জেলা প্রতিনিধি
২০ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:২৫ পিএম
কক্সবাজারে পর্যটকদের নিরাপত্তার চেয়ে অবৈধ ব্যবসাই যেন বড় হয়ে উঠেছে। জেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর, কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কউক) ও ফায়ার সার্ভিসের তদারকির আওতায় থাকার কথা হলেও বছরের পর বছর ধরে অনুমোদনহীন হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজ চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে। কখনো নোটিশ, কখনো অভিযান, আবার কখনো জরিমানা—এসব পদক্ষেপের পরও বন্ধ হচ্ছে না অবৈধ স্থাপনার কার্যক্রম।
সম্প্রতি ইনানীর টুপটুপ রেস্ট্রো অ্যান্ড রিসোর্টে আগুনে ১০ পর্যটকের মৃত্যুর পর নতুন করে সামনে এসেছে দীর্ঘদিনের এই অনিয়মের চিত্র। প্রশ্ন উঠেছে, নিরাপত্তার ঘাটতি ও অনুমোদনসংক্রান্ত সমস্যা সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর নজরে থাকার পরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি কেন?
জেলা প্রশাসনের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, চারটি সরকারি দপ্তরের তদারকির আওতায় থেকেও বছরের পর বছর অনেক অবৈধ হোটেল-রিসোর্ট ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। মাঝেমধ্যে অভিযান ও জরিমানা করা হলেও অনেক ক্ষেত্রে তা নামমাত্র পর্যায়ে থেকে যায়। ফলে কিছুদিন পর একই স্থাপনায় আবার ব্যবসা শুরু হয়।
তবে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর দাবি, জনবলসংকট, দ্রুত অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ এবং একাধিক সংস্থার অনুমোদনের প্রয়োজনীয়তার কারণে সব ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয় না।
৫০০ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ফায়ার লাইসেন্স মাত্র ১০০টির
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজারের প্রায় ৫০০টি হোটেল, রেস্তোরাঁ ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে ফায়ার লাইসেন্স রয়েছে মাত্র ১০০টির। অর্থাৎ প্রায় ৪০০ প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় অগ্নিনিরাপত্তা লাইসেন্স ছাড়াই ব্যবসা পরিচালনা করছে।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশিক্ষণ, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) লেফটেন্যান্ট কর্নেল এম এ আজাদ আনোয়ার বলেন, নতুন চালু হওয়া অনলাইন ই-লাইসেন্সিং ব্যবস্থায় আবেদন করেছে মাত্র ৫২টি প্রতিষ্ঠান।

তিনি বলেন, প্রায় ৪০০ প্রতিষ্ঠান এখনো ফায়ার লাইসেন্স ছাড়াই ব্যবসা পরিচালনা করছে। অগ্নিনিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
সতর্কতা, নোটিশ ও জরিমানার পরও বন্ধ হচ্ছে না
পর্যটনকেন্দ্রিক ব্যবসার প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে কক্সবাজার শহর, মেরিন ড্রাইভ ও বিভিন্ন পর্যটন এলাকায় গড়ে উঠেছে অসংখ্য হোটেল, রিসোর্ট, কটেজ ও রেস্তোরাঁ। অভিযোগ রয়েছে, এসব স্থাপনার অনেকগুলোই প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়াই নির্মাণ করা হয়েছে। কোথাও কোথাও কাঠ ও বাঁশের মতো দাহ্য উপকরণ ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে কক্ষ ও অবকাঠামো।
কউকের অথরাইজড অফিসার ফজলে রাব্বি বলেন, নিরাপত্তাব্যবস্থা বাস্তবায়নে অতিরিক্ত খরচ এড়াতে অনেক রিসোর্ট কর্তৃপক্ষ আইন ও বিধিমালা মানতে চায় না।
তিনি বলেন, বারবার সতর্ক করা ও নোটিশ দেওয়ার পরও অনেকে বিষয়টি গুরুত্ব দেন না। আইনগত ব্যবস্থা নিতে গেলে অনুনয়-বিনয় শুরু হয়। ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জরিমানা বা উচ্ছেদ করার পরও দুই মাসের মধ্যে একই জায়গায় আবার অবৈধ স্থাপনা তৈরি করে ব্যবসা শুরুর ঘটনা ঘটছে।
ফজলে রাব্বির মতে, শুধু সতর্কতা বা সাময়িক জরিমানা দিয়ে এই প্রবণতা বন্ধ করা সম্ভব নয়। প্রয়োজনে আরও কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।
টুপটুপের আগুনে উঠেছে জবাবদিহির প্রশ্ন
গত শনিবার ইনানীর টুপটুপ রেস্ট্রো অ্যান্ড রিসোর্টে আগুনে ১০ পর্যটকের মৃত্যু কক্সবাজারের পর্যটন খাতের নিরাপত্তাব্যবস্থাকে বড় প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
নিহত ব্যক্তিদের স্বজনদের অভিযোগ, রিসোর্টটির বিভিন্ন অনিয়ম ও নিরাপত্তার ঘাটতি সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আগে থেকেই অবগত ছিল। সতর্কতা বা নোটিশ দেওয়ার পর কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হলে এতগুলো প্রাণহানি হয়তো ঠেকানো সম্ভব হতো।
নিহত এক পর্যটকের স্বজন নঈমুদ্দিন বলেন, ফায়ার সার্ভিসের নোটিশ উপেক্ষা করেও প্রশাসনিক জরিমানা দিয়ে রিসোর্টটির কার্যক্রম চলছিল। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জরিমানা আদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে রিসোর্টটি বন্ধ করে দিলে এমন মর্মান্তিক ঘটনা ঘটত না।

