জেলা প্রতিনিধি
২৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৩৫ পিএম
ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে ভোটারদের মধ্যে ৫০০ থেকে এক হাজার টাকা করে বিতরণ এবং অর্থের বিনিময়ে ভোট কেনার প্রস্তুতির অভিযোগ তুলেছেন জামায়াতের প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেন। তার অভিযোগ, ভোটার স্লিপ বিতরণের পাশাপাশি ভোটারদের টাকা দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া ধানের শীষে ভোট দেওয়ার শর্তে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষি কার্ড, বয়স্ক ভাতা ও বিধবা ভাতার প্রলোভন দেখিয়ে ভোটারদের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচন সামনে রেখে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ তুলে ধরেন জামায়াতের এই প্রার্থী। এ সময় তিনি নির্বাচনী প্রচারণায় বাধা, নেতাকর্মীদের ওপর হামলা, ভোটারদের ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নির্বাচনী কার্যক্রমে ব্যবহারেরও অভিযোগ করেন।
দেলাওয়ার হোসেন বলেন, গত এক সপ্তাহ ধরে বিভিন্ন সরকারি সুবিধার কার্ড দেওয়ার কথা বলে ভোটারদের নাম ও জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে বলে তারা অভিযোগ পেয়েছেন। একই সঙ্গে ধানের শীষে ভোট দিলে এসব সুবিধা দেওয়া হবে বলে আশ্বাস দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
তিনি বলেন, ভোটার স্লিপ বিতরণের পাশাপাশি ভোটারদের ৫০০ থেকে এক হাজার টাকা করে দেওয়া হচ্ছে বলে তাদের কাছে তথ্য এসেছে। অভিযোগগুলো সত্য হলে তা নির্বাচনী আচরণবিধির গুরুতর লঙ্ঘন। এ বিষয়ে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
জামায়াতের এই প্রার্থী আরও বলেন, গত রাতের মতো বুধবার রাতেও বিভিন্ন ইউনিয়নে, বিশেষ করে নিম্নবিত্ত ও সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বসবাসের এলাকায় অর্থের বিনিময়ে ভোট কেনার প্রস্তুতি চলছে বলে তারা বিভিন্ন মাধ্যমে খবর পেয়েছেন। প্রশাসনের প্রতি এসব অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে কোনো ভোটার যেন অর্থ, প্রলোভন কিংবা ভয়ভীতির কারণে নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগ থেকে বিরত না থাকেন, তা নিশ্চিত করার দাবি জানান।
সংবাদ সম্মেলনে দেলাওয়ার হোসেন অভিযোগ করেন, গত ৮ অক্টোবর প্রতীক বরাদ্দের পর থেকে সরকার দলীয় প্রার্থী বিএনপির মির্জা ফয়সল আমিনের সমর্থকদের একটি অংশ পেশিশক্তি ও দলীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে নির্বাচনী কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। তার দাবি, প্রতীক বরাদ্দের আগেই বিএনপির প্রার্থীর ব্যানার ও ফেস্টুনে ঠাকুরগাঁও শহরের বিভিন্ন স্থান ছেয়ে ফেলা হয়।
ভোটার, ভোটকর্মী ও সাধারণ মানুষের বাড়িতে গিয়ে হুমকি দেওয়ার অভিযোগও তোলেন তিনি। এ ছাড়া কয়েকজন কৃষি কর্মকর্তার সঙ্গে বিএনপির প্রার্থীর গোপন বৈঠক, নির্বাচনী প্রচারণায় ব্রিজ নির্মাণের প্রতিশ্রুতি, ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে অনুদান দেওয়ার আশ্বাস এবং একজন সরকারি চাকরিজীবীর প্রচারণায় অংশ নেওয়ার অভিযোগ তুলে ধরেন তিনি।
দেলাওয়ার হোসেনের অভিযোগ, গত ১৩ অক্টোবর ঠাকুরগাঁও পৌরসভার পাঁচ নম্বর ওয়ার্ডে এশার নামাজের পর ভোটার ও দোকানদারদের সঙ্গে গণসংযোগের সময় তাকে বাধা দেওয়া ও লাঞ্ছিত করা হয়। ২০ অক্টোবর রুহিয়া উপজেলার দুই নম্বর আখানগর ইউনিয়নে নির্বাচনী বৈঠক শেষে তাদের ওপর হামলা চালানো হয়। এতে তাদের একজন কর্মী গুরুতর আহত হন এবং ডেকোরেশনের চেয়ার ভাঙচুর করা হয় বলে দাবি করেন তিনি।
এ ছাড়া ২১ অক্টোবর সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয়ের বড় মাঠে তাদের নির্বাচনী জনসভার মঞ্চ তৈরির সময় সরকারদলীয় ব্যানার ও ফেস্টুন দিয়ে মাঠের বিভিন্ন অংশ ঘিরে ফেলার অভিযোগ করেন জামায়াতের প্রার্থী। পরে রিটার্নিং কর্মকর্তার হস্তক্ষেপে সমাবেশের আগের রাতে সেগুলো সরানো হয় বলে জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে নারী কর্মীর পরিবারকে হুমকি এবং আরেক কর্মীর বাসায় গিয়ে সশস্ত্র ব্যক্তিদের প্রচারণা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগও তোলেন দেলাওয়ার হোসেন। তার দাবি, এসব ঘটনায় নির্বাচনী এলাকায় আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
