ স্থানীয়রা। তাদের ভাষ্য, সেখানে কোনো চিকিৎসাকেন্দ্র নেই। নারীদের প্রসবজনিত সমস্যা দেখা দিলে গ্রাম্য ধাত্রীর মাধ্যমে কোনোভাবে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হয়।

স্থানীয় মসজিদ মার্কেটের জামসেদ বলেন, “এখানে কোনো চিকিৎসাসেবা নেই। পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান না থাকায় প্রায় এক হাজার ৫০০ শিশু শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়ে বেড়ে উঠছে।”

একই চিত্র হরনী ইউনিয়নের অধীন চর গাসিয়ায়। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, চিকিৎসাব্যবস্থা না থাকায় প্রতিনিয়ত ভোগান্তিতে পড়তে হয় তাদের। একইভাবে বিদ্যালয় না থাকায় হাজারো শিশু শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। চরটিতে প্রায় ১৯ হাজার মানুষের বসবাস।

স্থানীয় বাসিন্দা তৈমুর আলম জানান, সেখানে কোনো চিকিৎসাকেন্দ্র বা ক্লিনিক নেই। আশপাশেও কোনো চিকিৎসাকেন্দ্র না থাকায় গত ২৪ অক্টোবর স্থানীয় বারো আউলিয়া বাজারসংলগ্ন এলাকায় মৃত রাকিবের মেয়ে রহিমা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে মারা যায়।

8318366e-6c18-48c8-8a0a-8ea12f2c08c6

চরাঞ্চলের বাস্তুচ্যুত মানুষের স্বাস্থ্যসেবার এমন দুরবস্থা নিয়ে কথা হয় হাতিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সাঈদ এজাজুর রহমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, নিঝুমদ্বীপে হাসপাতাল স্থাপনের বিষয়ে কাজ চলমান রয়েছে। ঢালচর ও চর গাসিয়াসহ অন্যান্য চরাঞ্চলের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

একইভাবে নোয়াখালীর সিভিল সার্জন ডা. আনোয়ার হোসেন জানান, নিঝুমদ্বীপ, ঢালচর ও চর গাসিয়াসহ হাতিয়ার বিস্তীর্ণ জনবহুল ও দুর্গম চরাঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র স্থাপনের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। এ বিষয়ে যাচাই-বাছাই কার্যক্রমও এগোচ্ছে।

দুর্গম চরাঞ্চলে স্থায়ী স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র স্থাপন এবং জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

প্রতিনিধি/এসএস