Dhaka Mail Logo

সারাদেশ

বাইরে পুরুষ, ভেতরে নারী: দিনাজপুরের ঐতিহ্যবাহী ‘বউমেলা’য় উৎসবের আমেজ

জেলা প্রতিনিধি

২৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৩২ পিএম

মেলার প্রধান ফটকের সামনে থামছে একের পর এক মোটরসাইকেল, সাইকেল, অটোরিকশা ও চার্জারভ্যান। স্বামী কিংবা পরিবারের পুরুষ সদস্যরা সঙ্গে করে নিয়ে আসছেন স্ত্রী, মা, বোন ও সন্তানদের। ফটকে নামিয়ে দিচ্ছেন তাদের। এরপর নারীরা প্রবেশ করছেন মেলার ভেতরে, আর পুরুষরা অপেক্ষা করছেন বাইরে। কেউ দাঁড়িয়ে আছেন গেটের পাশে, কেউবা গল্পে মেতেছেন পরিচিতজনদের সঙ্গে। স্ত্রী-সন্তানদের মেলা ঘুরে দেখা শেষ হলে আবার তাদের নিয়ে ফিরবেন বাড়িতে।

দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলার সুজাপুর সার্বজনীন দুর্গামন্দির প্রাঙ্গণে সোমবার (২৬ অক্টোবর) দেখা গেল এমনই দৃশ্য। মেলার ভেতরে নারী ও শিশুদের সরব উপস্থিতি, কেনাকাটা আর আনন্দ-উচ্ছ্বাস। তবে পুরুষদের প্রবেশের অনুমতি নেই। ব্যতিক্রমী এই আয়োজনের নাম ‘বউমেলা’। দীর্ঘ ৭০ বছরের ঐতিহ্য ধারণ করে প্রতিবছর লক্ষ্মীপূজার পরদিন বসে এই মেলা।

02

দেখতে আর দশটা মেলার মতোই। সারি সারি দোকান, বাহারি খাবার, শিশুদের খেলনা, নারীদের প্রসাধনী, হস্তশিল্প, গৃহস্থালির প্রয়োজনীয় সামগ্রী সবই আছে এখানে। তবে অন্য মেলার সঙ্গে এর মূল পার্থক্য হলো- নির্দিষ্ট সময়ে মেলায় দর্শনার্থী ও ক্রেতা হিসেবে প্রবেশ করতে পারেন শুধু নারী ও শিশুরা। পুরুষরা বাইরে থেকেই উপভোগ করেন এই আয়োজন। নারীদের জন্য আলাদা করে রাখা এই পরিসরই ‘বউমেলা’কে দিয়েছে স্বতন্ত্র পরিচয়।

সোমবার দুপুরের পর থেকেই জমে ওঠে মেলা। সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে কেনাকাটা আর ঘোরাঘুরি। 

সরেজমিনে দেখা যায়, মেলায় বসেছে শতাধিক দোকান। কোথাও সাজানো প্রসাধনীসামগ্রী, কোথাও শিশুদের খেলনা, আবার কোথাও গৃহস্থালির তৈজসপত্র, ঘর সাজানোর উপকরণ ও বাহারি খাবার। পছন্দের জিনিস কিনতে দোকানে দোকানে ভিড় করছেন নারীরা। শিশুদের চোখে-মুখেও আনন্দের ছাপ।

03

মেলায় পুরুষদের প্রবেশ নিষিদ্ধ হলেও দোকানিদের মধ্যে রয়েছেন পুরুষ বিক্রেতারাও। তারা দোকানে পসরা সাজিয়ে বিক্রি করছেন নানা পণ্য। তবে দর্শনার্থী হিসেবে পুরুষদের ভেতরে প্রবেশের অনুমতি নেই। ফলে মেলার প্রধান ফটকের বাইরেও তৈরি হয়েছে আলাদা এক জগৎ। সেখানে কেউ স্ত্রী-সন্তানের জন্য অপেক্ষা করছেন, কেউ পরিচিতজনদের সঙ্গে গল্প করছেন, আবার কেউ নারীদের নিরাপদে প্রবেশ ও বের হওয়ার বিষয়টি খেয়াল রাখছেন।

মেলায় ঘুরতে আসা আশা রানী বলেন, ‘এই মেলা আমাদের নারীদের জন্য। তাই এখানে এলে আলাদা একটা অনুভূতি কাজ করে। দূর-দূরান্ত থেকে আত্মীয়-স্বজনও আসেন। মেলায় অনেকের সঙ্গে দেখা হয়, ভাববিনিময় হয়। মেলা মানেই মিলনস্থল।’

বিউটি সরকার বলেন, ‘আমরা অনেক কিছু কেনাকাটা করেছি। এই মেলায় আসতে ভালো লাগে। কোনো ধরনের সমস্যা হয় না। এক কথায়, সারা বছর এই মেলার জন্য অপেক্ষায় থাকি। তবে আমার স্বামীকে বাইরে রেখে আসতে হয়েছে।’

বালা রানী দাস বলেন, ‘মেলায় এসেছি। এটি শুধু মেয়েদের জন্য আয়োজন করা হয়। এখানে মেয়েদের প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে, এটা ভেবে গর্ববোধ করছি। দাদার সঙ্গে এসেছি। তিনি বাইরে আছেন, আমাকে নিয়ে আবার বাড়িতে যাবেন।’

মেলার বাইরে থাকা অভিভাবক শিবেন সরকার বলেন, ‘স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে এসেছি। তাদের ভেতরে দিয়ে আমি বাইরে অপেক্ষা করছি। আমরা যারা পুরুষ আছি, তারাও এই মেলা বেশ উপভোগ করি। কোনো রকম ঝুট-ঝামেলা নেই।’

04

অরুণ রায় বলেন, ‘আমরা মেলায় একপ্রকার পাহারা দিই, যাতে বাইরের কোনো পুরুষ ভেতরে প্রবেশ করতে না পারেন। এই একটি দিন নারীদের স্বাধীনভাবে মেলায় প্রবেশ করে ইচ্ছেমতো ঘোরার সুযোগ থাকে। তাদের প্রাধান্য দিতে পেরে আমাদেরও ভালো লাগে।’

মেলার ব‌্যবসায়ী হরমুজ আলী বলেন, ‘প্রায় ২০ বছর ধরে এই মেলায় হাওয়াই মিঠাই বিক্রি করি। দুপুর ২টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত শুধু নারীরা প্রবেশ করতে পারেন। রাতে সবার জন্য মেলা উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। ছোট পরিসরে হলেও মেলাটির পরিবেশ সুন্দর।’

সুজাপুর সার্বজনীন দুর্গাপূজা ও বউমেলার সাধারণ সম্পাদক সুজন সরকার ব‌লেন, ‘প্রায় ৭০ বছর ধরে এই বউমেলা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। জমিদার ক্ষিতীশ সরকার রায়ের সময় চাঁদপাড়ায় এ মেলার আয়োজন করা হতো। তখন দুর্গামন্দিরটিও সেখানে অবস্থিত ছিল। দুর্গাপূজার পাঁচ দিন পর লক্ষ্মীপূজা অনুষ্ঠিত হয়। লক্ষ্মীপূজার পরদিন বসে ঐতিহ্যবাহী এই বউমেলা। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই ঐতিহ্য আমরা ধরে রেখেছি। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছেও এই ঐতিহ্য তুলে ধরতে চাই।’

প্রতিনিধি/এলএ