জেলা প্রতিনিধি
২৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:৫২ পিএম
বিদেশে চাকরি করে সংসারে সচ্ছলতা ফেরানোর স্বপ্ন ছিল ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার যুবক রাজু মাতুব্বরের (২৮)। সেই স্বপ্ন নিয়ে গত ৮ মে দেশ ছাড়েন তিনি। তবে পরিবারের অভিযোগ, রাশিয়ায় চাকরির কথা বলে তাকে ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়েছে। এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে রাজুর মৃত্যুর খবর। এতে উদ্বেগ ও শোকের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে তার পরিবার। তবে এখনো তার মৃত্যুর বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
রাজু মাতুব্বর ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার মাঝিকান্দা গ্রামের নান্নু মাতুব্বরের ছেলে। তার আড়াই বছর বয়সী একটি ছেলে ও এক বছর বয়সী একটি মেয়ে রয়েছে। রাজুর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে তার স্ত্রী শারমিন আক্তার দুই সন্তানকে নিয়ে দিশাহারা। ছেলের ছবি হাতে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন বাবা নান্নু মাতুব্বর ও মা রাজিয়া বেগম।
রাশিয়ায় পাঠানোর নামে সাড়ে ১৪ লাখ টাকার চুক্তি, প্রতারণার অভিযোগ
রাজুর পরিবারের অভিযোগ, প্রতিবেশী কফাইবালিয়া গ্রামের প্রিন্স মাতুব্বর ও তার ছোট ভাই রানা মাতুব্বরের মাধ্যমে সাড়ে ১৪ লাখ টাকায় রাজুকে রাশিয়ায় পাঠানোর চুক্তি হয়। এর মধ্যে সাড়ে চার লাখ টাকা নগদ পরিশোধ করা হয়েছিল। বাকি ১০ লাখ টাকা রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর দেওয়ার কথা ছিল।
কিন্তু রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কোনো চাকরি পাননি রাজু। পরিবারের দাবি, তাকে ৩০ লাখ টাকার বিনিময়ে ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে বা সেখানে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় প্রিন্স ও রানার বিরুদ্ধে মানবপাচার ও প্রতারণার অভিযোগ তুলেছেন স্বজনেরা।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন রানা মাতুব্বর। তার দাবি, রাশিয়ায় যাওয়ার ঝুঁকি সম্পর্কে রাজুকে আগেই সতর্ক করা হয়েছিল। রাজু নিজেই রাশিয়ায় অবস্থানরত প্রিন্সের সঙ্গে যোগাযোগ করে সেখানে গেছেন। প্রতারণা করে তাকে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর অভিযোগ সঠিক নয়।
রাশিয়ায় অবস্থানরত প্রিন্স মাতুব্বরের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

ফেসবুক ভিডিওতে মৃত্যুর দাবি, নিশ্চিত নয় পরিবার
গত শনিবার (২৪ অক্টোবর) রাতুল নামের এক যুবকের প্রকাশ করা একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ওই ভিডিওতে রাজুর মৃত্যুর দাবি করা হয়।
রাজুর ছোট ভাই রাজন মাতুব্বর জানান, ভিডিওটি দেখার পর তারা রাতুলের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। রাতুলও রাজুর মৃত্যুর কথা নিশ্চিত করেছেন বলে তিনি জানান। তবে কীভাবে, কখন বা কোথায় রাজুর মৃত্যু হয়েছে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লেও রাজুর প্রকৃত অবস্থা নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি।
স্বামীর সন্ধান চান স্ত্রী, মরদেহ ফেরাতে পরিবারের আকুতি
রাজুর মৃত্যুর খবর শুনলেও এখনো নিশ্চিত হতে পারেননি তার বাবা-মা। স্বামীর প্রকৃত অবস্থা জানতে চান স্ত্রী শারমিন আক্তার। তিনি স্বামীকে ফিরে পাওয়ার আকুতি জানিয়েছেন।
শারমিন বলেন, “ছোট ছোট দুই সন্তান এখনো বোঝে না তাদের বাবার কী হয়েছে। আমি আমার স্বামীর সন্ধান চাই এবং এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই।”
রাজুর মৃত্যুর খবর সত্য হলে তার মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দারা।
প্রশাসনের বক্তব্য
এ বিষয়ে ফরিদপুরের সহকারী পুলিশ সুপার (নগরকান্দা সার্কেল) মোহাম্মদ আল ফাহাদ জানান, বিদেশে চাকরির নামে প্রতারণার বিষয়ে সাধারণ মানুষকে সচেতন করা হচ্ছে। রাজুর ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নগরকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রেজওয়ানা আফরিন বলেন, “রাজুর মৃত্যুর খবর গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখেছি। বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার জন্য খোঁজখবর নিচ্ছি। রাজুর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে এবং অন্যান্য মাধ্যমে তথ্য যাচাইয়ের চেষ্টা করছি। ঘটনা সত্য হলে বিধি মোতাবেক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
প্রতিনিধি/এসএস