জেলা প্রতিনিধি
৩১ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:৫৭ এএম
সাধারণ চোখে যা নিছকই আবর্জনা কিংবা অব্যবহৃত বর্জ্য, পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলার কয়েকটি গ্রামের মানুষের কাছে সেই ফেলে দেওয়া নারিকেলের ছোবড়াই আজ জীবিকা নির্বাহের প্রধান হাতিয়ার ও সম্ভাবনার এক নতুন দিগন্ত। নারিকেলের ছোবড়া দিয়ে তৈরি হচ্ছে বাহারি ব্রাশ, দৃষ্টিনন্দন পাপোশসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় ব্যবহার্য পণ্য। প্রায় সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে চলে আসা এই ঐতিহ্যবাহী ও পরিবেশবান্ধব কুটিরশিল্প গ্রামীণ অর্থনীতিতে যোগ করেছে এক অনন্য মাত্রা। স্থানীয় কারিগরদের নিপুণ হাতে তৈরি এসব পণ্য পাইকারদের হাত ধরে পৌঁছে যাচ্ছে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের নানা প্রান্তে।
একসময় বাড়ি ও আশপাশের আঙিনায় কিংবা রাস্তার পাশে ফেলে দেওয়া যেসব নারিকেলের ছোবড়া পরিবেশের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াতো, আজ তা রূপ নিচ্ছে বহুমুখী ও প্রয়োজনীয় পণ্যে। নেছারাবাদ উপজেলার আলকিরহাট ও সুটিয়াকাঠী গ্রামের কয়েকটি পরিবার বংশপরম্পরায় পরম যত্নে টিকিয়ে রেখেছে ছোবড়া দিয়ে পণ্য তৈরির এই নান্দনিক ঐতিহ্য।
প্রক্রিয়াকরণের প্রথম ধাপে গ্রামবাংলার বিভিন্ন গৃহস্থালি ও বাজার থেকে সংগ্রহ করা হয় নারিকেলের অবশিষ্টাংশ বা ছোবড়া। এরপর সেগুলো প্রায় এক মাস ধরে পানিতে ভিজিয়ে রাখা হয়। পর্যাপ্ত সময় ভেজার পর বিশেষ ও ঐতিহ্যগত প্রক্রিয়ায় সেই ভেজানো ছোবড়া থেকে আলাদা করা হয় প্রয়োজনীয় ও মজবুত আঁশ। এই আঁশই পরবর্তীতে চলে যায় কারিগরদের দক্ষ ও নিপুণ হাতে।

অত্যন্ত সুনিপুণভাবে চিকন সুতার সঙ্গে ছোট ছোট ছোবড়ার টুকরা গেঁথে তৈরি হয় আকর্ষণীয় ও টেকসই পাপোশ। প্রয়োজনের তাগিদে তৈরি করা যায় বিভিন্ন আকার ও ডিজাইনের নানা ধরনের পাপোশ। ঘরের কাজের ফাঁকে গ্রামের নারীরা যেমন পরম মমতায় এই পাপোশ তৈরিতে সময় দেন, তেমনি পুরুষরাও কাজে সমানভাবে সহযোগিতা করে থাকেন। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে স্থানান্তরিত হয়ে আসা এই কাজের কৌশল এখানকার পরিবারগুলোর রক্তে মিশে আছে।
অন্যদিকে আলকিরহাটে একই ছোবড়া দিয়ে তৈরি হচ্ছে ঘরোয়া ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবহারের নানা ধরনের ব্রাশ। নির্দিষ্ট মাপে আঁশ কেটে সুতা দিয়ে শক্ত করে পেঁচিয়ে কাঠের বা অন্য হাতলের সঙ্গে পেরেক দিয়ে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে লাগানো হয়। প্রায় ১০টি সুনির্দিষ্ট ধাপ পেরিয়ে তবেই তৈরি হয় একটি পূর্ণাঙ্গ ব্রাশ। গাড়ি পরিষ্কার করা থেকে শুরু করে বাসা-বাড়ির নানা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজে এসব ব্রাশের চাহিদা রয়েছে ব্যাপক।
বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর করার এই মহৎ উদ্যোগে একদিকে যেমন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পরিবেশ রক্ষা পাচ্ছে, অন্যদিকে গ্রামীণ জনপদের বেকার নারী-পুরুষের কর্মসংস্থানের এক অপার সুযোগ তৈরি হয়েছে নিজ গ্রামেই। সংসারের কাজের পাশাপাশি নারীরা এই কাজে যুক্ত হয়ে বাড়তি আয় করছেন, যা তাদের পারিবারিক সচ্ছলতা ফিরিয়ে আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
হাতে তৈরি এসব পরিবেশবান্ধব পণ্যের কদর এখন স্থানীয় গণ্ডি পেরিয়ে পৌঁছে গেছে দেশের বড় বড় শহরে। পাইকাররা এসব পণ্য কিনে নিয়ে যাচ্ছেন ঢাকা সহ দেশের বিভিন্ন জেলায়।

বাজার ঘুরে দেখা গেছে, আকার ও মানভেদে প্রতিটি ব্রাশ পাইকারি ও খুচরা বাজারে বিক্রি হয় ৮০ থেকে ১২০ টাকায়। অন্যদিকে ছোট ও মাঝারি পাপোশের দাম ২০০ টাকা থেকে শুরু করে বড় আকারের আকর্ষণীয় পাপোশ ৬০০ থেকে শুরু করে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়ে থাকে। তবে পণ্যের বাণিজ্যিক চাহিদা ও দাম বেশ ভালো থাকলেও এর নেপথ্যের কারিগররা তুলনাম‚লক কম পারিশ্রমিক পান। সারাদিন হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেও একজন কারিগরকে সন্তুষ্ট থাকতে হয় মাত্র ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা মজুরিতে।
গ্রামীণ এই কুটিরশিল্পটির অমিত সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এটি আজও বড় পরিসরে প্রসার লাভ করতে পারেনি। আধুনিক বাজারব্যবস্থার অভাব, বিপণনের নানা সীমাবদ্ধতা এবং পর্যাপ্ত পুঁজি বা ক্রেতার সংকটের কারণে কারিগররা তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে অনেকাংশেই বঞ্চিত হচ্ছেন। স্থানীয় কারিগরদের দাবি, যদি সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা, বাজার সম্প্রসারণ এবং আধুনিক বিপণনব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়, তবে ছোবড়াভিত্তিক এই শিল্পটি দেশের অন্যতম একটি বড় কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে।
সম্ভাবনাময় এই কুটিরশিল্প সম্পর্কে জানতে চাইলে বিসিক পিরোজপুরের উপ-ব্যবস্থাপক এইচ এম ফাইজুর রহমান জানান, নারিকেলের ছোবড়া দিয়ে গাড়ি ধোয়ার ব্রাশ ও পাপোশ তৈরির এই উদ্যোগ অত্যন্ত প্রশংসনীয় ও পরিবেশবান্ধব। এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে এবং এর সঠিক বিকাশে এর সঙ্গে জড়িত কারিগর ও উদ্যোক্তাদের বিসিকের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় কারিগরি পরামর্শ এবং সহজ শর্তে ঋণ প্রদানের মাধ্যমে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হবে।
সংশ্লিষ্টদের বিশ্বাস, যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা এবং আধুনিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে নেছারাবাদের এই ছোবড়া শিল্প শুধু স্থানীয় অর্থনীতিকেই চাঙ্গা করবে না, বরং জাতীয় অর্থনীতিতেও একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে সক্ষম হবে।
প্রতিনিধি/এমএইচআর