সরকারি প্রতিষ্ঠান ও সম্পদ নির্বাচনী কাজে ব্যবহারের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, ২৭ অক্টোবর সকাল ৮টায় প্রচারণার সময়সীমা শেষ হওয়ার পর স্থানীয় এনজিও ইএসডিওর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একত্র করে ধানের শীষের পক্ষে কাজ করার নির্দেশনা দিয়েছেন বলে তারা অভিযোগ পেয়েছেন। এ ছাড়া ২৪ ও ২৫ অক্টোবর ঠাকুরগাঁও সদর হাসপাতালের প্রায় ২৪ জন সরকারি চিকিৎসককে দিয়ে তিনটি মেডিকেল ক্যাম্প পরিচালনার অভিযোগও করেন তিনি।
দেলাওয়ার হোসেন বলেন, ২৮ অক্টোবর ‘মানব কল্যাণ’-এ সরকারি কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি বৈঠক ও আপ্যায়নের আয়োজন করা হয়েছে বলে তারা অভিযোগ পেয়েছেন। এসব অভিযোগের বিষয়ে ভিডিও ফুটেজ, স্থিরচিত্র ও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক প্রমাণ রিটার্নিং কর্মকর্তা এবং জুডিশিয়াল ইনকোয়ারি কমিটির কাছে জমা দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে জামায়াতের প্রার্থী বলেন, তাদের অভিযোগের ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপের ঘাটতি রয়েছে। তাদের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা ও নির্বাচনী বৈঠকে চেয়ার ভাঙচুরের অভিযোগে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে দাবি করেন তিনি। অভিযোগের ক্ষেত্রে দল-মত নির্বিশেষে একই মানদণ্ড অনুসরণ এবং প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
ভোটারদের নির্ভয়ে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে দেলাওয়ার হোসেন বলেন, ভোটারদের ভোটাধিকার রক্ষার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের। প্রতিটি কেন্দ্রে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ভোটাররা কোনো চাপ বা ভয়ভীতি ছাড়াই নিজেদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারেন।
নির্বাচন বর্জনের কোনো পরিকল্পনা আছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তারা নির্বাচন বর্জন করতে আসেননি; প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে এবং শেষ পর্যন্ত মাঠে থাকতে চান। প্রশাসনের প্রস্তুতির কথা বিবেচনায় তারা এখনো আস্থা রাখছেন। তবে ১৯৯৪ সালের মাগুরা নির্বাচনের মতো পরিস্থিতি তৈরি হলে তাৎক্ষণিক অবস্থা বিবেচনায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
ভোটার উপস্থিতি নিয়েও উদ্বেগের কথা জানান জামায়াতের এই প্রার্থী। তার মতে, উপনির্বাচন হওয়ায় ঢাকার বাইরে থাকা অনেক ভোটারের আগ্রহ কম থাকতে পারে। পাশাপাশি বাড়িতে গিয়ে হুমকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগের কারণে ভোটাররা নির্বিঘ্নে কেন্দ্রে আসতে পারবেন কি না, তা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে।
সংখ্যালঘু ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে আসতে বাধা দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে বিএনপির অভিযোগের জবাবে দেলাওয়ার হোসেন বলেন, এ অভিযোগ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব নাগরিকের নিরাপদে ভোট দেওয়ার অধিকার রয়েছে। সনাতন ধর্মাবলম্বীসহ সব ভোটারকে নির্ভয়ে কেন্দ্রে এসে নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগের আহ্বান জানান তিনি।
জামায়াতের প্রার্থী বলেন, এই নির্বাচন শুধু একটি আসনের জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের বিষয় নয়, বরং নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠারও পরীক্ষা। দলীয় সরকারের অধীনেও অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব- আগামীকালের ভোটের মাধ্যমে সেই দৃষ্টান্ত স্থাপনের দায়িত্ব প্রশাসনের।
প্রতিনিধি/এসআই