জেলা প্রতিনিধি
২২ অক্টোবর ২০২৬, ০২:১৮ পিএম
পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্ন নিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকায় পাড়ি জমিয়েছিলেন শরীয়তপুরের ডামুড্যার মারুফ ব্যাপারী। সেখানে কেটেছে ১০ বছরেরও বেশি সময়। ব্যবসা করে পরিবারের ভবিষ্যৎ গড়ার চেষ্টা করছিলেন তিনি। কিন্তু সেই স্বপ্নের পথেই নেমে আসে অন্ধকার। গুলিতে প্রাণ হারিয়ে তার মরদেহ পড়ে আছে বিদেশের মাটিতে। আর দেশের বাড়িতে স্বজনদের চোখে জল, মনে একটাই আকুতি—প্রিয় মানুষটিকে শেষবারের মতো দেখা।
মারুফ ব্যাপারী শরীয়তপুরের ডামুড্যা উপজেলার সিড্যা ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের পশ্চিম সিড্যা গ্রামের বাসিন্দা। তার বাবা প্রয়াত আব্দুস সোবহান ব্যাপারী। দীর্ঘদিন প্রবাসে থাকার পর তার মৃত্যুর খবর বাড়িতে পৌঁছালে পরিবারে শোকের ছায়া নেমে আসে। পরিবারের সচ্ছলতা ফেরানোর আশায় যিনি দেশ ছেড়েছিলেন, তার মরদেহ দেশে ফেরার অপেক্ষায় এখন দিন গুনছেন স্বজনেরা।
গত বুধবার (২১ অক্টোবর) রাত ১০টার দিকে দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউনের বুষ্টার এলাকার কাছাকাছি জুলুটেম্বা নামের একটি লোকেশনে নিজের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান মারুফ। স্থানীয় প্রবাসী বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, চাঁদার টাকা নিয়ে বিরোধের জেরে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।
মারুফের পরিচিত প্রবাসী বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে জুলুটেম্বা এলাকায় ব্যবসা করছিলেন তিনি। সেখানে ব্যবসা পরিচালনার জন্য স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি নিরাপত্তার নামে তার কাছে ৫০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ দক্ষিণ আফ্রিকান র্যান্ড দাবি করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

সম্প্রতি অতিরিক্ত টাকা দাবি করাকে কেন্দ্র করে তাদের সঙ্গে মারুফের বাক্বিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হলে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয় বলে জানিয়েছেন ওই এলাকার প্রবাসী বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা।
তবে হত্যাকাণ্ডের কারণ সম্পর্কে দক্ষিণ আফ্রিকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এ ঘটনায় কাউকে আটক করা হয়েছে কি না, সে বিষয়েও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ফলে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ এবং জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্তের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক তথ্যের অপেক্ষা রয়েছে।
মারুফের মৃত্যুর পর শোকের পাশাপাশি ক্ষোভও জমেছে স্বজনদের মধ্যে। তাদের দাবি, জীবিকার সন্ধানে বিদেশে যাওয়া একজন বাংলাদেশি ব্যবসায়ীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের পর তার মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
নিহতের স্বজন কামরুজ্জামান ব্যাপারী বলেন, “চাঁদার জন্য বিদেশের মাটিতে আমার কাকা মারুফ ব্যাপারীকে জীবন দিতে হয়েছে। ওখানকার দূতাবাস কি এগুলো দেখে না?”
তিনি জানান, পরিবারের সদস্যরা চান, সরকার দ্রুত উদ্যোগ নিয়ে তার কাকার মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করুক। একই সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত করে দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
আরও পড়ুন
কামরুজ্জামানের ভাষ্য, দক্ষিণ আফ্রিকায় চাঁদার টাকাকে কেন্দ্র করে প্রবাসী বাংলাদেশিদের হত্যার খবর প্রায়ই শোনা যায়। এ ধরনের ঘটনা বন্ধে প্রবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং হত্যাকাণ্ডের শিকার ব্যক্তিদের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন।
মারুফের মরদেহ বর্তমানে দক্ষিণ আফ্রিকার স্থানীয় একটি হাসপাতালে রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে মরদেহ দেশে পাঠানোর আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে কি না, কবে নাগাদ তা বাংলাদেশে পৌঁছাতে পারে কিংবা এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ নিয়েছে—এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
স্বজনদের প্রত্যাশা, বাংলাদেশ সরকার, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও দক্ষিণ আফ্রিকায় বাংলাদেশ দূতাবাস সমন্বিত উদ্যোগ নিয়ে দ্রুত মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করবে। প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে পরিবারের সদস্যরা শেষবারের মতো প্রিয় মানুষটিকে দেখতে পারবেন এবং নিজ গ্রামের মাটিতে তাকে দাফন করতে পারবেন।
পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতি এবং স্বজনদের ভালো রাখার আশায় বহু বাংলাদেশি বিদেশে পাড়ি জমান। তাদের অনেকে ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করেন। কিন্তু বিদেশের মাটিতে সহিংসতা ও চাঁদাবাজির অভিযোগ তাদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করছে।
মারুফ ব্যাপারীর মৃত্যুর ঘটনায় প্রবাসী ব্যবসায়ীদের অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে বিচারের আওতায় আনা এবং প্রবাসে বাংলাদেশিদের নিরাপত্তায় কার্যকর কূটনৈতিক সহায়তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন স্বজনেরা।
ডামুড্যার পশ্চিম সিড্যা গ্রামে এখন মারুফকে হারানোর শোক। পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্ন নিয়ে বছরের পর বছর প্রবাসে কাটানো মানুষটির ফিরে আসার অপেক্ষায় স্বজনেরা—তবে জীবিত নয়, নিথর দেহে।
স্বজনদের চাওয়া, আর দীর্ঘ অপেক্ষা নয়। দ্রুত দেশে ফিরুক মারুফের মরদেহ, শেষ বিদায়ের সুযোগ পাক পরিবার। একই সঙ্গে তার মৃত্যুর সুষ্ঠু তদন্ত হোক এবং নিশ্চিত হোক ন্যায়বিচার।
প্রতিনিধি/এসএস