জেলা প্রতিনিধি
২৮ অক্টোবর ২০২৬, ০১:২৪ পিএম
পিরোজপুর সদর উপজেলার শংকরপাশা ইউনিয়নের চিতলিয়া গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর (৮৭) মৃত্যু ও দাফন ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জামায়াতে ইসলামীর প্রয়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে করা মামলার বাদী ও রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান সাক্ষী ছিলেন তিনি। তার মরদেহে রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদানের বিরোধিতা, দাফনে বাধা দেওয়ার অভিযোগ, কবর ভরাট এবং গভীর রাতে পরিবারের নারী সদস্যদের কবর খোঁড়ার ঘটনা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা চলছে। এ ঘটনায় স্থানীয় জামায়াত নেতাকর্মীদের ভূমিকা খতিয়ে দেখতে দুই সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে দলটির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব।
ঘটনাটি ঘিরে মানিক পশারীর মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি ও মুক্তিযোদ্ধা। অন্যদিকে, তার পরিবারের সদস্যদের বক্তব্যে উঠে এসেছে রাজনৈতিক মতপার্থক্য ও নানা অভিযোগ। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া গেলে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র স্পষ্ট হবে।

টুঙ্গিপাড়া থেকে পিরোজপুরে মরদেহ
পরিবারের তথ্য অনুযায়ী, গত শনিবার (২৪ অক্টোবর) সকালে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় মেয়ের জামাইয়ের বাড়িতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান মানিক পশারী। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি নিজ এলাকা ছেড়ে টুঙ্গিপাড়ায় আশ্রয় নিয়েছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরদিন তার মরদেহ পিরোজপুর সদর উপজেলা পরিষদ চত্বরে আনা হলে সেখানে উত্তেজনা দেখা দেয়। স্থানীয় জামায়াত-সমর্থকেরা তার মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদানের বিরোধিতা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

গার্ড অব অনার নিয়ে আপত্তি
মরদেহ উপজেলা পরিষদ চত্বরে আনার পর মানিক পশারী প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা নন—এমন দাবি তুলে প্রতিবাদ করা হয়। পরে পুলিশ ও প্রশাসনের হস্তক্ষেপে বিকেল ৫টার দিকে পুলিশ লাইনসের ভেতরে নিরাপত্তার মধ্যে তাকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়।
পিরোজপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য ও প্রয়াত দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ছেলে মাসুদ সাঈদী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে দাবি করেন, মানিক পশারীর জানাজা বা দাফনের বিরোধিতা তাদের ছিল না; তাদের আপত্তি ছিল রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদানের বিষয়ে।

তার অভিযোগ, মানিক পশারী প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন না। তৎকালীন সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এ কে এম এ আউয়ালের দেওয়া ডিও লেটারের ভিত্তিতে তার নাম মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় মানিক পশারী নিজে সরাসরি যুদ্ধে অংশ না নেওয়ার কথা স্বীকার করেছিলেন বলেও দাবি করেন মাসুদ সাঈদী।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট নথি, মুক্তিযোদ্ধা তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়া এবং ট্রাইব্যুনালে দেওয়া সাক্ষ্যের নির্ভরযোগ্য রেকর্ড যাচাই করা প্রয়োজন।

মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য
স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রাজ্জাক ও আব্দুস সালাম বাতেনসহ কয়েকজন মানিক পশারীর মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের কেউ কেউ তাকে ‘ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা’ বলেও অভিহিত করেছেন।
আব্দুস সালাম বাতেনের দাবি, সাঈদীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেওয়ার পুরস্কার হিসেবে মানিক পশারীকে মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। তার বক্তব্যে সাঈদীর পক্ষে অবস্থান নেওয়ার কথাও উঠে এসেছে।
স্থানীয় কয়েকজনের অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়াই মানিক পশারীকে মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। তবে এসব বক্তব্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দাবি; সরকারি নথি ও স্বাধীন যাচাই ছাড়া এগুলোকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।

পরিবারের সদস্যদের বক্তব্যে ভিন্নতা
মানিক পশারীর মৃত্যুর পর তার পরিবারের কয়েকজন সদস্যের বক্তব্য নিয়েও আলোচনা তৈরি হয়েছে।
তার ছোট বোন হেনা পশারী গণমাধ্যমের কাছে প্রয়াত জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে ‘আল্লাহর ওলি’ বলে উল্লেখ করেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, মানিক পশারী কেন সাঈদীর বিরুদ্ধে মামলায় যুক্ত হয়েছিলেন, তা নিয়ে পরিবারের সদস্যরা কখনো তার সঙ্গে আলোচনা করেননি।
মানিক পশারীর ছোট ভাই চাঁন মিয়া পশারীর একটি পুরোনো সাক্ষাৎকারে দাবি করা হয়, তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতা এ কে এম এ আউয়ালের আর্থিক প্রলোভন ও প্ররোচনায় তার বড় ভাই সাঈদীর বিরুদ্ধে মামলা ও সাক্ষ্য দিয়েছিলেন। সাঈদীর পক্ষে কথা বলার কারণে মানিক পশারী তাকে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেননি বলেও অভিযোগ করেন চাঁন মিয়া।
অন্যদিকে, মানিক পশারীর আরেক বোন হাসিনা পশারী তাদের পরিবার ও এলাকার মানুষের আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততার কথা বলেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

