জেলা প্রতিনিধি
২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৩০ পিএম
জমি নিয়ে বিরোধকে কেন্দ্র করে মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখানে ইটের ভাটায় ফেলে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে বাবা ও মেয়েকে।
এ ঘটনায় প্রথমে তোয়াবা (৫) নামে এক শিশুর মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। শিশুটির গলায় গুরুতর আঘাত ও চোখ উপড়ানো অবস্থায় মরদেহটি পাওয়া যায়। এ ঘটনায় গুরুতর আহত শিশুটির বাবা গোলাপ হোসেনও (৩৫) ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন।
জমি নিয়ে পূর্ববিরোধের জেরে বাবা ও মেয়ের ওপর হামলা চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে পরিবার।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) সকাল ৯টার দিকে উপজেলার লতব্দী ইউনিয়নের রামকৃষ্ণদী গ্রামের মোল্লা ব্রিকস ইটভাটার কাছে একটি পরিত্যক্ত জমি থেকে শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। গোলাপ হোসেনের বাড়ি রামকৃষ্ণদী গ্রামে হলেও তিনি স্ত্রী শিউলি বেগম ও সন্তানদের নিয়ে একই ইউনিয়নের দোসরপাড়া গ্রামে শ্বশুরবাড়িতে বসবাস করতেন।
এ ঘটনায় মৃত্যুর আগে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে পুলিশের কাছে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হামলার ঘটনার লোমহর্ষক বর্ণনা দিয়ে জড়িতদের নাম পরিচয় উল্লেখ করে জবানবন্দি দিয়ে গেছেন নিহত গোলাপ হোসেন।
সেই সূত্র ধরে ঘটনা তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ। আটক করা হয়েছে মূল অভিযুক্তকে। নির্মম এ ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি জানিয়েছে পরিবার।
পুলিশ ও স্থানীয়রা জানায়, বুধবার (২৮ অক্টোবর) বিকেলে তোয়াবা তার বাবার সঙ্গে দাদার বাড়িতে গিয়েছিল। সেখান থেকে ফেরার পথে বাবা-মেয়ের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ পরিবারের। পরে রক্তাক্ত অবস্থায় গোলাপ হোসেন বাড়িতে ফিরলেও তোয়াবার খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না।
বৃহস্পতিবার সকালে ইটভাটার কাছে পরিত্যক্ত জমিতে শিশুটির মরদেহ পড়ে থাকতে দেখে পুলিশকে খবর দেন স্থানীয়রা। জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯ খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে।
এদিকে গুরুতর আহত গোলাপ হোসেনকে প্রথমে ঢাকার কেরানীগঞ্জের আব্দুল্লাপুর এলাকার স্বদেশ হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে বৃহস্পতিবার দুপুর দেড়টার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, শরীরে ধারালো অস্ত্রের আঘাত ও বিষক্রিয়া তার মৃত্যুর কারণ হতে পারে।
নিহত শিশুটির মা শিউলি বেগম অভিযোগ করেন, প্রতিবেশী সোহরাবসহ কয়েকজনের সঙ্গে তাদের জমি নিয়ে বিরোধ চলছিল এবং এ নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে মামলাও রয়েছে। সেই বিরোধের জের ধরে তার স্বামী ও মেয়ের ওপর হামলা চালানো হয়ে থাকতে পারে বলে তিনি দাবি করেন।
নিহত রাজমিস্ত্রি গোলাপ হোসেনের মা হাসু বেগম বলেন, আমার দ্বিতীয় স্বামী,গোলাপের সৎ বাবা জয়নাল মিয়া গত পাঁচ বছর ধরে রামকৃষ্ণদী একটি ইটভাটায় কাজ করছেন। গতকাল বুধবার বিকেলে মেয়েকে নিয়ে রামকৃষ্ণদী এলাকার একটি ইটভাটায় বাবার সঙ্গে দেখা করতে আসেন গোলাপ হোসেন। এরপর ফেরার পথে বাবা ও কন্যা শিশুর ওপর হামলার ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ উঠেছে।
তিনি আরও বলেন, মামাবাড়ির জমি নিয়ে বিরোধকে কেন্দ্র করে সিরাজদীখান উপজেলার লতব্দী ইউনিয়নের রামকৃষ্ণদী গ্রামের সোহরাব হোসেনে সঙ্গে বিরোধ চলছিল গোলাপ হোসেনের।
সেই সূত্র ধরে, ১৫ থেকে ২০ জনের একটি সংঘবদ্ধ গ্রুপের সদস্যরা গতিরোধ করে অতর্কিত হামলা চালায় বাবা ও মেয়ের উপরে। এ সময় ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর জখম করা হয় গোলাপ হোসেন ও তার মেয়েকে। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হয় গোলাপ হোসেনকে। তবে সে সময় তাৎক্ষণিক সন্ধান পাওয়া যায়নি শিশুটির।
এরপর চিকিৎসাধীন অবস্থায় নিহতের শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে নেওয়া হয় ঢাকা মেডিকেলে সেখানেই বৃহস্পতিবার বেলা ১টার দিকে মৃত্যুবরণ করেন তিনি। একইদিন সকালে ঘটনাস্থল থেকে নিহতের মেয়ে শিশু তওবার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
তবে মৃত্যুর আগে নিহতের দেওয়া জবানবন্দি ও ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া আলামতের সূত্র ধরে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ, দ্রুত জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হবে বলে জানান মুন্সিগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) মো. কামরান হোসেন।
তিনি জানান, শিশুটির মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য একাধিক ব্যক্তিকে থানায় নেওয়া হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করতে তদন্ত চলছে। তবে কারা এবং কী কারণে বাবা-মেয়ের ওপর হামলা চালিয়েছে, তা তদন্তের আগে নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রতিনিধি/এলএ