জেলা প্রতিনিধি
২৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৩৬ পিএম
হাতে বাঁশের পলো, মাথা ও কোমরে গামছা বেঁধে ধলাই নদীতে মাছ ধরতে নেমেছেন নানা বয়সী মানুষ। নদীর পাড়ে দর্শনার্থীদের ভিড়। এমন আনন্দ-উচ্ছ্বাসে রোববার (২৫ অক্টোবর) সকালে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলায় হয়েছে শত বছরের ঐতিহ্যবাহী পলো বাওয়া উৎসব। তবে বিষ প্রয়োগে মাছ নিধনের কারণে নদীতে মাছ কমে যাওয়ায় এ উৎসবের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।
উৎসবে উপজেলার রহিমপুর, ধর্মপুর, রামচন্দ্রপুর, সিদ্ধেশ্বরপুর, দেবীপুর, চৈত্রঘাট ও বড়চেগ গ্রামের সৌখিন মৎস্য শিকারিরা অংশ নেন।
স্থানীয় লোকজন জানান, কালের বিবর্তনে গ্রাম বাংলার নদ-নদী, খাল-বিল ও জলাভূমিকে ঘিরে গড়ে ওঠা নানা লোকজ ঐতিহ্য হারিয়ে যাচ্ছে। একসময়কার জনপ্রিয় গ্রামীণ উৎসবও কমে যাচ্ছে। এর মধ্যেও ধলাই নদীকে কেন্দ্র করে টিকে আছে পলো বাওয়ার এ আয়োজন।
জানা গেছে, পলো বাওয়া হলো বাঁশ দিয়ে বিশেষভাবে তৈরি মাছ ধরার উপকরণ পলো ব্যবহার করে দলবদ্ধ ভাবে মাছ শিকারের একটি ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতি। শুষ্ক মৌসুম পুরোপুরি শুরু না হলেও ধলাই নদীসহ উপজেলার বিভিন্ন ছোট ছড়া, বিল ও জলাশয়ে পানি কমতে শুরু করায় মাছ ধরার এ আয়োজন চলছে।
উৎসবে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা পলোর পাশাপাশি উড়াল জালসহ মাছ ধরার বিভিন্ন উপকরণ ব্যবহার করেন। নদীর অল্প পানিতে একদল শিকারি সারিবদ্ধভাবে জাল নিয়ে অপেক্ষা করেন। অন্য দল পলো পানিতে চাপিয়ে সামনে এগিয়ে যান। এভাবে পুঁটি, টেংরা, শোল, রিটা ও বোয়ালসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ধরার চেষ্টা করেন তারা।
এ সময় বড়দের সঙ্গে শিশু-কিশোরদেরও মাছ ধরায় সহযোগিতা করতে দেখা যায়। কারও হাতে পলো, কারও হাতে জাল সব বয়সী মানুষের অংশগ্রহণে উৎসবের আনন্দ ছড়িয়ে পড়ে নদীর পাড়জুড়ে।
তবে এবার উৎসবে অংশ নেওয়া লোকজনের কণ্ঠে ছিল ধলাই নদীতে মাছ কমে যাওয়ার উদ্বেগ। তাদের অভিযোগ, সম্প্রতি বিষ প্রয়োগ করে মাছ নিধনের কারণে ধলাই নদীতে মাছের সংখ্যা কমছে। এতে ঐতিহ্যবাহী পলো বাওয়া উৎসবেও অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা কমে আসছে।
ধর্মপুর গ্রামের বাসিন্দা ইমাম হোসেন বলেন, বছরের এই দিনটার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করি। তবে বিষ দিয়ে মাছ নিধন করায় এবার পলো বাওয়ায় মানুষের উপস্থিতি কম ছিল।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল খালিকও বিষ প্রয়োগ করে মাছ নিধনের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, এভাবে মাছ নিধন বন্ধ না হলে নদীতে মাছ আরও কমে যাবে। এর প্রভাব পড়বে ঐতিহ্যবাহী পলো বাওয়া উৎসবের ওপরও। বিষ প্রয়োগে মাছ নিধনের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
এলাকার বাসিন্দা ও গণমাধ্যমকর্মী আব্দুল বাছিত খান বলেন, ধলাই নদীতে পলো বাওয়া উৎসব শুধু মাছ ধরার আয়োজন নয়, এটি গ্রামীণ মানুষের মিলনমেলা এবং লোকজ সংস্কৃতির অংশ। নদী-জলাশয় রক্ষা, বিষ প্রয়োগে মাছ নিধন বন্ধ এবং দেশীয় মাছের প্রজনন ও বংশ বিস্তারের পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে এ ঐতিহ্য আগামী প্রজন্মের জন্যও ধরে রাখা সম্ভব হবে।
প্রতিনিধি/এলএ