জেলা প্রতিনিধি
৩১ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:৩২ পিএম
দিনাজপুর মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের অধীনে প্রকাশিত ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে কুড়িগ্রাম জেলার শিক্ষা ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা গেছে। জেলার ৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো পরীক্ষার্থীই পাস করতে পারেননি, যা দিনাজপুর বোর্ডের অধীন জেলাগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ।
দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের অধীন ৮টি জেলার মোট ৪৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শতভাগ শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছেন। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি ৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে কুড়িগ্রাম জেলায়। এই ৯টি প্রতিষ্ঠান থেকে মোট ৭০ জন পরীক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিলেও একজনও উত্তীর্ণ হতে পারেননি।
এরমধ্যে রৌমারী উপজেলার চর শৌলমারী আদর্শ মহিলা কলেজ থেকে ২৪ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিয়েছিলেন। ২০২৬ সালে কুড়িগ্রাম জেলা থেকে মোট ১১,৭২২ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিয়ে পাস করেছেন মাত্র ৪,৭৭৩ জন। জেলায় গড় পাসের হার ৪০.৭২ শতাংশ (বোর্ডে গড় পাসের হার ৪৫.৯৮ শতাংশ)। জেলায় জিপিএ-৫ পেয়েছেন মাত্র ১৩৬ জন শিক্ষার্থী।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) মো. আসাদুজ্জামান বলেন, কুড়িগ্রামে ৯টি প্রতিষ্ঠান থেকে কেউ পাস করেনি। আমরা অনুসন্ধান করে প্রকৃত কারণ উদঘাটন করে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করব। শিক্ষার মানোন্নয়নে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। এতে কোনো পক্ষের কোনো গাফিলতি থাকলে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
বোর্ডের ফলাফল অনুযায়ী, শতভাগ অকৃতকার্য হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে রৌমারী উপজেলার চর শৌলমারী আদর্শ মহিলা কলেজে ২৪ জন, রাজারহাট উপজেলার সিঙ্গার ডাবরীহাট কলেজে ১০ জন, একই উপজেলার সিঙ্গার ডাবরীর হাট বি. এল. হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজে ৬ জন ও রাজারহাট উপজেলার পাঙ্গারানী লক্ষ্মীপ্রিয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজের একজন পরীক্ষার্থী।
নাগেশ্বরী উপজেলার নাগেশ্বরী মডেল কলেজে ১৫ জন, নাগেশ্বরী উপজেলার কুটি পেয়ারা ডাঙ্গা স্কুল অ্যান্ড কলেজে ৫ জন এবং একই উপজেলার চিলাখানা মডেল কলেজে ৪ জন পরীক্ষার্থী ফেল করেছে। এ ছাড়া উলিপুর উপজেলার হজরত ফাতিমা (রা.) পৌর গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের ৩ জন এবং চিলমারী উপজেলার দক্ষিণ খাওরিয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজের ২ জন পরীক্ষার্থীর কেউ পাস করতে পারেনি।
সরেজমিনে ঘুরে জানা যায়, উলিপুরের হজরত ফাতেমা (রা.) পৌর গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ হাফিজ রহুল আমিন বলেন, তার প্রতিষ্ঠানের তিন পরীক্ষার্থীই বিবাহিত। সংসারের চাপের কারণে তারা ঠিকমতো পড়াশোনা করতে পারেনি। তিনি বলেন, আমরা চাই সবাই পাস করুক। কিন্তু শিক্ষার্থীদের আগ্রহ না থাকলে ভালো ফল করা কঠিন।
