উপজেলা প্রতিনিধি
২৮ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৪৭ এএম
আকাশে একসময় শত শত রঙিন ফানুসের আলোয় মুখর হয়ে উঠত কুয়াকাটার রাখাইন পল্লীগুলো। উৎসবকে ঘিরে বৌদ্ধবিহারগুলোতে থাকত মানুষের ঢল, ঘরে ঘরে বিরাজ করত আনন্দের আমেজ। তবে সময়ের পরিবর্তনে সেই চেনা দৃশ্য অনেকটাই ম্লান হয়ে এসেছে। ধর্মীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা বজায় রেখে এবারও পটুয়াখালীর কুয়াকাটা ও কলাপাড়া উপজেলার বিভিন্ন বৌদ্ধবিহারে উদযাপিত হচ্ছে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব প্রবারণা পূর্ণিমা। কিন্তু আগের মতো বর্ণিল আয়োজন আর চোখে পড়ছে না। কোথাও সীমিতসংখ্যক ফানুস ওড়ানোর প্রস্তুতি, আবার কোথাও উৎসবের আয়োজন একেবারেই সীমিত।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সকালে বিভিন্ন বৌদ্ধবিহারে বুদ্ধপূজা, পঞ্চশীল ও উপোসথ শীল গ্রহণের মধ্য দিয়ে শুরু হয় দিনের আনুষ্ঠানিকতা। দিনভর চলে ধর্মীয় দেশনা, সংঘদান, পিঠা নিবেদন, পবিত্র ত্রিপিটক পাঠ ও বিশ্বশান্তি কামনায় সমবেত প্রার্থনা। সন্ধ্যায় প্রদীপ প্রজ্বালন ও আকাশে রঙিন ফানুস ওড়ানোর মধ্য দিয়ে উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ উদযাপনের আয়োজন করা হয়েছে। স্থানীয়ভাবে দুই দিন ধরে চলছে উৎসবের বিভিন্ন কর্মসূচি।
উৎসব উপলক্ষে কুয়াকাটা ও আশপাশের রাখাইন পল্লীগুলোতে ধর্মীয় আবহ বিরাজ করছে। বিভিন্ন বৌদ্ধবিহারে সমবেত হচ্ছেন রাখাইন নারী-পুরুষ। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কলাপাড়া উপজেলায় থাকা ১৩টি রাখাইন পল্লীর প্রায় অর্ধেকেই এবার সীমিত পরিসরে প্রবারণা পূর্ণিমা উদযাপিত হচ্ছে। কোনো কোনো পল্লীতে অল্পসংখ্যক ফানুস ওড়ানোর প্রস্তুতি রয়েছে, আবার কোথাও উৎসবের আয়োজন খুবই সীমিত।
নবীনপুরের ষাটোর্ধ্ব বাসিন্দা মো. সেরাজুল ইসলাম বলেন, ‘ছোটবেলায় দেখেছি, প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষে রাখাইন পল্লীগুলোতে ব্যাপক উৎসব হতো। শত শত ফানুসে রাতের আকাশ আলোকিত হয়ে উঠত। এখন আর আগের মতো সেই দৃশ্য দেখা যায় না।’
কেরানিপাড়ার মাতুব্বর উংচং উচো বলেন, ‘আমরা নিজেদের জায়গা থেকে উৎসবটি ধরে রাখার চেষ্টা করছি। তবে আমাদের সংখ্যা কমে যাওয়ায় আয়োজনও ছোট হয়ে গেছে। আগে রাখাইন পল্লীগুলোতে অনেক মানুষ ছিলেন। সবাই মিলে বড় পরিসরে উৎসব উদযাপন করতেন। এখন সেই পরিস্থিতি নেই। তারপরও নিজেদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখতে আমরা সাধ্যমতো চেষ্টা করে যাচ্ছি।’
কুয়াকাটা কেন্দ্রীয় শ্রীমঙ্গল বৌদ্ধবিহারের অধ্যক্ষ ভদন্ত ইন্দ্রবংশ থেরো জানান, সকালে বিহারে রাখাইন নারীরা উপস্থিত হয়ে পঞ্চশীল ও উপোসথ শীল গ্রহণ করেন। এরপর ধর্মীয় দেশনা, পিঠা নিবেদন ও সবার মঙ্গল কামনায় সমবেত প্রার্থনা অনুষ্ঠিত হয়। সন্ধ্যায় প্রদীপ প্রজ্বালন ও ফানুস ওড়ানোর আয়োজন রয়েছে। প্রথম রাতে ১০ থেকে ১২টি ফানুস ওড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানান তিনি।
মিশ্রিপাড়া বৌদ্ধবিহারের অধ্যক্ষ উত্তম ভিক্ষু বলেন, সকালে ধর্মীয় প্রার্থনা ও শীল গ্রহণের মধ্য দিয়ে তাঁদের বিহারে উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে। দিনভর ধর্মীয় আয়োজনের পাশাপাশি সন্ধ্যায় ঐতিহ্যবাহী ফানুস উৎসব অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
বেতকাটা রাখাইন পল্লীর ধর্ম বিজয় বৌদ্ধবিহারের সভাপতি মংচো জানান, তাঁদের পল্লীতে প্রথম রাতে ১০ থেকে ১২টি ফানুস ওড়ানোর প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। গোড়া আমখোলা রাখাইন পল্লীর বিজয়রামা বৌদ্ধবিহারের অধ্যক্ষ সুচিন্ত মহাথেরো জানান, তাঁদের বিহারেও অন্তত ১০টি ফানুস ওড়ানো হবে। অন্যদিকে, দিয়রামখোলা পাড়ায় মাত্র চারটি রাখাইন পরিবারের বসবাস থাকলেও সেখানে চার থেকে পাঁচটি ফানুস ওড়ানোর প্রস্তুতি রয়েছে।
কুয়াকাটা রাখাইন পল্লী মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান মিরাজ বলেন, ‘প্রবারণা পূর্ণিমা কুয়াকাটার রাখাইন সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় উৎসব। এ উৎসব দেখতে প্রতিবছর পর্যটকদের মধ্যে আগ্রহ থাকে। ফানুস ওড়ানোর ঐতিহ্য কুয়াকাটার পর্যটন আকর্ষণকেও সমৃদ্ধ করে। তবে আগের মতো বড় পরিসরে উৎসব না হওয়ায় পর্যটকদের জন্য সেই বর্ণিল আয়োজন দেখার সুযোগ কমে গেছে। রাখাইনদের ঐতিহ্য ধরে রাখতে সম্মিলিত উদ্যোগ ও পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন। তাহলে উৎসবটি আবারও দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।’
মহিপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শামীম হাওলাদার বলেন, প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষে থানার আওতাধীন বিভিন্ন বৌদ্ধবিহার পরিদর্শন করা হয়েছে। পাশাপাশি পুলিশি টহল জোরদার রাখা হয়েছে। উৎসব নির্বিঘ্নে উদযাপন নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আরিফুজ্জামান বলেন, রাখাইন সম্প্রদায় যাতে নির্বিঘ্নে প্রবারণা পূর্ণিমা উদযাপন করতে পারে, সে জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। উৎসব আয়োজনেও সরকারের পক্ষ থেকে সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
প্রতিনিধি/ইএইচ