জেলা প্রতিনিধি
২৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:০১ পিএম
রাঙামাটির সাজেক পর্যটন সড়কের উজোবাজারে (গঙ্গারাম বাজার) আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনার জেরে শনিবার রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে আধা বেলা সড়ক ও নৌপথ অবরোধের ডাক দিয়েছে পাহাড়িদের একটি সংগঠন। ইউপিডিএফ-ঘনিষ্ঠ ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদ নামের সংগঠনটি এ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। অন্যদিকে, ইউপিডিএফ-ঘনিষ্ঠ স্থানীয় দুটি সংগঠনের অনির্দিষ্টকালের অবরোধ এবং প্রশাসনের সাজেক ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞার কারণে পর্যটকশূন্য হয়ে পড়েছে সাজেক। এতে আর্থিক ঝুঁকিতে পড়েছেন পর্যটনসংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা। উপত্যকার শতাধিক রিসোর্ট-কটেজের বুকিং বাতিল হওয়ায় পর্যটকদের টাকা ফেরত দিতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের।
এদিকে গত বৃহস্পতিবার দুপুরে সাজেকের উজোবাজারে সংঘর্ষের পর এখনো থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। বাজারের দোকানপাটও বন্ধ। স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক কাটেনি। গতকাল শুক্রবার সাজেক সড়কের কয়েকটি স্থানে বিক্ষিপ্তভাবে টায়ার জ্বালিয়ে অবরোধ পালনের খবর পাওয়া গেছে। অন্যদিকে, সাজেক পর্যটনকেন্দ্র খুলে দেওয়ার দাবিতে শুক্রবার বিকেলে খাগড়াছড়িতে বিক্ষোভ করেছেন পর্যটন উদ্যোক্তা ও খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার সকাল ছয়টা থেকে সাজেক-বাঘাইহাট সড়কের ১০ ও ১৪ কিলোমিটারসহ বিভিন্ন স্থানে টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষিপ্তভাবে অবরোধ পালন করেন কর্মসূচির সমর্থকেরা। অবরোধের কারণে যান চলাচল বন্ধ থাকলেও সামগ্রিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে বলে জানা গেছে।
সাজেক গণ-অধিকার রক্ষা কমিটির সদস্যসচিব বিজয় কান্তি চাকমা বলেন, আমাদের অবরোধ অব্যাহত রয়েছে। সকালে সাজেক সড়কের বিভিন্ন স্থানে টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষিপ্তভাবে অবরোধ পালন করা হয়েছে। আমাদের অবরোধ চলবে। বৃহস্পতিবারের ঘটনায় সাধারণ জনগণের প্রায় শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে আটজন গুরুতর আহত।
সাজেকের উজোবাজার (গঙ্গারাম বাজার) এলাকার এক বাসিন্দা বলেন, বৃহস্পতিবার সংঘর্ষের পর এলাকার লোকজন ঘরবাড়ি ও দোকানপাট ফেলে অন্যত্র পালিয়ে গেছেন। ভয়ে ও আতঙ্কে তাঁরা এলাকায় ফিরতে পারছেন না। কে কোথায় গেছেন, তা-ও সঠিকভাবে বলা যাচ্ছে না। বাজারের দোকানপাট এখনো বন্ধ রয়েছে। সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা রয়েছেন।
উজোবাজার ব্যবসায়ী সমিতির এক নেতা বলেন, ভয়ে তাঁরা দোকানপাট ও বাড়িঘরে যেতে পারছেন না। বাজারের লোকজন ঘরবাড়ি ও দোকানপাট ফেলে যে যাঁর মতো আশ্রয় নিয়েছেন। বৃহস্পতিবার অনেকে আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে, কেউ কেউ জঙ্গল ও বাগানে আশ্রয় নিয়েছেন। আতঙ্কে লোকজন বাড়িঘরে ফিরতে পারছেন না। দোকানপাটও বন্ধ রয়েছে।
