জেলা প্রতিনিধি
৩০ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:১৪ পিএম
শেরপুরের নালিতাবাড়ীর বারোমারীতে দুই দিন ধরে চলা ‘ফাতেমা রাণীর বার্ষিক তীর্থোৎসবের’ পর্দা নেমেছে। বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) শুরু হওয়া এ ধর্মীয় আয়োজন শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে মহাখ্রিস্টযাগের মধ্যদিয়ে শেষ হয়। আয়োজকদের হিসাবে, এবারের উৎসবে প্রায় অর্ধলক্ষাধিক খ্রিস্টভক্ত অংশ নেন।
ভারতের মেঘালয় রাজ্যের সীমান্তঘেঁষা গারো পাহাড়ের বারোমারী সাধু লিওর খ্রিস্টান ধর্মপল্লীতে প্রতিবছর এ আয়োজন ঘিরে তৈরি হয় ব্যতিক্রমী পরিবেশ। এবারও স্থানীয় গারো সম্প্রদায়ের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা খ্রিস্টভক্তদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। মূল অনুষ্ঠান শুরুর আগেই তীর্থযাত্রীদের আগমন শুরু হয়। তাদের নিরাপত্তা ও নির্বিঘ্নে ধর্মীয় কার্যক্রমে অংশগ্রহণের জন্য প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিশেষ ব্যবস্থা নেয়।
এবারের তীর্থোৎসবের অন্যতম আকর্ষণ ছিল বৃহস্পতিবার রাতের মোমবাতি প্রজ্জ্বালন ও আলোক শোভাযাত্রা। প্রার্থনা ও আত্মিক শুদ্ধতার প্রত্যাশা নিয়ে হাজারো ভক্ত মোমবাতি হাতে পাহাড়ি ক্রুশের পথে অংশ নেন। প্রায় দুই কিলোমিটার পথ ধরে এগিয়ে চলা এই শোভাযাত্রায় রাতের আঁধারে আলোকিত হয়ে ওঠে গারো পাহাড়। ভক্তদের প্রার্থনা আর মোমবাতির আলোয় পুরো আয়োজন পায় ভিন্ন মাত্রা।
এর আগে বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টার দিকে পবিত্র খ্রিস্টযাগ ও বিশেষ প্রার্থনার মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। দুই দিনের কর্মসূচিতে ছিল পাপস্বীকার, নিশিজাগরণ, মহাখ্রিস্টযাগ, সাক্রামেস্তের আরাধনা, নিরাময় অনুষ্ঠান, ব্যক্তিগত প্রার্থনা এবং শুক্রবার সকালে জীবন্ত ক্রুশের পথ।
ধর্মীয় এসব আয়োজনে প্রধান পুরোহিতের দায়িত্ব পালন করেন ময়মনসিংহ খ্রিস্টধর্ম প্রদেশের বিশপ পনেল পৌল কুবি সিএসসি।
তীর্থোৎসবে অংশ নিতে নেত্রকোনা থেকে আসেন সোনালী চাম্বুগং। তিনি জানান, মনের একটি ইচ্ছা পূরণের আশায় আগে এই তীর্থস্থানে মানত করেছিলেন। সেই প্রত্যাশা পূরণ হওয়ায় এবার বারোমারীতে এসে মা মারিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন। নিজের মনোবাসনা পূরণ হওয়ায় তিনি আনন্দিত।
দুই দিনের আয়োজন নির্বিঘ্নে শেষ হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন আয়োজক কমিটির সমন্বয়ক ও বারোমারী খ্রিস্টান মিশনের পালপুরোহিত রেভারেন্ড ফাদার তরুণ বনোয়ারী।
তিনি বলেন, সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের পাশাপাশি এবারের অনুষ্ঠান শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে পেরে তারা আনন্দিত। অনুকূল পরিবেশে ধর্মীয় মর্যাদা ও শৃঙ্খলা বজায় রেখে পুরো আয়োজন শেষ করা সম্ভব হয়েছে। এ ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের সহযোগিতার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
জেলা প্রশাসক ফরিদা ইয়াসমিন জানান, তীর্থোৎসবের শুরু থেকেই জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসন সার্বিক সহযোগিতা দিয়েছে। বিপুলসংখ্যক ভক্তের উপস্থিতিতেও অনুষ্ঠান শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হওয়ায় সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।
আগামী বছরগুলোতেও উৎসবের এমন নিরাপদ ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ বজায় থাকবে বলে প্রত্যাশা করেন জেলা প্রশাসক।
এবারের আয়োজনের মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘মানবতার জননী ফাতেমা রাণী মা মারিয়া’। এ বিষয়ে ময়মনসিংহ খ্রিস্টধর্ম প্রদেশের বিশপ পনেল পৌল কুবি সিএসসি বলেন, তীর্থোৎসবের মধ্যদিয়ে মা মারিয়ার জীবন ও আদর্শ খ্রিস্টভক্তদের সামনে তুলে ধরা হয়েছে। তার আদর্শ অনুসরণ করে যিশু খ্রিস্টের প্রতি বিশ্বাস ও আনুগত্য নিয়ে জীবন পরিচালনার আহ্বান জানান তিনি।
একই সঙ্গে পাপমুক্তি ও আত্মিক প্রশান্তির প্রত্যাশায় মানুষ এ তীর্থস্থানে সমবেত হন বলে উল্লেখ করেন বিশপ।
ধর্মীয় কর্মসূচির বাইরে তীর্থযাত্রী ও দর্শনার্থীদের জন্য ছিল বাণিজ্যিক আয়োজনও। ধর্মপল্লীসংলগ্ন মাঠে বসে বিভিন্ন পণ্যের মেলা। সেখানে খ্রিস্টধর্মীয় সামগ্রীর পাশাপাশি গারো নারীদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক, চুড়ি, মালা, ঘর সাজানোর উপকরণ, গৃহস্থালির সামগ্রী, শোপিস ও শিশুদের খেলনা নিয়ে দোকান সাজান ব্যবসায়ীরা। মেলায় শুধু খ্রিস্টভক্ত গারো সম্প্রদায়ের মানুষই নন, স্থানীয় বাঙালি মুসলিম ও হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনও কেনাকাটা ও ঘোরাফেরায় অংশ নেন। ফলে ধর্মীয় আয়োজনের পাশাপাশি মেলাটি হয়ে ওঠে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের মিলনস্থল।
আয়োজক সূত্রে জানা যায়, প্রতিবছর অক্টোবর মাসের শেষ বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার এই বার্ষিক তীর্থোৎসব হয়। শেরপুরের স্থানীয় খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জেলা এবং বিদেশ থেকেও এতে অংশ নেন বিপুলসংখ্যক তীর্থযাত্রী।
১৯৪২ সালে প্রায় ৪২ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয় বারোমারী সাধু লিওর খ্রিস্টান ধর্মপল্লী। পরে ১৯৯৮ সালে পর্তুগালের ফাতেমা নগরীর আদলে সেখানে গড়ে তোলা হয় ফাতেমা রাণীর তীর্থস্থান। এরপর থেকে প্রতিবছর গারো পাহাড়ের এই জনপদে বসে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ খ্রিস্টীয় ধর্মীয় সমাবেশ। তীর্থস্থানটির অন্যতম দর্শনীয় স্থাপনা ৪৮ ফুট উচ্চতার মা মারিয়ার বিশাল প্রতিকৃতি।
প্রতিনিধি/এলএ