সিঙ্গার ডাবড়ীহাট কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ তৌহিদুল ইসলাম বলেন, তার প্রতিষ্ঠান ১৯৯৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০২৪ সাল পর্যন্ত নিয়মিত ভালো ফলাফল করে আসলেও সরকার এখন পর্যন্ত এমপিও দেয়নি। ফলে শিক্ষক-কর্মচারীরা হতাশ হয়ে পড়েছে। গত বছর ৬ জন পরীক্ষা দিয়ে কেউ পাস করতে পারেনি। আর এবার ১০ জন পরীক্ষা দিয়ে সবাই ফেল করেছে। সবাই মানবিক বিভাগ থেকে পরীক্ষায় অংশ নেয়। শিক্ষকরা তাদের সাধ্যমতো চেষ্টা করেছে। প্রশ্ন কঠিন হওয়ায় এবং শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি ভালো না হওয়ায় এ বিপর্যয় ঘটে। আমরা আগামীতে ভুল শুধরে নেব।
এই প্রতিষ্ঠানের মাঠে কাঠের ফার্নিচারের দোকানি শাহ আলম বলেন, এই ক্যাম্পাসে এ কলেজের কার্যক্রম চলছে গত তিন বছর থেকে। গত বছর মাঝে মধ্যে শিক্ষার্থীদের আসতে দেখলেও চলতি বছর কোনো শিক্ষার্থীকে কলেজে আসতে দেখিনি। শিক্ষকদের মাঝে মধ্যে আসতে দেখি কিন্তু কোনো ক্লাস হয় না। স্থা
নীয় অধিবাসী রেজাউল বলেন, কলেজটি কয়েক বছর থেকে এখানে চারটি রুমে ভাড়ায় চলছে। ছাত্র-শিক্ষক কাউকে আসতে দেখি না। পড়ালেখা না হলে পাস করবে কেমনে।
এই কলেজের ব্যবস্থাপনা কমিটির সাবেক সদস্য রবীন্দ্রনাথ রায় বলেন, শিক্ষক বেতন না পেলে পড়ালেখা করাবে কেমনে। ২৬-২৭ বছর ধরে স্বেচ্ছায় লেখাপড়া শেখায়। শিক্ষার্থীরা গরিব, কর্মজীবী, তাদেরও লেখাপড়ায় আগ্রহ কম। এসব কারণে এ অবস্থা। সরকারকে এসব বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে হবে।
রাজারহাট উপজেলার পাঙ্গারানী লক্ষ্মীপ্রিয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ তুহিন পাটোয়ারী বলেন, কলেজ শাখা এমপিওভুক্ত না হওয়ায় সব শিক্ষক চলে গেছে। ফলে ক্লাসও হয় না, নতুন শিক্ষার্থীও ভর্তি হয় না। মাঝে মধ্যে দু-একজন এসে পরীক্ষা দেয়। এখন কলেজ শাখায় কোনো শিক্ষক নেই।
এ বিষয়ে সহকারী জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আব্দুল হাই সিদ্দিকী বলেন, তারা সাধারণ মাধ্যমিক শাখার কার্যক্রম দেখভাল করেন। উচ্চমাধ্যমিক শাখা সরাসরি শিক্ষা বোর্ডের নিয়ন্ত্রণে। এ কারণে এসব প্রতিষ্ঠানের ফল বিপর্যয়ের বিষয়ে তারা বিস্তারিত অবগত নন।
জেলা প্রশাসকের শিক্ষা শাখার বরাতে জানা যায়, চলতি বছরের এইচএসসি পরীক্ষায় কুড়িগ্রাম জেলার ৯ উপজেলার ফলাফলও সন্তোষজনক নয়। জেলায় মোট ১১ হাজার ৭২২ জন পরীক্ষার্থী এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেন। তাদের মধ্যে ৫ হাজার ৬৮৩ জন ছাত্র ও ৬ হাজার ৩৯ জন ছাত্রী। উত্তীর্ণ হয়েছেন মাত্র ৪ হাজার ৭৭৩ জন। সে হিসাবে জেলায় পাসের হার ৪০ দশমিক ৭২ শতাংশ।
ফলাফলে ছাত্রদের তুলনায় ছাত্রীরা এগিয়ে রয়েছেন। ছাত্রদের পাসের হার ৩৫ দশমিক ৯৫ শতাংশ এবং ছাত্রীদের ৪৫ দশমিক ২১ শতাংশ। জেলায় জিপিএ-৫ পেয়েছেন মোট ১৩৬ জন শিক্ষার্থী। তাঁদের মধ্যে ৫৯ জন ছাত্র এবং ৭৭ জন ছাত্রী।
শিক্ষা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, চরাঞ্চল ও সীমান্তবর্তী এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, শিক্ষক সংকট এবং শিক্ষার্থীদের নিয়মিত ক্লাসে অনুপস্থিতির মতো বিষয়গুলো খারাপ ফলাফলের পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।
এছাড়া অনেক প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিনেও এমপিওভুক্ত না হওয়ায় শিক্ষক-কর্মচারীরা বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না। ফলে পাঠদানে তাদের আগ্রহ কম এবং দায়বদ্ধতা না থাকায় এ বিপর্যয় ঘটেছে। রাজারহাট উপজেলার তিনটি প্রতিষ্ঠানের কলেজ শাখার এমপিও নেই।
জেলা শিক্ষা অফিসার শরিফুল ইসলাম জানান, দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের অধীন আট জেলার মধ্যে পাসের হারে ৪০ দশমিক ৭২ শতাংশ নিয়ে কুড়িগ্রামের অবস্থান ষষ্ঠ।
এএইচ