জেলা প্রতিনিধি
২৫ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৪৭ পিএম
পিরোজপুরের চিথলিয়া গ্রামে গভীর রাতে মোবাইল ফোনের আলোয় কোদাল হাতে বাবার কবর খুঁড়েছেন এক বীর মুক্তিযোদ্ধার মেয়ে ও তার দুই ফুফু। স্থানীয় লোকজনের বাধা ও ভয়ে কেউ কবর খুঁড়তে এগিয়ে না আসায় শেষ পর্যন্ত নিজেরাই এ কাজ করেন তারা। নানা উত্তেজনা ও নাটকীয়তার মধ্য দিয়ে রোববার (২৫ অক্টোবর) দিবাগত রাতে বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর দাফন সম্পন্ন হয়।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, শনিবার (২৪ অক্টোবর) সকালে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে মারা যান মানিক পশারী। দুপুরে তার মরদেহ পিরোজপুরে আনার পর থেকেই এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের দাবি ছিল, তাকে ওই এলাকায় দাফন করা যাবে না।
প্রশাসনের উদ্যোগে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার দেওয়ার ব্যবস্থা করা হলেও পরিস্থিতি শান্ত হয়নি। একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জামায়াতে ইসলামীর প্রয়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে অন্যতম প্রধান বাদী ও সাক্ষী ছিলেন মানিক পশারী। তার মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ও দাফনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়। একপর্যায়ে দীর্ঘ সময় তার মরদেহ পুলিশ লাইনসে রাখা হয়।

মানিক পশারীর মেয়ে সীমু আক্তার জানান, এর আগে একবার কবর খোঁড়া হয়েছিল। কিন্তু কয়েকজন এসে মাটি দিয়ে তা ভরাট করে দেন। পরে ভয়ে কেউ আর কবর খুঁড়তে রাজি হননি। বাধ্য হয়ে তিনি ও তার দুই ফুফু মোবাইল ফোনের আলো জ্বালিয়ে কোদাল দিয়ে মাটি কেটে কবর প্রস্তুত করেন।
পিরোজপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শরিফুল ইসলাম জানান, পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার পর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী গভীর রাতে দাফনের ব্যবস্থা করা হয়। শেষ পর্যন্ত রাত পৌনে তিনটার দিকে প্রশাসনের লোকজনের উপস্থিতিতে মানিক পশারীকে দাফন করা হয়।
চিথলিয়া গ্রামের গ্রাম পুলিশ মতিউর রহমান জানান, মানিক পশারীর বাড়িতে জানাজার আয়োজনও করা হয়নি। প্রথমবার কবর খোঁড়া হলেও কে বা কারা তাতে আবার মাটি ভরাট করে দেন। সব মিলিয়ে চরম প্রতিকূল পরিস্থিতিতে নীরবে গভীর রাতে তার দাফন সম্পন্ন হয়।
এদিকে গভীর রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে জামায়াতের সংসদ সদস্য ও দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ছেলে মাসুদ সাঈদী দাবি করেন, মানিক পশারীর জানাজা বা দাফনে তাদের কোনো আপত্তি ছিল না; আপত্তি ছিল শুধু তাকে গার্ড অব অনার দেওয়া নিয়ে।
মাসুদ সাঈদীর দাবি, মানিক পশারী প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা নন। ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় তিনি সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেননি বলে স্বীকার করেছিলেন বলেও দাবি করেন মাসুদ সাঈদী। তৎকালীন সংসদ সদস্য এ কে এম এ আউয়ালের একটি ডিও লেটারের ভিত্তিতে মানিক পশারীর নাম মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল বলেও অভিযোগ করেন তিনি। এ বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানান মাসুদ সাঈদী।
তবে মাসুদ সাঈদীর এসব দাবি ও সাক্ষ্যের উদ্ধৃতির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি। এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্তের ফলাফল বা ট্রাইব্যুনালের বক্তব্যও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
প্রতিনিধি/এসএস