রাঙামাটির পুলিশ সুপার মুহম্মদ আব্দুর রকিব শুক্রবার সন্ধ্যায় বলেন, সাজেকের উজোবাজারসহ আশপাশের এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো। সবকিছু স্বাভাবিক আছে। এ ঘটনায় এখনো কোনো মামলা হয়নি। ভয়ে ও আতঙ্কে যাঁরা পালিয়ে গেছেন, তাঁদের বাড়িঘরে ফিরতে কোনো সমস্যা নেই বলে মনে করেন তিনি।
শুক্রবার বিকেলে দেওয়া এক বিবৃতিতে শনিবার রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে আধা বেলা অবরোধের ঘোষণা দেন ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি উষাতন চাকমা। তিনি বলেন, সাজেকের সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসন আন্দোলনরত জনগণের দাবি মেনে নিলেও তা বাস্তবায়ন করেনি। এই ব্যর্থতা ঢাকতে বৃহস্পতিবার উজোবাজারে শান্তিপূর্ণ অবরোধ পালনকারীদের ওপর পরিকল্পিতভাবে হামলা, নির্বিচার লাঠিপেটা ও শারীরিক নির্যাতন করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর দাবি, হামলায় অন্তত ৭৮ জন নারী-পুরুষ ও বৃদ্ধ আহত হয়েছেন। শনিবার রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে আধা বেলা শান্তিপূর্ণ অবরোধ কর্মসূচি পালন করা হবে।
বুকিং বাতিলে আর্থিক ঝুঁকিতে উদ্যোক্তারা
সাজেকে চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব পড়েছে পর্যটন অর্থনীতিতে। পর্যটনের ভরা মৌসুমেও সড়ক অবরোধ ও প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞার কারণে বুকিং হারাচ্ছেন রিসোর্ট-কটেজের মালিক ও সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা। গত ২২ অক্টোবর থেকে আবার অবরোধ শুরু হওয়ায় আগে থেকে নেওয়া বুকিংও বাতিল হচ্ছে।
সাজেক রিসোর্ট-কটেজ মালিক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, সাজেকে প্রায় ১২০টি রিসোর্ট-কটেজ রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রায় তিন হাজার পর্যটকের থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পর ১৬ অক্টোবর থেকে সাজেকে পর্যটকদের ব্যাপক সমাগম হয়েছিল। কিন্তু বৃহস্পতিবার থেকে আবার অবরোধ শুরু হওয়ায় পর্যটকদের বুকিং বাতিল হচ্ছে।
সাজেক ভ্যালির রুইলুই হলিডে রিসোর্টের ব্যবস্থাপক রাশু চাকমা বলেন, চলমান অস্থিরতার মধ্যেও তাঁদের রিসোর্টে ১০টি কক্ষ বুকিং ছিল। বৃহস্পতিবারের অবরোধের কারণে সব কটি বুকিং বাতিল হয়েছে। ইতিমধ্যে পর্যটকদের বুকিংয়ের টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে। একই পরিস্থিতি অন্য রিসোর্টগুলোতেও। ফলে পর্যটকদের আসার সুযোগ নেই।
সাজেক রিসোর্ট-কটেজ মালিক সমিতির সহসাধারণ সম্পাদক মতিজয় ত্রিপুরা বলেন, সাজেকের অনেক রিসোর্ট-কটেজে ২৫, ২৮ ও ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত কক্ষ বুকিং ছিল। অবরোধ ও অস্থিরতার কারণে সেসব বুকিং বাতিল হচ্ছে। শুক্রবারও অনেকের বুকিং বাতিল হয়েছে। এভাবে বুকিং বাতিল হতে থাকলে এবং পর্যটকেরা আসতে না পারলে পর্যটন খাতে বড় ধরনের ধস নামতে পারে।
