জেলা প্রতিনিধি
২৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:১৬ পিএম
নেত্রকোনার আটপাড়ায় দৈনিক কালের কণ্ঠের জেলা প্রতিনিধি ইবাদ হোসেনকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় একটি নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক চুন্নু খানের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা চেয়ে থানায় লিখিত অভিযোগ করেছেন ওই সাংবাদিক।
অভিযোগের পর চুন্নু খান নিজেকে উপজেলা বিএনপির সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য বলে দাবি করেন। তবে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম হিলালী জানিয়েছেন, চুন্নু খানের দলের কোনো পদ নেই, এমনকি তিনি বিএনপির সাধারণ সদস্যও নন।
শনিবার (২৪ অক্টোবর) চুন্নু খান ও সাংবাদিক ইবাদ হোসেনের কথোপকথনের একটি অডিও রেকর্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ওই অডিওতে চুন্নু খানকে অশালীন ভাষায় গালাগাল ও প্রাণনাশের হুমকি দিতে শোনা যায় বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে চুন্নু খানের দাবি, অডিওটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। তিনি কাউকে হুমকি দেননি।
চুন্নু খানের অভিযোগ, সাংবাদিক ইবাদ হোসেন তার এক আত্মীয়ের জমি দখল করে রাস্তা নির্মাণ করেছেন। এ নিয়ে আলোচনায় বসতে চাইলেও ইবাদ রাজি হননি।
চুন্নু খান আটপাড়া উপজেলার বানিয়াজান গ্রামের বাসিন্দা। তিনি স্থানীয় একটি এমপিওভুক্ত নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক। অন্যদিকে ইবাদ হোসেন আটপাড়া উপজেলা সদরের পোস্ট অফিস রোড এলাকার বাসিন্দা।
বিএনপির পদ নিয়ে বিতর্ক
স্থানীয় সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম হিলালী বলেন, “সাংবাদিক ইবাদকে হুমকি দেওয়ার বিষয়টি গণমাধ্যমে দেখেছি। পরে তার সঙ্গে ফোনে কথা বলেছি। তাকে ন্যায়বিচার পাওয়ার আশ্বাস দিয়েছি। একজন সাংবাদিককে হুমকি দেওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়। তাকে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে।”
চুন্নু খানের রাজনৈতিক পরিচয় সম্পর্কে তিনি বলেন, “চুন্নু খান দলের কোনো পদে নেই। এমনকি দলের সাধারণ সদস্যপদও তার নেই।”
বিষয়টি জানতে চাইলে জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর কবির আহাম্মদ বলেন, তিনি এখনো অডিও রেকর্ডটি শোনেননি। তবে একজন শিক্ষক হিসেবে কাউকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বিষয়টি তদন্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রাস্তা নিয়ে বিরোধ
স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, আটপাড়া উপজেলা সদরের পোস্ট অফিস রোড এলাকায় সাংবাদিক ইবাদ হোসেনসহ ৮ থেকে ১০টি পরিবারের বাড়ি থেকে প্রধান সড়কে যাওয়ার একমাত্র রাস্তাটি প্রায় ১৪ থেকে ১৫ বছর ধরে ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রায় সাত থেকে আট বছর আগে পরিবারগুলো চলাচলের সুবিধার্থে এক শতক জমি কেনে।
সম্প্রতি স্থানীয় বাসিন্দাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর (এলজিইডি) দুই মাস আগে রাস্তাটিতে ইটের সলিং করে। এর প্রায় এক মাস পর রাস্তার পাশের জমির মালিক শাহীন সুলতানা সুমি রাস্তাটির জমি নিজেদের বলে দাবি করেন। পরে তার চাচাতো ভাই চুন্নু খানসহ স্থানীয় কয়েকজন রাস্তাটি দখলে নেওয়ার চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ নিয়ে রাস্তা ব্যবহারকারী পরিবারগুলো আদালতের শরণাপন্ন হলে আদালত রাস্তাটির ওপর অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। তবে নিষেধাজ্ঞার পরও চুন্নু খান প্রভাব খাটিয়ে রাস্তাটি বন্ধ করে দেন বলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগীরা। এতে ৮ থেকে ১০টি পরিবারের সদস্যরা প্রায় ২৪ ঘণ্টা অবরুদ্ধ অবস্থায় ছিলেন। পরে উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশের সহযোগিতায় রাস্তাটি খুলে দেওয়া হয়।
সাংবাদিক ইবাদ হোসেনের অভিযোগ, রাস্তা খুলে দেওয়ার পর থেকেই চুন্নু খান তাকে প্রাণনাশের হুমকি ও অশালীন ভাষায় গালাগাল করছেন। একই সঙ্গে সামরিক বাহিনীতে কর্মরত তার ছোট ভাইকে চাকরি থেকে অপসারণ এবং আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদফতরে (আইএসপিআর) অভিযোগ করার হুমকিও দেওয়া হচ্ছে। এসব কথোপকথনের রেকর্ড তার কাছে রয়েছে বলে দাবি করেন ইবাদ।
তিনি বলেন, এসব ঘটনায় নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা চেয়ে ২০ অক্টোবর থানায় লিখিত অভিযোগ করেছেন।
ইবাদ হোসেন বলেন, “প্রায় ১৪ থেকে ১৫ বছর ধরে আমরা এই রাস্তা ব্যবহার করে আসছি। সাত থেকে আট বছর আগে চলাচলের জন্য এক শতক জমিও কিনেছি। এরপরও রাস্তাটি নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি করা হয়েছে।”
ইবাদের প্রতিবেশী কামরুল হাসান রবিন, খায়রুল কবির ও সুমন ভুঁইয়া বলেন, চলাচলের সুবিধার্থে তারা সবাই মিলে রাস্তার জন্য এক শতক জমি কিনেছেন। তাদের অভিযোগ, পাশের জমির মালিক সুমি আক্তারের চাচাতো ভাই চুন্নু খান প্রভাব খাটিয়ে রাস্তাটি দখল করে বেড়া দিয়ে বন্ধ করে দেন। আইনের আশ্রয় নেওয়ার পর তাদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলেও দাবি করেন তারা।
অভিযোগ অস্বীকার চুন্নুর
চুন্নু খান আবারও দাবি করেন, ছড়িয়ে পড়া অডিওটি এআই দিয়ে তৈরি এবং তিনি কোনো হুমকি দেননি। তার ভাষ্য, সাংবাদিক ইবাদ হোসেন তার আত্মীয়ের জমি দখল করে রাস্তা নির্মাণ করেছেন। এ নিয়ে আলোচনায় বসার প্রস্তাব দিলেও ইবাদ রাজি হননি; বরং মামলা করেছেন।
চুন্নু খান নিজেকে শিক্ষকতার পাশাপাশি উপজেলা বিএনপির সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য বলে দাবি করেন। তিনি বলেন, ছাত্রজীবন থেকেই বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তবে উপজেলা বিএনপির সভাপতিমণ্ডলীতে কতজন সদস্য রয়েছেন, এমন প্রশ্নের পর তিনি ব্যস্ততার কথা বলে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন।
আটপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ জুবায়দুল আলম বলেন, ৮ থেকে ১০টি পরিবারের চলাচলের রাস্তা বন্ধ করে দেওয়ার পর সাংবাদিক ইবাদ হোসেন অভিযোগ করেন। পরে উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশের হস্তক্ষেপে রাস্তাটি খুলে দেওয়া হয়। হুমকির ঘটনায় সাংবাদিক থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন। এ বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।
প্রতিনিধি/এসএস