জেলা প্রতিনিধি
৩০ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:৩১ পিএম
বরগুনা জেলা পরিষদের ডাকবাংলোর পৃথক দুটি কক্ষ থেকে মা ও তাঁর দুই মেয়ের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় তদন্তের অগ্রগতি তুলে ধরেছে পুলিশ। পুলিশ বলছে, পরিবারের ওপর চার লাখ টাকার বেশি ঋণের বোঝা এবং তা পরিশোধের দুশ্চিন্তা থেকে হতাশাগ্রস্ত হয়ে দুই মেয়েকে হত্যার পর মা ইতি রানী (৩৪) আত্মহত্যা করেছেন বলে প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করছে তারা।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) বিকেলে বরগুনা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) মো. মুকিত হাসান খাঁন এসব তথ্য জানান।
নিহত দুই শিশুর নাম- আরাধ্যা বিশ্বাস (১২) ও অনুরাধা বিশ্বাস (৩)।

পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১৫ বছর আগে বরগুনা পৌরসভার কড়ইতলা এলাকার বাসিন্দা দুলাল চন্দ্র বিশ্বাসের সঙ্গে বিয়ে হয় ইতি রানীর। তাঁদের সংসারে জন্ম নেয় দুই মেয়ে। দুলাল চন্দ্র বিশ্বাস ছোট একটি দর্জির দোকান পরিচালনার পাশাপাশি সুপারির ক্ষুদ্র ব্যবসা করতেন। তবে সীমিত আয় দিয়ে সংসারের ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছিল।
সংসারের আর্থিক অবস্থার উন্নতি এবং স্বামীর ব্যবসায় সহায়তার আশায় ইতি রানী স্থানীয় পাঁচটি এনজিও থেকে মোট ২ লাখ ২৭ হাজার ৭২৩ টাকা ঋণ নেন। পাশাপাশি তাঁর স্বামী একটি এনজিও থেকে ৮০ হাজার টাকা এবং দুই ব্যক্তির কাছ থেকে আরও এক লাখ টাকা ধার করেন। সব মিলিয়ে তাঁদের পরিবারের নামে ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৪ লাখ ৭ হাজার ৭২৩ টাকা।
পুলিশ জানায়, অধিকাংশ ঋণের কিস্তি নিয়মিত পরিশোধ করা হলেও সব ঋণ শোধ করার বিষয়টি নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিলেন ইতি রানী। পরিবারের আর্থিক সংকট কাটাতে তিনি বরগুনা জেলা পরিষদের ডাকবাংলোয় পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ শুরু করেন। ঘটনার প্রায় দুই মাস আগে তিনি সেখানে যোগ দিয়েছিলেন।
তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, গত ৩ জুন বেলা ১১টার দিকে দুই মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে ডাকবাংলোয় যান ইতি রানী। ওই দিন দুপুরের দিকে ভবনের তৃতীয় তলার একটি কক্ষ ভেতর থেকে বন্ধ দেখতে পান অন্য কর্মীরা। পরে বিষয়টি পুলিশকে জানানো হয়। পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে একটি কক্ষ থেকে বড় মেয়ে আরাধ্যা বিশ্বাসের মরদেহ এবং অন্য একটি কক্ষ থেকে ইতি রানী ও ছোট মেয়ে অনুরাধা বিশ্বাসের মরদেহ উদ্ধার করে।
একই ঘটনায় মা ও দুই মেয়ের মরদেহ উদ্ধারের পর এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। ঘটনাটি হত্যা, নাকি আত্মহত্যা তা নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দেয়। পরে গত ৯ জুন নিহত ইতি রানীর স্বামী দুলাল চন্দ্র বিশ্বাস বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে বরগুনা থানায় মামলা করেন।
মামলাটির তদন্তে পরিবারের ঋণ, আর্থিক সংকট এবং ইতি রানীর মানসিক দুশ্চিন্তার বিষয়গুলো সামনে এসেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে দুই সন্তানকে হত্যার পর ইতি রানী আত্মহত্যা করেছেন বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে তদন্তকারী সংস্থা।
সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. মুকিত হাসান খাঁন সাংবাদিকদের বলেন, ইতি রানীর স্বামীর নিজস্ব কোনো জমি ছিল না। পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতা এবং বিভিন্ন ব্যক্তি ও এনজিওর কাছ থেকে নেওয়া ঋণের চাপ তাঁকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলেছিল বলে প্রাথমিক তদন্তে প্রতীয়মান হয়েছে। এসব কারণেই তিনি এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকতে পারেন বলে পুলিশের ধারণা।
তিনি আরও জানান, মামলাটির তদন্ত এখনো চলমান। তদন্তের প্রয়োজনীয় কার্যক্রম শেষ করে অতি শিগগিরই আদালতে পুলিশ রিপোর্ট দাখিল করা হবে।
প্রতিনিধি/এএম