আরেক স্বজন ফয়সল জাহান বলেন, নিচতলায় রেস্তোরাঁ পরিচালনার সুযোগ থাকলেও ওপরের তলার কাঠের ও দাহ্য কাঠামো নিয়ে কর্তৃপক্ষের সতর্কতা ছিল। এরপরও সতর্কবার্তা উপেক্ষা করা হয়েছে।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, সতর্ক করার পরও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ার দায় কার? কর্তৃপক্ষের অবহেলার কারণে পর্যটকদের কেন জীবন দিতে হবে?
প্রশাসনের দাবি, সমন্বয়ই বড় চ্যালেঞ্জ
জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাসনীম জাহান বলেন, কোনো স্থাপনা নির্মাণের অনুমতি দেওয়ার আগে সেটি অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী হচ্ছে কি না এবং প্রয়োজনীয় অনুমোদন রয়েছে কি না, তা যাচাই করা জরুরি।
তাঁর মতে, এ জন্য সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরের মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন। বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে রাতারাতি কাঁচা বা দাহ্য উপকরণ দিয়ে স্থাপনা তৈরি হয়ে যায়। প্রশাসনের নজরে আসার আগেই নির্মাণকাজ শেষ হয়ে যাওয়ায় এবং জনবলসংকট থাকায় তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
তিনি বলেন, কউকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। সমন্বিতভাবে অবৈধ স্থাপনার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এক সপ্তাহের মধ্যে উচ্ছেদ অভিযানের ঘোষণা
কক্সবাজারকে পরিকল্পিত ও নিরাপদ পর্যটন নগরী হিসেবে গড়ে তোলার কথা জানিয়েছেন কউকের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন।
তিনি বলেন, আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী কউকের পরিদর্শকেরা নিয়মিত বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেন এবং আইন লঙ্ঘনকারীদের নোটিশ দেওয়া হয়। চূড়ান্ত নোটিশের পরও অবৈধ অংশ অপসারণ না করলে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে।
তিনি জানান, ইনানী ও মেরিন ড্রাইভ এলাকার সংশ্লিষ্ট অবৈধ স্থাপনাগুলোকে ইতিমধ্যে চূড়ান্ত নোটিশ দেওয়া হয়েছে। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে অন্তত দুটি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার মাধ্যমে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হবে।
দুর্ঘটনার পর মামলা, কিন্তু স্থায়ী সমাধান কোথায়?

টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে ১০ পর্যটকের মৃত্যুর ঘটনায় রিসোর্টের মালিক ও ব্যবস্থাপকসহ ২৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে পুলিশ। তবে অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, দুর্ঘটনার পর মামলা, অভিযান ও আশ্বাস দেওয়া হলেও কিছুদিন পর অনেক ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়।
কক্সবাজারে প্রতিবছর লাখ লাখ পর্যটক সমুদ্র, পাহাড় ও প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে আসেন। তাঁদের নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করা পর্যটন ব্যবস্থাপনার অন্যতম প্রধান শর্ত। সেখানে শত শত প্রতিষ্ঠানের ফায়ার লাইসেন্স না থাকা এবং অনুমোদনহীন স্থাপনা বছরের পর বছর টিকে থাকার বিষয়টি এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এআর