জেলা প্রতিনিধি
২৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৫৭ এএম
কুমিল্লা, নোয়াখালী, চাঁদপুর ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কয়েক দফায় সরকারি খোলাবাজারে পণ্য বিক্রির (ওএমএস) কেন্দ্র বাড়ানো হলেও গত ১৬ বছরে ফেনীতে বাড়েনি বিক্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা। ফেনী পৌরসভার ১৮টি ওয়ার্ডের বিপরীতে এখনো চালু রয়েছে মাত্র ছয়টি কেন্দ্র। এতে চাহিদা অনুযায়ী কম দামে চাল ও আটা কিনতে পারছেন না নিম্ন আয়ের অনেক মানুষ। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়েও খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে অনেককে।
তবে ফেনীতে ওএমএসের বিক্রয়কেন্দ্র ও বরাদ্দ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন জেলা ওএমএস কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মাহবুবউল করিম। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে লিখিতভাবে জানানো হবে বলেও তিনি জানিয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২০০৭ সালে বিশ্বব্যাপী খাদ্যসংকট এবং দেশে চালের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে ওই বছরের সেপ্টেম্বরে রাজধানীর পলাশী বাজার এলাকায় ওএমএস কার্যক্রম চালু করে সরকার। দরিদ্র মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্বল্পমূল্যে চাল ও আটা বিক্রির এ কর্মসূচি পরে দেশব্যাপী সম্প্রসারণ করা হয়। ২০১০ সালে ফেনী পৌরসভায় চালু হয় এ কার্যক্রম।
শুরুর দিকে ফেনী পৌরসভার ১৮টি ওয়ার্ডে ছয়টি বিক্রয়কেন্দ্রের মাধ্যমে ওএমএস কার্যক্রম পরিচালিত হতো। ১৬ বছর পেরিয়ে গেলেও কেন্দ্রের সংখ্যা বাড়েনি। ফলে সপ্তাহে দুই থেকে তিন দিনের বেশি এ কার্যক্রম চালানো সম্ভব হচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
খাদ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, পাশের কুমিল্লায় কয়েক দফায় বাড়িয়ে ওএমএস বিক্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা ৩২ করা হয়েছে। নোয়াখালীতে ১৭টি, চাঁদপুরে ১৫টি এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ১২টি কেন্দ্র রয়েছে। এসব জেলার তুলনায় ফেনীতে বিক্রয়কেন্দ্র কম থাকায় স্থানীয় চাহিদার পুরোটা পূরণ করা যাচ্ছে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
ওএমএসের সুবিধাভোগীরা জানান, জনপ্রতি পাঁচ কেজি চাল ও পাঁচ কেজি আটা কেনার সুযোগ রয়েছে। প্রতি কেজি চাল ৩০ টাকা এবং আটা ২৪ টাকা দরে বিক্রি করা হয়। এসব পণ্য কিনতে ভোর থেকেই বিক্রয়কেন্দ্রের সামনে নিম্ন আয়ের মানুষের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়। কোনো সপ্তাহে এক দিন, আবার কোনো সপ্তাহে দুই দিন পণ্য কেনার সুযোগ মেলে। বরাদ্দ কম থাকায় দুই থেকে তিন ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও অনেককে খালি হাতে ফিরতে হয়।

ফেনী পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ওএমএস ডিলার মো. আকবর হোসেন বলেন, কোনো সপ্তাহে দুই দিন, আবার কোনো সপ্তাহে তিন দিন পণ্য বরাদ্দ পান তিনি। প্রতি বরাদ্দে ৭৫০ কেজি চাল ও ৭৫০ কেজি আটা দেওয়া হয়। সকাল সাড়ে নয়টা থেকে বিক্রি শুরু হয়ে দুপুর পর্যন্ত চলে।
আকবর হোসেন বলেন, দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে মানুষ চাল ও আটা সংগ্রহ করেন। সপ্তাহে অন্তত পাঁচ দিন এক মেট্রিক টন করে চাল ও আটা বরাদ্দ দেওয়া হলে মানুষের চাহিদা কিছুটা পূরণ করা সম্ভব হবে।
জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০১০ সালে ওএমএস কার্যক্রম শুরুর সময় ফেনী পৌরসভার জনসংখ্যা ছিল ১ লাখ ৯২ হাজার। বর্তমানে তা বেড়ে ২ লাখ ৭৮ হাজারে দাঁড়িয়েছে। সূত্রটির হিসাবে, এ সময়ে জনসংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৪২ শতাংশ।
এ ছাড়া ফেনীতে স্টার লাইন গ্রুপের ১৭টি শিল্পকারখানা, আবুল খায়ের ম্যাচ ফ্যাক্টরি, কোয়ালিটি জুটমিলসহ বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে হাজারো শ্রমিক কাজ করেন। তাদের অনেকে নিম্ন আয়ের হওয়ায় স্বল্পমূল্যে খাদ্যপণ্য কেনার প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু পর্যাপ্ত বিক্রয়কেন্দ্র ও বরাদ্দ না থাকায় তারা ওএমএসের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন।

ফেনীর জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. আলাউদ্দিন ঢালী বলেন, ফেনী পৌরসভার ১৮টি ওয়ার্ডে ওএমএসের কেন্দ্র রয়েছে মাত্র ছয়টি। এক দিন ১ থেকে ৬ নম্বর ওয়ার্ডে কার্যক্রম চালানো হলে পরদিন ৭ থেকে ১২ নম্বর ওয়ার্ডে চালু রাখা হয়। এভাবে এক এলাকায় বিক্রি বন্ধ রেখে অন্য এলাকায় কার্যক্রম পরিচালনা করতে হয়।
তিনি আরও বলেন, দেশের বিভিন্ন জেলায় প্রতিদিন তিন মেট্রিক টন চাল ও আটা ট্রাকের মাধ্যমে বিক্রির বরাদ্দ থাকলেও ফেনীতে এ ধরনের কোনো বরাদ্দ নেই। ফলে এখানে ওএমএসের চাহিদা বেশি থাকে। বিক্রয়কেন্দ্র ও বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি ট্রাকের মাধ্যমে পণ্য বিক্রি চালুর বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।

জেলা ওএমএস কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মাহবুবউল করিম বলেন, ফেনীতে শ্রমজীবী ও নিম্ন আয়ের মানুষের সংখ্যা কম নয়। অন্য জেলা থেকেও অনেকে কাজের সন্ধানে এ জেলায় আসেন। কিন্তু দীর্ঘদিনেও ওএমএসের বিক্রয়কেন্দ্র বাড়ানো হয়নি, যা দুঃখজনক।
জেলা প্রশাসক আরও বলেন, দরিদ্র মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বাজারে চাল ও আটার দাম স্থিতিশীল রাখতে ফেনীতে ওএমএসের বিক্রয়কেন্দ্র ও বরাদ্দ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে লিখিতভাবে জানিয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
প্রতিনিধি/এসএস