মূলত পার্বত্য চট্টগ্রামের সাজেক উপত্যকা রাঙামাটি জেলায় অবস্থিত হলেও এর অর্থনৈতিক প্রভাব পড়ে খাগড়াছড়ি জেলায়ও। অনেক পর্যটক খাগড়াছড়ি ঘুরে দীঘিনালা হয়ে সাজেকে যান। চলমান অস্থিরতায় সাজেককেন্দ্রিক পর্যটন নেটওয়ার্কে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। বিশেষ করে পরিবহন খাতে এর প্রভাব বেশি। সাজেকে যেতে না পারায় খাগড়াছড়িতে পর্যটকের সংখ্যা কমে যেতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
এ পরিস্থিতিতে সাজেক ভ্রমণ স্বাভাবিক করার দাবিতে শুক্রবার বিকেলে খাগড়াছড়িতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করা হয়েছে।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে পার্বত্য চট্টগ্রামের পর্যটনবিষয়ক গবেষক ও রাঙামাটির প্রথম ইকো রিসোর্ট রাইন্যা টুগুন ইকো রিসোর্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ললিত সি. চাকমা বলেন, পাহাড়ে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা তৈরি হলে শুধু পর্যটন নয়, সব খাতেই কমবেশি প্রভাব পড়ে। সাজেকে পর্যটকেরা যেতে না পারায় পরিবহন ও খাদ্যপণ্য সরবরাহের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। বিনিয়োগকারীদের ব্যয়, কর্মীদের বেতন-ভাতাসহ আনুষঙ্গিক অনেক বিষয় পর্যটনের ওপর নির্ভরশীল। সেখানে অস্থিরতা তৈরি হওয়ায় দ্রুত একটি টেকসই সমাধান জরুরি। শুধু পর্যটনকেন্দ্র খুলে দিলেই সমস্যার সুষ্ঠু সমাধান হবে না।
রাঙামাটি শহরে পর্যটকের সমাগম
সাজেকের রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব খাগড়াছড়ির পর্যটন অর্থনীতিতে পড়লেও রাঙামাটিতে তেমন প্রভাব পড়েনি। রাঙামাটি শহর ও আশপাশের পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে পর্যটকদের উপস্থিতি দেখা গেছে। রিসোর্ট-কটেজ ও হোটেল-মোটেলেও ছিলেন উল্লেখযোগ্যসংখ্যক পর্যটক। শহরের পর্যটন ঝুলন্ত সেতু, পলওয়েল পার্ক ও কাপ্তাই হ্রদের আশপাশের পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে পর্যটকদের সমাগম ছিল।
রাঙামাটি সদর উপজেলায় অবস্থিত বার্গী লেকভ্যালির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও রাঙামাটি রিসোর্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সুমেত চাকমা বলেন, সাজেকের অস্থিরতার নেতিবাচক প্রভাব তাঁদের এলাকায় পড়েনি। বরং বার্গী লেকভ্যালিতে পর্যটক ও সাধারণ দর্শনার্থীর সংখ্যা বেড়েছে। আগে প্রতিদিন সেখানে ২০০ থেকে ৩০০ জন দর্শনার্থী আসতেন। বৃহস্পতিবার এসেছেন ৫২৮ জন। শুক্রবার এসেছেন প্রায় এক হাজার দর্শনার্থী। তাঁদের রিসোর্টের সব কটি কক্ষও বুকিং রয়েছে। এবার রাঙামাটিতে মোটামুটি ব্যাপকসংখ্যক পর্যটক আসছেন বলে জানান তিনি।
রাঙামাটির পর্যটন হলিডে কমপ্লেক্সের ব্যবস্থাপক আলোক বিকাশ চাকমা বলেন, তাঁদের মোটেলের ৯০ শতাংশ কক্ষ বুকিং হয়েছে। আরও বেশি পর্যটক আসবেন বলে আশা করেছিলেন। তবে পূজা উপলক্ষে টানা ছুটিতে এবার রাঙামাটিতে রেকর্ডসংখ্যক পর্যটক এসেছেন। পর্যটন মৌসুমের শুরুতেই ভালো সাড়া পাওয়া যাচ্ছে, তাই এ মৌসুম ভালো যাবে বলে আশা করছেন তিনি।
সাজেকের অস্থিরতার কারণে তাঁদের কোনো বুকিং বাতিল হয়নি জানিয়ে আলোক বিকাশ চাকমা বলেন, সাজেকের পরিস্থিতির কারণে রাঙামাটি শহরে পর্যটক বেড়েছে কি না, তা তাঁর জানা নেই। পর্যটন ঝুলন্ত সেতুতে প্রতিদিন দেড় থেকে দুই হাজার টিকিট বিক্রি হচ্ছে।
প্রতিনিধি/এআর