জেলা প্রতিনিধি
২০ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৫৯ পিএম
পিরোজপুরের নাজিরপুর ও নেছারাবাদ উপজেলার সীমান্তবর্তী কালিগঙ্গা নদীতে ট্রলারডুবির ঘটনায় আট বছর বয়সী এক শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় শিশুটির মা এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। দুর্গাপূজার আনন্দ শেষে বাড়ি ফেরার পথে এমন দুর্ঘটনায় পরিবারটির আনন্দ নিমেষেই বিষাদে পরিণত হয়েছে।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) রাত ৯টার দিকে শ্রীরামকাঠী-ভরতকাঠী ফেরিঘাট এলাকায় এই দুর্ঘটনা ঘটে।
নিহত শিশুটির নাম অর্পিতা বেপারী। তার মা রিনা বেপারীর বয়স ৩৯ বছর। তারা নেছারাবাদ উপজেলার গুয়ারেখা ইউনিয়নের ভরতকাঠী গ্রামের বাসিন্দা। তাদের পরিবারের সদস্য শংকর বেপারী ঢাকার একটি প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তাপ্রহরী হিসেবে কাজ করেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, দুর্গাপূজার ছুটিতে পরিবার নিয়ে গ্রামের বাড়িতে এসেছিলেন শংকর বেপারী। সোমবার রাতে শ্রীরামকাঠী এলাকায় প্রতিমা দর্শন ও পূজা শেষে স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে ট্রলারে বাড়ি ফিরছিলেন তিনি। ট্রলারটিতে প্রায় ৫০ জন যাত্রী ও আটটি মোটরসাইকেল ছিল। পথে কালিগঙ্গা নদীতে ট্রলারটি ডুবে যায়।
দুর্ঘটনার পর ট্রলারে থাকা অধিকাংশ যাত্রী সাঁতরে তীরে উঠতে সক্ষম হন। তবে নিখোঁজ হন অর্পিতা ও তার মা রিনা বেপারী। পরে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল দুই দফা অভিযান চালিয়ে অর্পিতার মরদেহ উদ্ধার করে। রিনা বেপারীর সন্ধানে উদ্ধার অভিযান চালানো হয়।
প্রত্যক্ষদর্শী ও ট্রলারের বেঁচে যাওয়া এক যাত্রী কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, নাজিরপুর প্রান্ত থেকে ভরতকাঠী ফেরিঘাটের উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসার সময় ক্ষমতার চেয়ে অতিরিক্ত যাত্রী এবং অন্তত ৮টি ভারী মোটরসাইকেল তোলা হয়েছিল। অতিরিক্ত বোঝার কারণে ট্রলারটি ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে এবং ঘাট ছাড়ার পরপরই নদীগর্ভে তলিয়ে যায়। চারদিকে শুরু হয় বাঁচার আকুতি ও হাহাকার। অধিকাংশ মানুষ সাঁতরে ও স্থানীয়দের সহায়তায় কূলে উঠলেও অন্ধকারের তোড়ে তলিয়ে যান রিনা বেপারী ও তার ছোট্ট মেয়ে অর্পিতা।
অর্পিতার বাবা শংকর বেপারী বিলাপ করে বলেন, গত রাতেও মেয়ে আমার সঙ্গে ঘুমিয়েছে আজ সে মৃত আমি কিভাবে রাতগুলো পার করবো। নৌকাডুবির পর যখন আমার পরিবারকে খুজে পাচ্ছি না তখন আমি হাসপাতালসহ আশপাশে নদীতে খুঁজেছি। সবাই কূলে উঠলেও ওরা নিখোঁজ রয়ে যায়। এখন মেয়ে মরা ওর মাও বেচে নাই।
দুর্ঘটনাকবলিত স্থান ও উদ্ধার পরিস্থিতি তদারকি করতে দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যান নাজিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাজিয়া শাহনাজ তমা, সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. আহসান হাবিব এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) নাসরিন জাহান। উদ্ধার অভিযানে নেতৃত্ব দিতে ঘটনাস্থলে উপস্থিত আছেন পিরোজপুর জেলা ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক রায়হানুর আশরাফ এবং নাজিরপুর ফায়ার সার্ভিসের পরিদর্শক সোয়াইব হোসেন মুন্সি। এছাড়া নাজিরপুর ও নেছারাবাদ থানা পুলিশের একটি যৌথ টিম আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ঘটনাস্থলে অবস্থান করছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাজিয়া শাহনাজ তমা জানান, ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল তীব্র পানির স্রোতের মধ্যেও দুই দফায় দুঃসাহসিক অভিযান চালিয়ে শিশু অর্পিতার মৃতদেহ উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে। তবে রাতের অন্ধকারের গভীরতা এবং নদীর বৈরী পরিবেশের কারণে অভিযান চালানো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠায় রাতের মতো উদ্ধার কাজ স্থগিত রাখা হয়েছে। আগামীকাল মঙ্গলবার সকালে নিখোঁজ মা রিনা বেপারীকে উদ্ধারে পুনরায় অভিযান শুরু করা হবে।
আজ মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) বেলা ১২টার দিকে দুর্ঘটনাকবলিত নাজিরপুরের শ্রীরামকাঠী ও নেছারাবাদের ভরতকাটী খেয়া ঘাট এলাকা সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন পিরোজপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য এবং গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আহম্মেদ সোহেল মনজুর।
পরিদর্শনকালে প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন পিরোজপুর জেলা প্রশাসক মো. গোলাম রাব্বানী, পুলিশ সুপার মুহাম্মদ তালেবুর রহমান, নাজিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, ফায়ার সার্ভিস ও নৌবাহিনীর কর্মকর্তা এবং নাজিরপুর থানা পুলিশের একটি দল।
একদিকে শিশু অর্পিতার নিথর দেহ, অন্যদিকে এখনো নিখোঁজ থাকা মায়ের শেষ স্মৃতিটুকুর অপেক্ষায় নদীর পাড়ে স্বজনদের আহাজারি দেখছিল উপস্থিত শত শত মানুষ।
স্বজনদের অশ্রুসিক্ত কান্নায় শ্রীরামকাঠী ও ভরতকাঠী ফেরিঘাট এলাকা যেন রূপ নিয়েছে এক মাতমের শহরে। পূজার আলো মুছে সেখানে এখন নেমে এসেছে গভীর শোকাচ্ছন্ন নীরবতা।
মঙ্গলবার দুপুর আড়াইটার সময় এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ফায়ার সার্ভিস ও নৌবাহিনীর ডুবুরি দল নিখোঁজ নারীকে উদ্ধারে কালিগঙ্গা নদীতে অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে।
প্রতিনিধি/এএম