পরিবারের সদস্যদের এসব বক্তব্যের সত্যতা ও প্রেক্ষাপট যাচাই করা প্রয়োজন। বিশেষ করে আর্থিক লেনদেন, রাজনৈতিক প্ররোচনা এবং মিথ্যা সাক্ষ্যের অভিযোগের পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ ছাড়া কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সমীচীন নয়।
কবর ভরাটের অভিযোগ, গভীর রাতে দাফন
মানিক পশারীর দাফন ঘিরে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি হলো কবর খোঁড়া ও পরে তা ভরাট করার অভিযোগ।
স্থানীয় গ্রাম পুলিশ মতিউর রহমানের ভাষ্য অনুযায়ী, শনিবার দুপুরে কবর খোঁড়া হলেও মাগরিবের পর কে বা কারা সেটি মাটি দিয়ে ভরাট করে দেয়। পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নির্দেশে রাতে আবার কবর খোঁড়া হয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ভীতির কারণে স্থানীয় অনেকেই দাফনের কাজে এগিয়ে আসেননি। এ অবস্থায় মানিক পশারীর তিন বোন—হেনা, হাসিনা ও বুড়ি পশারী—এবং স্থানীয় রিয়াজ নামের এক ব্যক্তি গভীর রাতে মোবাইল ফোনের আলোয় কবর খোঁড়ার কাজে অংশ নেন। পরে পুলিশি নিরাপত্তায় দাফন সম্পন্ন হয়।
পরিবারের কয়েকজন সদস্যের অভিযোগ, দাফনের সময় তাদের মরদেহ পুড়িয়ে ফেলা, আটকে রাখা এবং বাড়িতে যেতে না দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছিল। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের ফল জানা যায়নি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, মরদেহ রাত ১টার দিকে চিতলিয়ার বাড়িতে পৌঁছায় এবং রাত ২টার দিকে দাফন সম্পন্ন হয়। পিরোজপুরে জানাজা হয়নি বলে স্থানীয়দের দাবি। পরিবারের ভাষ্য, টুঙ্গিপাড়ায় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

দাফনে বাধার অভিযোগ তদন্তে জামায়াতের কমিটি
মানিক পশারীর দাফন ঘিরে বাধা দেওয়ার অভিযোগ ও দেশজুড়ে সমালোচনার পর বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের এক বিশেষ বৈঠকে দুই সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে গঠিত কমিটিতে রয়েছেন কেন্দ্রীয় নেতা সাইফুল আলম খান মিলন ও নূরুল ইসলাম বুলবুল।
কমিটিকে তিন দিনের মধ্যে নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় নেতাকর্মীদের কেউ এ ঘটনায় জড়িত ছিলেন কি না, তা খতিয়ে দেখতে স্থানীয় সংগঠনকে তদন্তে সহযোগিতা করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
এর আগে পিরোজপুর জেলা জামায়াতের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল, দাফনে তারা বাধা দেয়নি; বরং পুলিশ প্রশাসনকে সহযোগিতা করেছে।
শিক্ষক সমাজের নিন্দা

একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার দাফনে বাধা দেওয়ার অভিযোগে নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজ। সংগঠনটি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে।
তদন্তেই স্পষ্ট হতে পারে ঘটনার প্রকৃত চিত্র
মানিক পশারীর মৃত্যু ও দাফন ঘিরে রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদানের বিরোধিতা, তার মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন, পরিবারের সদস্যদের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য এবং দাফনে বাধা দেওয়ার অভিযোগ—সব মিলিয়ে ঘটনাটি রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

তবে অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগের বাইরে গিয়ে ঘটনার প্রকৃত চিত্র জানতে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তার স্বীকৃতির নথি, সংশ্লিষ্ট মামলায় দেওয়া সাক্ষ্য, কবর ভরাট ও দাফনে বাধার অভিযোগ এবং প্রশাসনের ভূমিকা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। জামায়াতের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের বক্তব্য এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
প্রতিনিধি/এসএস